১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বুদ্ধি, আবেগ এবং দক্ষতা

  • জাকারিয়া স্বপন

এমন রক্তাক্ত ঈদ আগে কখনও দেখিনি। গুলশান হামলা, তারপর আবার হামলার হুমকি, চট্টগ্রামের মিতু হত্যার আসামিদের ক্রসফায়ার, ঈদের দিন শোলাকিয়ায় জঙ্গী হামলা, ইরাকে হামলা, সৌদি আরবে মহানবীর কবরের পাশে হামলা এবং আমেরিকায় সাধারণ মানুষসহ ৫ জন পুলিশ নিহত। ঈদের এই ছুটিতে এতকিছু ঘটে গেছে। এটাকে আর খুশির দিন বলা যাচ্ছে না।

পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশও নতুন জটিল একটা সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। হাজার বছরের বাঙালী বিবর্তনের ধারায় নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হয়েছে। সবার মুখে একই কথা- কিভাবে উত্তরণ হবে এই কঠিন সময়ের।

বর্তমানের জটিল পৃথিবীতে কোন কিছুতে সাফল্য আনতে তিনটি বিষয়কে সবাই জোর দিয়ে থাকেন। লিডারশিপের ওপর যে কোন বই পড়লেই আপনি দেখতে পাবেন ওখানে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়া হয়- বুদ্ধি, আবেগ এবং দক্ষতা। স্বাভাবিক সময়ে হোক কিংবা জটিল সময়েই হোক আমরা যদি কোন সমস্যার সত্যিকার সমাধান চাই, তাহলে এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হয়। এটা অনেকটা ত্রিভুজের মতো। কোন একটি কমবেশি হলেই ফল ভিন্ন হয়ে যাবে।

অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেন, ধুৎ এগুলো বইয়ের কথা। বাস্তবে এগুলো চলে না। বাস্তবের সমস্যা সমাধান করতে হয় অনেক রকমের টেকনিক দিয়ে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমস্যা। কিন্তু আপনি যদি খুব ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি চিন্তা করেন দেখবেন নানান বিষয়ে আপনার করা সমাধানগুলো এই ফরমেটে এসে মিলবেই। আপনার ব্যক্তিগত কোন সমস্যা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কিংবা আন্তর্জাতিক কোন সমস্যা এই তিনটি বিষয়কে এক করতে পারলে ভাল কিছু বয়ে আনবে।

তবে শর্ত একটাই- আপনি সমস্যার আসলেই কোন সমাধান চান কি-না। যদি মনে মনে এটাকে সমাধান করতে না চান তাহলে ভিন্ন কথা। চলুন দেখি, আমরা জঙ্গী ইস্যুতে ওই তিনটি বিষয় যথাযথভাবে ব্যবহার করছি কি-না।

॥ দুই ॥

আমরা কি সন্ত্রাসী এই হামলায় যথেষ্ট বুদ্ধি ব্যবহার করেছিলাম? আমি পুরো জঙ্গীবাদের কথা যদি বাদই রাখি, শুধু গুলশানের এই একটি ঘটনাকে যদি চুলচেরা বিচার করি তাহলে আমরা বুকে হাত দিয়ে সততার সঙ্গে কি বলতে পারব, আমরা বুদ্ধিমত্তাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগিয়েছিলাম?

যে দুজন পুলিশ অফিসার মারা গেলেন তারা কি যথেষ্ট বুদ্ধি ব্যবহার করেছিলেন? তারপর অন্য বাহিনীগুলো ঘটনাস্থলে আসল। তারাও কি যথেষ্ট বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিল? তার সঙ্গে যুক্ত হলো মিডিয়া। তারাও কি যথেষ্ট বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিল?

