২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিমানবন্দরের সদরে অন্দরে

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে বিদেশীদের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ অব্যাহত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোন বিকার নেই। যেন সব অভিযোগই তাদের গা সওয়া। সমস্যা সমাধান তাদের কর্ম অভিধানে সংযোজিত না থাকায় তারা দিব্যি সময় কাটিয়ে দিচ্ছেন নিরুদ্বেগে, আলস্যে। দায়-দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ- এ সবই তাদের কাছে বাহুল্য, তাই বর্জিত। নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা তাদের মনেও আসে না। বরং উৎপাত আর হট্টগোলই তাদের প্রিয়। তাই দেখা যায়, সৌদি আরব ফেরত প্রধানমন্ত্রীর বিমানটি নির্দিষ্ট সময়ে অবতরণ করতে না পেরে একত্রিশ মিনিট চক্কর দিয়েছে আকাশে। রানওয়েতে ধাতব পদার্থ পড়ে থাকা ও তা দীর্ঘ সময়েও অপসারণ না করায় অবস্থা এমনটা দাঁড়ায়। এই ধাতবে সংঘর্ষ ঘটলে সৌদি ফেরত বিমানটি দুর্ঘটনাকবলিত হতো। রানওয়ে পরিষ্কার রাখার স্বাভাবিক দায়িত্বটুকুও কর্তৃপক্ষ অনুভব করেনি। প্রধানমন্ত্রীর বিমান অবতরণ নিরুদ্বিগ্ন করার জন্য কোন তৎপরতাই চালায়নি। এমনকি বিষয়টি তদন্তেও গাফিলতি চালিয়ে যাচ্ছে। এই হচ্ছে তাদের বৈশিষ্ট্য।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ত্রুটি ও অনিয়ম অবশ্য নতুন কিছু নয়। পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক জান্তা শাসনামলে আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরটি হয়ে ওঠে চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য। নানা ধরনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা হয়ে ওঠে প্রধান নিয়ামক। যার রেশ আজও কাটেনি বরং সম্প্রসারিত হয়েছে সর্বত্র। এসব অনিয়মের সঙ্গে শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র জড়িত দীর্ঘকাল ধরেই। তারাই আসলে বন্দরের অনিয়ম-দুর্নীতির বরকন্দাজ। এরা পারে না সম্ভবত এমন কিছু নেই। এদের ধরবে, সাধ্য কার? বরং এদের থেকে ‘বখরা’ পাওয়ার আনন্দে মাতোয়ারা সংশ্লিষ্টরা।

চোরাচালানির স্বর্গরাজ্য তো এখন স্বর্ণরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রচুর স্বর্ণ আসে এই বন্দর দিয়ে। অধরাই যেন এসব স্বর্ণ খনির মালিক-বাহকরা। লাগেজ চুরি, মালামাল পাচারের ঘটনা এখানে অত্যন্ত স্বাভাবিক। এসব কাজে পেশাদাররা নিয়োজিত এবং তাদের দক্ষতা অতুলনীয়। ‘ওধার কা মাল ইধার’ করার কাজে এরা ভীষণ পটু। বন্দরের অনিয়ম হ্রাস করার কথা বলা হয়, অনেকটা বলার জন্য বলার মতো। কর্মকর্তা-কর্মচারী অদল-বদল হলেও অবস্থার গুণগত ও মানগত পরিবর্তনের কোন লক্ষণ তেমন দেখা যায়নি। এদের আর্থিক সাম্রাজ্য এত বিশাল যে, তাদের অনুকম্পায় বেঁচে থাকাটাই সার্থক বুঝি সংশ্লিষ্টদের। সর্বশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ থাকায় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যের পর এবার জার্মানের একটি বিমান সংস্থাও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কার্গো পরিবহনে। গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর গত মার্চে যুক্তরাজ্য অনুরূপ পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্রিটিশ কোম্পানি রেড লাইনকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হলেও সামান্য সাফল্যও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বরং তারা উর্ধতন কর্মকর্তাদের ব্রিটেন ভ্রমণ করাতে পারদর্শিতার স্বাক্ষর রাখছে। এদের করায়ত্ত করতে যতটা নিবেদিত, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে তা নয়, সেটা সহজেই অনুমেয়। সর্বশেষ জার্মানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছে সে দেশের বিমান সংস্থা। তারা যে খুব সন্তুষ্ট তা-ও নয়। যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নিষেধাজ্ঞার প্রভাব হবে ব্যাপক। আকাশপথে যাওয়া পণ্যের ৩৫ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং এর ৯০ শতাংশই যুক্তরাজ্যে। আর জার্মানি হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রফতানি পণ্যের দেশ।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশ সিভিল এ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই নিরাপত্তাহীনতা দূর হচ্ছে না। প্লেট ও স্ক্যানার কেনা এবং পরিচালনাসহ কার্গো কমপ্লেক্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতদ্বৈধতা তীব্র দুটি সংস্থার মধ্যে। কেউ কাউকে পরোয়া করে না। এদের বিরোধ দেশের রফতানি বাণিজ্যকে হুমকিতে ফেলেছে। বিনা স্ক্যানে অবাধে পণ্য সামগ্রীও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে ওঠানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় এই একটি ক্ষেত্রে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নিয়েছে বলে জানা যায় না। দেশবাসী প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে সক্রিয় হোক দেশবাসী তাই চায়।