২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘পিস টিভি’ ভারতে বন্ধ, জাকির নায়েককে গ্রেফতার দাবি

‘পিস টিভি’ ভারতে বন্ধ, জাকির নায়েককে গ্রেফতার দাবি
  • বাংলাদেশে আজ সিদ্ধান্ত

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ ধর্ম প্রচারের নামে জঙ্গীবাদী কর্মকা-ে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে বিতর্কিত বক্তা জাকির নায়েকের পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করেছে ভারত। সম্প্রচার বন্ধ করতে এরই মধ্যে কেবল অপারেটরদের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। জাকির নায়েককে গ্রেফতারেরও দাবি তুলেছেন দেশটির মুসলিম নেতারা। এদিকে জাকির নায়েকের বিকৃত কথায় তরুণরা জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আজই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে সরকার নির্দেশ দিলেই সম্প্রচার বন্ধ করবেন বলে জানিয়েছেন কেবল অপারেটররা।

ভারতের মহারাষ্ট্রে জন্ম নেয়া জাকির আবদুল করিম নায়েক চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রিধারী। ৪৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট। পিস টিভি ওই ফাউন্ডেশনেরই প্রতিষ্ঠান। ভারতের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত তাঁর ভাষণে দেখা যায় তিনি বলছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমেরই সন্ত্রাসবাদী হওয়া উচিত।’ বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন জাকির নায়েক। কয়েক দিনের মধ্যে তিনি ভারতে ফিরতে পারেন। জাকির নায়েকের কার্যক্রম ইসলাম ও ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধী হওয়ায় ২০০৮ সালে লক্ষেèৗ, কানপুর ও এলাহাবাদের রাজ্যসরকার তাঁকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে জাকির নায়েকের ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্য ও কানাডায় নিষিদ্ধ। এমনকি মুসলিম প্রধান মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াতেও জাকির নায়েকের বক্তব্য প্রচার নিষিব্ধ। তবে এতদিন কেবল অপরারেটররা বিশেষ কৌশলে ভারতে পিসি টিভির সম্প্রচার চালিয়েছিল। যার সম্প্রচার কার্যক্রম চলে মূলত দুবাই থেকে। তবে ভারতের মুম্বাই শহরে আছে অফিস। জানা গেছে, বাংলাদেশে কেবল টিভির কার্যক্রম চালাতেই সীমাবদ্ধ নন জাকির নায়েক। তার সমর্থন নিয়ে ‘পিস স্কুল’ নাম দিয়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাও করছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াত-শিবির। যেখানে শিক্ষার আড়ালে জামায়াতের জঙ্গীবাদী কর্মকা- চলছে বলে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তেও বেরিয়ে এসেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোন পদক্ষেপ নেই। অমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করতে গিয়ে দলটির এক সভায় বলেছিলেন, ‘তাঁর (ডাঃ জাকির নায়েক) কথা মনে পড়লে মন থেকে শুধু দোয়াই আসে। ডাঃ জাকির নায়েক একটি নাম, একটি বিস্ময়। সিনেমার না বাস্তবের হিরো। মা-শা-আল্লাহ! সমকালীন বিশ্বে মুসলিম উম্মার অহঙ্কার তিনি। যেখানেই যাচ্ছেন ডাঃ জাকির, অমুসলিমদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরছেন।’ শনিবার ভারতে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ ও বাংলাদেশে বন্ধের তোরজোরের প্রেক্ষাপটে এখন বিচলিত জামাায়াত-শিবির। শনিবার সকাল থেকেই জামায়াত-শিবিরের ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চলছে ভারতবিরোধী প্রচারণা।

বাংলাদেশের গুলশানে রেস্তরাঁয় হামলার পর ভারতে বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে শনিবার সকালেই পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করতে কেবল অপারেটরদের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে আরও যেসব অনুমোদনবিহীন টেলিভিশন সম্প্রচারে আছে, সেগুলোও বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। যদিও এর আগেও একবার ভারতে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। তারপরও কিছু কেবল অপারেটর এটি বিশেষ ব্যবস্থায় সম্প্রচার করে আসছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশে গুলশানে একটি রেস্তরাঁয় হামলার পর ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জাকির নায়েকের মালিকানাধীন পিস টিভি ও জাকির নায়েকের ভূমিকা নিয়ে আবারও বিতর্ক ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষ করে, গুলশানে হামলাকারীদের দুজনের ফেসবুক থেকে জানা যায় যে তাঁরা জাকির নায়েকের বক্তব্যে জঙ্গী হামলায় উদ্বুদ্ধ হন। এটি জানার পরই জাকির নায়েকের জনসমক্ষে দেয়া বক্তব্য তদন্ত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী।