সাংবাদিক বন্ধু শরিফুল হাসান তার একটি লেখায় লিখেছেন, ‘এ এক ভয়ঙ্কর সময়। যারা হতে পারত আমাদের ভবিষ্যত তারাই আজ বাংলাদেশের আতঙ্ক। যে ছেলেটা হতে পারত সেরা গণিতবিদ সে আজ খুনী। যার গানে মুগ্ধ ছিল সবাই, তার হাতে আজ অস্ত্র। একটু আগে সাফি ছেলেটার ইউটিউবের গান আর জঙ্গী হিসেবে সিরিয়া থেকে ভিডিও দেখে কেঁদেছি। এরকম শত শত তরুণ আজ বিপথে। কাউকে গালি দিয়ে দোষারোপ করে কিংবা গুলি করে হত্যা করে সমস্যার সমাধান হবে না। টেলিভিশনে টকশো করেও না। সমস্যা সমাধান করতে গেলে সবার আগে সেটা স্বীকার করতে হবে। চারপাশে তাকান। কত মানুষ মনে মনে এদের সমর্থন করে ভাবতেও পারবেন না। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, আপনি এদের ঘৃণা করুন, নাকি সরকার বিরোধিতা হোক কিংবা অন্য যে কোন কারণে হোক আপনি এই জঙ্গীবাদকে সমর্থন করছেন?’

শরিফুল হাসানের মতো আমিও মনে করি, এই দেশে অসংখ্য মানুষ এই ধরনের কর্মকা-কে মনে মনে সমর্থন করে। এর পেছনে তাদের অনেক কারণ থাকতে পারে। আমরা সাদামাটাভাবে কিছু শব্দ ব্যবহার করে সেই কারণগুলোকে যদি এড়িয়ে যাই সেটা কি সঠিক বুদ্ধির প্রয়োগ? নাকি বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হলো?

আমাদের কাছে কি বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে? আমরা কি জানি এই ১৬ কোটি মানুষ কারা? কী তাদের পরিচয়, কতজন স্কুলে যায়, কতজন কলেজে আর কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা মাদ্রাসায়? তাদের পরিবারের তথ্য কি আমরা রাখি? পুরো দেশে আমরা ইন্টারনেট ছড়িয়ে দিয়েছি। আমরা কি জানি, ছেলেমেয়েরা সেখানে কী করে? আমরা কি জানি, যারা দেশে-বিদেশে যাচ্ছে তাদের কে কোথায় কেন যাচ্ছে? আমরা কি জানি, কোন্ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন্ শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন? তাদের পুরো প্রোফাইল কি আমাদের জানা? এগুলো জানাটা কি খুব কঠিন? বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা কি সেই বুদ্ধিটুকু ব্যবহার করছি?

আমার এক বন্ধু সেদিন বলল, ‘বাংলাদেশে একজন মানুষের জঙ্গী হওয়ার পথটা খুব মসৃণ। সামাজিক বাধা নেই বললেই চলে। বরং পুরো পথে ধর্মানুভূতির তেল মাখানো। কোনমতে পা রাখলেই সুরুত করে ঢুকে যাবেন।’ ব্যাপারটা যদি এমনই হয় তাহলে কি বিষয়টিকে আমরা এড্রেস করেছি?

একইভাবে বলা যেতে পারে, আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারাও কি তাদের বুদ্ধিটুকু ব্যবহার করছেন? আমার একজন ডাক্তার বন্ধু বললেন, ‘দেশে জঙ্গীবাদ বা এক্সট্রিমিজম যে একটা মানসিক সমস্যা এই কথাটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না। বরং ব্রেনওয়াশ, কেমিক্যাল দিয়ে ব্রেনওয়াশ ইত্যাদি ভয়ঙ্কর সব অবৈজ্ঞানিক কথা বলা হচ্ছে। ডিপ্রেসিভ ইলনেস একটি ভয়াবহ সমস্যা। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় অবসেশন তাহলে তো কথাই নেই। জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামিক অনুশাসন ঠিকমতো মানতে পারছে না এক ছেলে। নিজের পরিবারের সবাই ঠিকমতো পর্দা করছে না, ঠিক তরিকা মতো নামাজ পড়ছে না। এই নিয়ে অবসেশনে ভুগতে ভুগতে শেষে মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছে। গত তিন মাসে এরকম দুজন রোগী পেয়েছি।’

