২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বেশ কিছু মসজিদ মাদ্রাসার ওপর

  • জঙ্গীবাদের উৎস সন্ধানে ব্যাপক তৎপরতা শুরু

গাফফার খান চৌধুরী ॥ জঙ্গীবাদের উৎসের সন্ধানে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু মসজিদ-মাদ্রাসার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নামাজ শেষে মসজিদে বয়ানকারীদের বয়স ও লেবাস বিষয়ে সর্তক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে। বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের সকল বিভাগীয় শহরের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা ও ধানম-ি এবং চট্টগ্রামে অবস্থিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জঙ্গী মনিটরিং সেল পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করছে। সরকার সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গী দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময়মতো পারদর্শিতা দেখাতে পারলে তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।

গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলায় ২ পুলিশ কর্মকর্তা, ১৭ বিদেশীসহ মোট ২২ জন নিহত হন। এ ঘটনার পর সারাদেশেই নীরব রেডএলার্ট চলছে। সারাদেশেই নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুলশানের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ক মনিটরিং সেলের কার্যক্রম নিয়ে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে সেলটির সদস্য করা হয় শিক্ষা, তথ্য, স্থানীয় সরকার ও ধর্ম মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশ ও র‌্যাবের প্রধানের। সেলের সদস্যদের কার্যক্রমও ভাগ করে দেয়া হয়েছিল।

নির্দেশ মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের জঙ্গী অর্থায়ন অনুসন্ধান করার কথা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি ইতোমধ্যেই কয়েকটি বেসরকারী ব্যাংকের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ১০ সদস্যের একটি মনিটরিং সেলের সদস্যদের প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন মসজিদে উপস্থিত থেকে জুমা’র নামাজের প্রাক্কালে খুতবা পড়ার আগে ইমাম জঙ্গীবাদবিরোধী বক্তব্য দেন কি-না তা মনিটরিং করার কথা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচার চালানো হয় কি-না তা মনিটরিং করা। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে কোন জঙ্গী সংগঠনের বিস্তার ঘটতে না পারে এজন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সকল গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত তদারকির কথা ছিল। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি, স্বীকৃতি নবায়ন ও শাখা অনুমোদনের ক্ষেত্রে জঙ্গীবাদবিরোধী কার্যক্রম চালানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জঙ্গীবাদবিরোধী কার্যক্রম না চালালে ওসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। শ্রেণী কক্ষের পাঠদান গাইডে জঙ্গীবাদবিরোধী দিকনির্দেশনা রাখা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকেও জঙ্গীবাদবিরোধী কারিক্যুলাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ের অভাবে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে জঙ্গীবাদের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ডকুমেন্টারি, নাটিকা, শর্ট ফিল্ম, বিজ্ঞাপন চিত্র, ভিডিও ক্লিপ প্রস্তুত ও তা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার চালানোর কথা ছিল। এমনকি নতুন মিডিয়ার অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচার চালানো বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা আছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনিটরিং সেলের কার্যক্রম চলছিল ঢিমেতালে। এ কারণেই গুলশান হামলা সহজ হতে পেরেছে। যদিও গুলশান হামলার সঙ্গে দেশী ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত রয়েছে। তবে এ ধরনের একটি চক্রান্ত বাস্তবায়ন হওয়ার বিষয়টি ন্যূনতম আঁচ করতে না পারাটা রীতিমতো ব্যর্থতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুলশান হামলার পর সরকার জঙ্গীবাদের মূল উৎস জানতে মরিয়া। এজন্য দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে থাকা মসজিদগুলোর ওপর নজরদারি করার কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে সরকারের সবোর্চ্চ নীতি নির্ধারণী মহল থেকে। বিশেষ করে নামাজের পর মসজিদে বয়ানকারী ও তাদের অনুসারীদের বয়স বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে বলা হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু মাদ্রাসার ওপর নজরদারি করতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও লালবাগ থেকে দুই মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃতরা নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের হয়ে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতেন। অনেক মাদ্রাসায় জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। মাদ্রাসায় সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায় না। এজন্য মাদ্রাসাগুলোতে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের জরুরী বৈঠক শেষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গী দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সময় মতো পারদর্শিতা দেখাতে পারলে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। শুধু তাই নয়, পুলিশ বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিয়ে সাজানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে সংগঠিত হামলা মোকাবেলায় সক্ষমতা প্রদর্শনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ জানানো হয়।