সর্বশেষ ভারতের উত্তর প্রদেশের মুসলিম নেতারা জাকির নায়েককে ইসলামবিরোধী ও ভারতবিরোধী আখ্যা দিয়ে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ এবং তাঁকে গেফতারের দাবি জানান। গত কয়েক দিন ধরেই মুম্বাইয়ে অবস্থিত জাকির নায়েকের ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে রেখেছে। এর মধ্যেই পিস টিভি সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেয় সরকার। এর দুদিন আগেই অবশ্য ভারতের অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন দেশটির স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজ্জু। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশের অনুরোধ পেলে জাকির নায়েকের প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করার কথা ভাবতে পারে তারা। তিনি বলেন, ভারতে একটি আইন রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা যায়। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আমরা নিষিদ্ধ করতে পারি ওই আইনে। ওই আইনে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এ পর্যন্ত নেয়া হয় না। তবে যেহেতু বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়টিকে ভারত ‘সর্বোচ্চ’ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, সেহেতু ভারত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ওই আইন ব্যবহারের কথা ভাবতে পারে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বলেন. আমরা যদি ঢাকা থেকে অনুরোধ পাই, তাহলে জাকির নায়েককে নিষিদ্ধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।

এদিকে জানা গেছে, কেবল ঢাকার জঙ্গীরাই নয়, জাকির নায়েকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আইএসে যোগ দিতে গিয়েছিল সিরিয়া ফেরত মুম্বাইয়ের আরিব মজিদও। ভারতীয় গোয়েন্দাদের জেরায় নিজেকে জাকিরের ভক্ত বলে জানিয়েছে এককালে আইএসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরিব। জাকির নায়েকের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে জিহাদের প্রতি তার মনোনিবেশ আরও বাড়ে বলে জানিয়েছে সে। ইরাক ও সিরিয়ায় দীর্ঘদিন আইএস থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার পর ২০১৪ সালের নবেম্বর মাসে নিজের বাড়িতে ফেরে আরিব। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ। বিহারের একটি গ্রন্থাগার থেকেও সম্প্রতি জাকিরের ভাষণের অনেক সিডি মিলেছে। ওই গ্রন্থাগারটিতে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের যাতায়াত রয়েছে বলে বলছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো।

জঙ্গীবিরোধী প্রচারণার নামে তহবিল সংগ্রহ করে পিস টিভিতে ঢেলেছেন জাকির নায়েক!

২০০৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান খোলা হয় যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্মিলন বাড়ানো, সন্ত্রাসবাদের শিকার তরুণদের মাদক থেকে রক্ষা করার মতো বিষয়গুলো। ড. জাকির নায়েক এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত। ২০০৭ সালে এর নিবন্ধন হয়। তখন জাকির নায়েক ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, জাকির নায়েক ওই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা নিয়ে তা অপপ্রচারমূলক প্রতিষ্ঠান পিস টিভিতে বিনিয়োগ করেছেন। এ সংক্রান্ত বহু তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাকির নায়েক মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা নিয়েছেন ওই প্রতিষ্ঠানের নামে। ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল-এর অফিসটি এখন লন্ডনের ইডব্যাস্টন থেকে পরিচালিত হয়।

ইন্ডিয়া টুডে তাদের হাতে থাকা নথির বরাত দিয়ে বলছে, ২০১৫-২০১৬ সালে ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল ৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৯০ ব্রিটিশ পাউন্ড অর্থ সহায়তা পায়। ওই অর্থবছরে তারা দাতব্য কাজে ব্যয় করে ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪৯০ পাউন্ড। তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাতব্য কাজে ব্যয়কৃত ৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪৯০ পাউন্ড অর্থের মধ্যে ৭ লাখ ৭১ হাজার ২১৮ পাউন্ডই ব্যয় করা হয়েছে পিস টিভির নামে। সেই হিসেবে বাৎসরিক আয়ের ৭৯ শতাংশ তহবিলই পিস টিভিতে ঢালা হয়েছে। আর ২০১৪-২০১৫ সালে ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল নামে তোলা দাতব্য ফান্ডের ৯১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে পিস টিভির পেছনে। ইন্ডিয়া টুডের তথ্য অনুযায়ী, ৭ বছরে ৯ মিলিয়ন পাউন্ডকে ভারতীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে ৭৮০ মিলিয়ন ভারতীয় রূপি পিস টিভিতে ঢেলেছেন জাকির নায়েক।