আমরা কি কখনও এভাবে চিন্তা করেছি? নিজের সন্তানদের নিয়ে ভেবে দেখেছি, সে কোন কারণে হতাশ কি-না? আর সেটাকে এড্রেস করেছি? দেশ কি শুধু সরকারের একার, নাকি আমাদেরও? সময় এসেছে সমস্যাগুলোর প্রতি সৎ হওয়ার এবং যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করার।

॥ তিন ॥

আমরা জাতিগতভাবে আবেগপ্রবণ। শুধু আবেগপ্রবণ বললে কম বলা হবে, আমরা আসলে প্রচ- আবেগপ্রবণ। সে কারণে আমাদের ভেতর হুজুগটাও একটু বেশি। আমরা সকালে কাউকে হিরো বানালাম তো বিকেলেই তাকে জিরো করে ফেললাম। কেন তাকে হিরো বানালাম, আর কেনইবা তাকে জিরো বানালাম- তা আমাদের কাছে অজানা। কিন্তু এভাবেই আমরা ভাবতে এবং জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত।

যারা কোন বিষয়ে সিরিয়াস না তারাই মূলত হুজুগে হয়। কারণ, সে তার কৃতকর্মের জন্য নিজের কাছেই দায়বদ্ধ নয় কিংবা তার ভেতর সেই দায়বদ্ধতার বিষয়টি কাজই করে না। যেমন ধরুন, আপনি কারও সম্পর্কে না জেনেই কিছু মন্তব্য করতে শুরু করলেন। এমন সব মন্তব্য করছেন যার কোন আগামাথা নেই, সবই আপনার মনগড়া। এটা আপনি করতে পারছেন কারণ আপনার ভেতর নিজের ওপর সম্মানবোধ নেই। কেউ যদি আপনাকে এটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে আপনি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে চলে যাবেন। পুরো বিষয়টি নিয়ে আপনার এতটুকু খারাপ লাগবে না। এটাই বাঙালী। কেউ আমাদের বলল, চল যুদ্ধে যাই কিংবা চল মিছিল করে আসি। কারণ সরকার চালের দাম অনেক দিন ধরে বাড়াচ্ছে না। ব্যাস, আপনি মিছিল করতে নেমে গেলেন- ‘চালের দাম বাড়ছে না কেন, জবাব চাই।’ চালের দাম বাড়লে ভাল, নাকি না বাড়লে ভাল- সেটা দেখার সুযোগ কই? এমন হাজারো উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে বাঙালী তার দায়িত্বশীলতাকে এড়িয়ে গেছে অতিরিক্ত আবেগের কারণে। অতিরিক্ত আবেগতাড়িত মানুষ কোন কিছু ততটা না ভেবেই কাজে নেমে পড়েন।

গুলশানের ঘটনাতেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে শুরু করে মিডিয়া এবং জনগণÑ সবাই আবেগে মারা যাচ্ছেন। অতিরিক্ত আবেগে তারা তাদের কাজের ধারাটি ঠিক রাখতে পারছেন না। তাই বার বার আমাদের হোঁচট খেতে হচ্ছে।

এটার অবশ্য একটা ভাল দিকও আছে। এই দেশের মাটি এই দেশের মানুষকে আবেগী করে তুলেছে। তারা জীবনের বিষয়ে একটু উদাসী। কবি এবং কবিতার প্রভাব অনেক বেশি। তাই এই জাতির ভেতর জঙ্গীবাদ তৈরি করা পৃথিবীর আরও অনেক দেশের চেয়ে কঠিন হবে। এই দেশের মানুষ হুজুগে কিংবা আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে পেটাতে পারবে, মেরে ফেলতে পারবে; কিন্তু পরক্ষণেই আবার তার জন্য কান্নায় বুক ভাসাবে। প্রকৃতিগত কারণেই এই অঞ্চলের মানুষ ততটা সাহসীও নয়। দুর্গম কোন কিছু এদেরকে ছুঁয়ে যায় না। এরা মূলত শান্তি চায়। একবেলা না খেয়ে থাকলেও কোন হাঙ্গামায় জড়াতে চায় না। আর যখন কোন হাঙ্গামায় জড়ায় তখন সেটা যুক্তিতর্ক দিয়ে জড়ায় না। আবেগের তাড়নায় জড়ায়।