জাকির নায়েককে গ্রেফতার দাবি ভারতের মুসলিম নেতাদের ॥ জাকির নায়েকের কার্যক্রম ইসলাম ও ভারতীয় সংস্কৃতির বিরোধী অভিযোগ তুলে তাকে গ্রেফতারের জোর দাবি জানিয়েছেন ভারতের উত্তর প্রদেশের মুসলিম নেতারা। গত দু’দিন বিভিন্ন ঈদগাহে দেয়া বক্তৃতায় তারা ‘সন্ত্রাসবাদে উস্কানি’ দেয়ার অভিযোগে জাকির নায়েক ও তার ‘পিস টিভি’ নিষিদ্ধের দাবি জানান।

তারা অভিযোগ করেছেন, ইসলামের যে ব্যাখ্যা তিনি সেসব বক্তৃতায় দেন, তা নিয়ে ঠিক নয়। তার বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বহু তরুণ জঙ্গীবাদে ঝুঁকছে। উত্তর প্রদেশের বারেলি অঞ্চলের ইমাম মওলানা শাহাবুদ্দিন রেজভি বলেন, ঢাকার ক্যাফেতে হামলাকারীরা জাকির নায়েকের অনুসারী ছিল। তার বক্তব্য সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করছে, মুসলমানদের উগ্র হতে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।

সুন্নী হানাফি বারেলভি গোত্রের এ ইমাম ঈদের নামাজে দেয়া বক্তব্যে জাকির নায়েককে দ্রুত গ্রেফতার এবং তার পিস টিভি ‘অবিলম্বে নিষিদ্ধের’ দাবি জানান। মুসলিম দর্শনের স্কুল বারেলভি আন্তর্জাতিকভাবে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’ নামে পরিচিত। বেরেলি শহরের মুসলমান বিচারক (কাজী) মওলানা আসজাদ রাজা খানও বিতর্কিত বক্তা জাকির নায়েকের ‘ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য’ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছেন। আসজাদ রাজা তার বক্তৃতায় বলেন, নায়েকের বক্তব্য ইসলাম ও ভারতের সংস্কৃতিবিরোধী। এজন্যই ২০০৮ সালে এলাহাবাদ, কানপুর ও লক্ষেèৗতে তার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশেও বন্ধের উদ্যোগ, অপেক্ষায় কেবল অপারেটররা ॥ জাকির নায়েকের কথায় তরুণরা জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে তার পরিচালিত পিস টিভির সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু শনিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই টিভিটি সম্পর্কে কিছু অভিযোগ আমাদের গোচরীভূত হয়েছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হবে। রবিবার (আজ) মন্ত্রণালয়ের অফিস খুললেই কাজ শুরু হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে সরকারের স্ট্যান্ড আমরা স্পষ্ট করব। কবে নাগাদ সিদ্ধান্ত আসবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রবিবার অফিস খুলবে। এর পরই আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তবে ভারতের মতো বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে কি-না তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

কারণ এরই মধ্যে শরিবার ভারতীয় এক গণমাধ্যমকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, জাকির নায়েক বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। তদন্ত ছাড়া এমন একজন জনপ্রিয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন কেবল অপারেটররা। তারা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা এলে তাৎক্ষণিকভাবে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেবেন তারা। কেবল অপারেটরদের সংগঠন বাংলাদেশ কেবল ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর হোসেন আখতার বলেন, আমি নিজেও আগে ওই চ্যানেলটি মাঝেমধ্যে দেখতাম। তবে গুলশানের ঘটনা ঘটার পর বুঝলাম যে, আমি যেভাবে এ চ্যানেল দেখতাম, অনেকেই সেভাবে দেখেন না। আমরা পুরো দেশেই চ্যানেলটি বন্ধ করে দিতে চাচ্ছি। তবে সরকারের কোন নির্দেশনা না থাকায় এ মুহূর্তে তা সম্ভব হচ্ছে না।

কেবল অপারেটরদের অপর সংগঠন কেবল অপারেটর্স বাংলাদেশের (কব) সাবেক সভাপতি এসএম আনোয়ার পারভেজ জানান, এরই মধ্যে ঢাকার কিছু এলাকায় পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশটা শান্তিপ্রিয় দেশ। আমাদের কোন প্রয়োজন নেই পিস টিভির। সরকারের নির্দেশনা পেলে সারাদেশে পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কেবল অপারেটররা বলেছেন, টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের এখতিয়ার আগে কেবল অপারেটরদের হাতে থাকলেও গত পাঁচ বছর ধরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী চ্যানেল সম্প্রচার করছেন তারা।