কিন্তু নতুন প্রজন্মের অনেকেরই এই মাটির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তারা জানে না এই দেশে কতগুলো ঋতু। তারা জানেই না এখানে নদীগুলো কিভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, তারা জানে না বৃষ্টি হলে মাটি থেকে ঠিক কেমন একটা গন্ধ ছড়ায়, তারা জানে না হেমন্তের বাতাসে ধানের ঘ্রাণটি কেমন। তাই তাদের ওপর এই মাটির প্রভাব খুব কম। তবে এদের যে যুক্তি জ্ঞান নেই তা কিন্তু নয়। এরা সমাজে নানা ধরনের অনিয়ম দেখতে পায়; কিন্তু সেগুলো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

এদের যদি কেউ ভিন্ন যুক্তি দিয়ে ডটগুলো যুক্ত করে দেয়, এরা তখন সেটাতে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এরা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, কারণ এদের ভেতর এক ধরনের যুক্তি আছে। এরা ততটা আবেগতাড়িত নয়। তারা মাথাকে ব্যবহার করে। কিন্তু সেই মাথা হয়ত ভিন্ন যুক্তি দ্বারা পরিচালিত। তাই আমরা সমাজের উঁচুতলার অনেক মানুষকে দেখছি তারা জঙ্গীবাদে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং আবেগতাড়িত হয়ে কিছু করছে না। বড় পরিকল্পনা করে, সময় নিয়ে, সাহস করে ঠা-া মাথায় বড় ধরনের নাশকতা করছে। তাদের ভেতর কিন্তু কোন আবেগ নেই। অন্তত আমাদের মতো অতিরিক্ত আবেগ নেই। তারা খুব ভাল করেই জানে তারা কী করতে যাচ্ছে।

এদের রুখতে গেলে আমাদের নিয়ন্ত্রিত আবেগ লাগবে। আমরা যদি অতিরিক্ত আবেগ প্রদর্শন করি কিংবা অতিরিক্ত আবেগ দ্বারা চালিত হই- তাহলেই বিপদ। সেক্ষেত্রে সমস্যাটার কোন সমাধানই হবে না। আমরা যদি সত্যি এই সমস্যার সমাধান করতে চাই, তাহলে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত আবেগ। হানিফ কিংবা নাসিম সাহেবের মতো আঙ্গুল তুলে ধমকের সুরে অতিরিক্ত আবেগী হয়ে বর্তমান সময়ের তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এরা নিজের মা-বাবার কথাই ঠিকমতো শোনে না, আর ওই আঙ্গুলের ভয় এরা করে নাকি? দেশের স্বার্থে অতিরিক্ত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন।

॥ চার ॥

বুদ্ধিমত্তা এবং নিয়ন্ত্রিত আবেগ থাকার পরেও আপনি সমস্যাটির সমাধান নাও করতে পারেন। আপনি ব্যর্থ হয়ে যেতে পারেন, যদি আপনার দক্ষতা না থাকে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো দক্ষতার। আমরা বেশিরভাগ বিষয়েই সঠিক দক্ষতা অর্জন করিনি। গুলশান হামলার দিন সবাই লাইভ দেখতে পেয়েছে, এই ধরনের ক্রাইসিস ব্যবস্থাপনায় আমাদের দক্ষতা কতটুকু। এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কিছু বলা যাবে। কিন্তু এই লেখার উদ্দেশ্য সেটা নয়। তাই আমি ওদিকে যাচ্ছি না।

তবে আমরা যে পরশ্রীকাতরতাটুকু বাদ দিয়ে আর কোন কিছুই দক্ষভাবে করতে পারি না সেটা নিশ্চিত। পরশ্রীকাতরে আমরা খুবই দক্ষ। প্রয়োজনে নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করতে প্রচ-ভাবে চৌকস আমরা। এর বাইরে অন্য কোন কিছু তৈরি করা এবং সেটা সঠিকভাবে মেইনটেইন করার দক্ষতা কি আমাদের আছে? একটি ছোট বিমানবন্দর পরিচালনা করার যে দক্ষতা আমাদের নেই তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টয়লেটে গেলেই জানা যাবে। আমরা মূলত ‘পোর পারফরমার।’