পিস টিভি বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন দেশের আলেম-ওলামারাই ॥ পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম, ওলামা, মাশায়েখরা। ইসলামবিরোধী তথ্য প্রচারের দায়ে এ চ্যানেলটিকে অভিযুক্ত করেছেন তারা। পুলিশ সদর দফতরে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান তারা। এর প্রেক্ষিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেছিলেন, জঙ্গীবাদী প্রচার চালালে তা তথ্য মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। চ্যানেলটি যদি জঙ্গীবাদী প্রচার চালায় তাহলে তা বন্ধ করে দেয়া উচিত। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত ওই মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার অন্তত ৩৫ জন অধ্যক্ষ, বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও খতিবরা অংশ নেন।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের দু’জন শিক্ষকও এতে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় দেশে জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ইসলামী চিন্তাবিদ ও ওলামা-মাশায়েখদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলা হয়। এতে আলেম-ওলামাদের সহযোগিতা চান পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তারা। এ সময় আলেম-ওলামারা বলেন, ইসলামের সঙ্গে জঙ্গীবাদের কোন সম্পর্ক নেই। কেউ কেউ ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে জঙ্গীবাদকে উস্কে দিচ্ছে, যা ইসলাম ধর্মের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবর্নর শায়খ খন্দকার গোলাম মওলা বলেন, পিস টিভি ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাই এর সম্প্রচার বন্ধ করতে হবে।

কমলাপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা খাজা আরিফুর রহমান বলেন, জঙ্গীবাদ নির্মূলে মসজিদে ইমামদের বয়ান দিতে হবে। যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদ ও কাদের মোল্লার ফাঁসির সময় বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইমামদের তালিকা তৈরি করতে হবে। এতে যারা জঙ্গীবাদ উস্কে দিচ্ছেন তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাবে। মোহাম্মদিয়া জামিয়া শরিফের উপদেষ্টা আল্লামা মোহাম্মদ মাহবুব আলম আরিফ বলেন, জঙ্গীদের একই কারাগারে রাখা হচ্ছে। এতে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা। ওলামা-মাশায়েখ ঐক্যজোটের সভাপতি মুফতি হালিম সিরাজি বলেন, যারা বিদেশীদের হত্যা করেছে তারা কোরান-হাদিস থেকে অনেক দূরের বাসিন্দা। মাওলানা শাহ সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ বলেন, ইসলাম শান্তি, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যরে ধর্ম। একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়িয়ে জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করছে। এরাই এক সময় পল্টনে সেøাগান দিয়েছেÑ ‘বাংলা হবে আফগান, আমরা হব তালেবান।’

জামায়াতের ‘পিস স্কুল’, চলছে জঙ্গীবাদী কর্মকা- ॥ দেশের ছয়টি জেলায় পরিচালিত ২৭টি পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এ্যান্ড কলেজ জামায়াতের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘পিস’ শব্দটি ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের শতাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদনের বাইরে জামায়াতের দলীয় আদর্শের পাঠ্যবই পড়ানো হয়। এসব স্কুলের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। আবার কোন কোন স্কুল পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও রয়েছেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, নোয়াখালী, ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় নামে-বেনামে পরিচালিত স্কুলগুলোকে জামায়াত-শিবির সাংগঠনিক কাজে ব্যবহার করছে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পিস স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জামায়াত-শিবিরের নেতা ও জড়িত সরকারী কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে এতে। এছাড়া স্কুলের আয়ের উৎস ও ব্যয় খতিয়ে দেখতেও বলা হয়েছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলার কথাও আছে প্রতিবেদনে।

এছাড়া প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এসব প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার জন্য দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে নির্দেশ দেয়ার সুপারিশও আছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, এসব স্কুলের বিষয়ে আমাদের কাছেও গুরুতর অভিযোগ এসেছে। আমরা শিক্ষা বোর্ডগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে জানতে চেয়েছি কিভাবে স্কুলগুলো অনুমোদন পেয়েছে, কারা এসব অনুমোদন দিয়েছে আর অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেছেন কারা। এছাড়া যেসব অভিযোগ এসেছে তা তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। প্রতিবেদনে পিস স্কুলের শিক্ষার্থীরা উগ্র ধর্মীয় মতবাদে দীক্ষিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোন কোন পিস স্কুল পরিচালিত হয় ‘ইনভাইটস পিস লিমিটেড’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের রোকন আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ।

ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক ও বর্তমানে ঢাকা মহানগর জামায়াতের রোকন আলমগীর মোঃ ইউনুস। পিস স্কুলে কেন্দ্রীয় জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ড. আহসান হাবীব ইমরোজ সম্পাদিত বাংলা বই, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী ও মতিউর রহমান নিজামীর লেখা সাংগঠনিক বই পড়ানো হয়।