আমরা সবকিছুই যেনতেন উপায়ে ভাবতে অভ্যস্ত। লেখাপড়ার কথা ধরেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি একটি দক্ষ ব্যবস্থা? শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, তাদের ক্যারিয়ার এবং ক্যারিয়ারে গিয়ে কী করবে- এগুলো কি আমরা সুন্দর করে গুছিয়ে করছি? নাকি ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা করে দিয়েই সুখী হয়েছি? আমরা কি দক্ষ ডাক্তার তৈরি করেছি? দক্ষ প্রকৌশলী? দক্ষ পুলিশ অফিসার? দক্ষ আমলা? দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব? না, আমরা কোথাও পৃথিবীর মানদ-ে তেমন কোন দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি। তাই বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে এবং তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেখে আমরা মহাখুশি। কারণ, এত টাকা তো আমরা জীবনেও দেখিনি। কিন্তু আমরা যে এটাকে বাড়িয়ে ৫০ বিলিয়ন কিংবা ৯০ বিলিয়ন করতে পারি- সেটা কি আমরা মানি? সেটা করতে দক্ষতা লাগবে। আমরা তো সেই রাস্তায় নেই।

কোন একটি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করলে যে কী বিশাল উন্নতি হয়, সেটা পোশাক শিল্পের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আমরা যদি চিকিৎসাসেবায় দক্ষতা অর্জন করতে পারতাম, তাহলে বাংলাদেশ হতে পারত থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরের চেয়েও বড় স্বাস্থ্যসেবা খাত। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যদি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারত, তাহলে এই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আমাদের দক্ষতা খুব কম বলেই আমাদের ভেতর কেউ কেউ একটু ভাল করলে আমরা সেটা নিয়ে এত বেশি লাফাতে থাকি- যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের প্রাপ্তি কতটা কম!

কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন একটি কাজ। একটি বিষয় মুখে বলে দেয়া যতটা সহজ, সেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টের। আর সঠিক চেষ্টা এবং যোগ্যতা ছাড়া দক্ষতা অর্জন করা অসম্ভব। বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রমোশন হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়, নয় তো আত্মীয়তার সূত্র ধরে। তাই সর্বত্র অদক্ষ মানুষের ছড়াছড়ি। এই বিশাল অদক্ষ জনশক্তি নিয়ে দেশ বেশিদূর যেতে পারবে না।

এ দেশে অদক্ষ শিক্ষক, অদক্ষ ডাক্তার, অদক্ষ প্রকৌশলী, অদক্ষ আইনজীবী, অদক্ষ আমলা, অদক্ষ পুলিশ, অদক্ষ রাজনীতিবিদ, অদক্ষ মানুষের ভিড়ে কিছু মানুষ দেশটাকে ঠেলে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যেই জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অদক্ষতা, সেটাকে উন্নত করার তেমন কোন চেষ্টাও নেই- সেই সমাজে যাবতীয় খারাপ জিনিস মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? নাকি আমরা এই চরম অদক্ষতা নিয়েও আশা করছি আমরা একটি চমৎকার ফুলের বাগান বানাব?

॥ পাঁচ ॥

গত ৭ জুলাই বিখ্যাত নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের ওপর একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন খারাপ সম্পাদকীয় আমি এর আগে কখনও পড়িনি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঘটার পর পৃথিবীর অজস্র মিডিয়া বাংলাদেশ নিয়ে লিখেছে এবং রিপোর্ট করেছে। সারাবিশ্ব যখন জঙ্গীবাদকে মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের এই ঘটনাপ্রবাহ সবার নজরে আসবে- সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি মিডিয়ার তার শব্দ চয়ন এবং দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে এক ধরনের মনোভাব বুঝতে পারা যায়। সেই হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশ সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনারও একটা চেষ্টা থাকা দরকার। সেক্ষেত্রেও দক্ষতাটা খুব জরুরী। আমি চাইলাম আর হুট করেই সেটা হয়ে যাবে- ব্যাপারটা তো এমন নয়। এসব ক্ষেত্রে প্রচ- ক্যাপাবল মানুষ না ব্যবহার করলে উল্টো ফলই হতে পারে। হয়ত এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

তবে পত্রিকাটি উপদেশ হিসেবে কিছু কথা বলেছে যার একটু কোট করা যেতে পারে- ‘দেশে কারা চরমপন্থী তৈরিতে সাহায্য করছে, কারা হামলাকারীদের অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে, শেখ হাসিনার সরকারের এখন এসব খুব দ্রুত খুঁজে বের করা দরকার। এ ধরনের হামলা ঠেকানোর জন্য তাঁর সরকারের প্রস্তুতির অভাব এবং হামলা হওয়ার পর দ্রুত সাড়া দিতে তাদের সক্ষমতার অভাবের দিকে অবশ্যই ভালভাবে নজর দেয়া দরকার।’

আমার জনৈক সাংবাদিক বন্ধু লিখেছেন, “সরকার রাজনীতিবিদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাবা-মা সাধারণ নাগরিক সবার কাছে অনুরোধ- বাংলাদেশটা বাঁচান। আরও দেরি হয়ে যাবার আগে চলুন আমরা সবাই দায়িত্বশীল হই। আমি এই লেখা লিখতে লিখতে কাঁদছি। সবার কাছে আমার করজোড়ে মিনতি, চলুন আমরা সবাই মিলে লাল-সবুজের এই বাংলাদেশটা বাঁচাই। একবার মন থেকে গেয়ে উঠুন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’- দেখবেন কান্না পাবে। আসুন, আমরা শোধরাই আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগে।”

কিন্তু আমি মনে করি, কান্নাকাটি করে দেশ বাঁচানো যায় না। এই পৃথিবীর অনেক দেশ অন্যরা নিয়ে নিয়েছে। তারাও নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করেছিল। দেশ বাঁচাতে চাই যোগ্যতা। এই শতাব্দীতে দেশ বাঁচাতে হলে যোগ্যতার কোন বিকল্প নেই। সেই যোগ্যতা শিক্ষার, সেই যোগ্যতা সুশাসনের, সেই যোগ্যতা ডিপলোম্যাসির, সেই যোগ্যতা ট্রান্সপারেন্সির, সেই যোগ্যতা প্রযুক্তির, সেই যোগ্যতা সততার, সেই যোগ্যতা মানুষকে ভালবাসা, সেই যোগ্যতা দক্ষ মানুষ তৈরি করার, দক্ষ সিস্টেম তৈরি করার, আর দল-মত নির্বিশেষে যোগ্য মানুষগুলোকে সঠিক স্থানটিতে বসতে দেয়ার। যতদিন কোন একটি রাষ্ট্র সেখানে পৌঁছতে পারবে না, ততদিন সেই রাষ্ট্র স্ট্রাগল করবে- এটাই স্বাভাবিক। আমরা কোন্দিকে যাব সেটা বুঝতে হবে আমাদেরই।

॥ ছয় ॥

সবশেষে একটা কৌতুক না লিখে পারলাম না। বুশ আর তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বসে গল্প করছেন। তো পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি বুশ মিয়া, দুজনে কী নিয়ে এত ফুসুর-ফাসুর কর?

জবাবে বুশ বললেন, ইরাকে দুই লাখ মানুষ মারব, আর একটা টায়ার ফুটা করব।

এ কথা শুনে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন, দুই লাখ মানুষ মারবা বুঝলাম; কিন্তু টায়ার ফুটা করার বিষয়টা মাথায় আসছে না যে! ওইটা কেন করবা?

এবার বুশ তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, দেখছ, কইলাম না দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর চেয়ে টায়ারের ব্যাপারে সবাই আগ্রহী হবে!

পুনশ্চ, আমাদের যেন টায়ারের ব্যাপারে আগ্রহটা বেশি না হয়।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ

ys@pri“o.com