১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদ্যুত উৎপাদনে এলএনজিই বড় ভরসা

রশিদ মামুন ॥ দেশের জ্বালানির সংস্থানে আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকে (এলএনজি) বড় ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার বিদ্যুত উৎপাদনের যে মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করেছে তাতে ব্যবহৃত গ্যাসের ৭০ শতাংশের যোগান এলএনজি থেকে আসবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশীয় গ্যাসকে ছাপিয়ে যাবে এলএনজির ব্যবহার।

সম্প্রতি সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মহেশখালিতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের দরপ্রস্তাব অনুমোদন করে। এরপর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, সরকার আগামী ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তবে কি প্রক্রিয়ায় এই নিশ্চয়তা প্রদান করা হচ্ছে উল্লেখ করেননি মুহিত। তবে বাজেট বক্তৃতায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টিকে সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। এছাড়া দেশের শিল্প-বণিক সমিতি এফবিসিসিআই নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় অর্থমন্ত্রী জানান, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে সরকারের ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। সেখানে সরকার এলএনজি আমদানি করে গ্যাস সরবরাহ করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দেশে গ্যাসের বর্তমান মজুদের মাত্র আট টিসিএফ অবশিষ্ট রয়েছে। দেশের মোট প্রমাণিত মজুদ ২০ টিসিএফের মধ্যে ১২ টিসিএফ এর মধ্যে উত্তোলন করা হয়ে গেছে। দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিতে যা বড় শঙ্কার কারণ। সরকার বলছে ২০৩০ সালেই বর্তমান মজুদ শেষ হয়ে যাবে। পেট্রোবাংলা বলছে নতুন ক্ষেত্র না পেলে আগামী বছর শেষের দিকে গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন কমতে শুরু করবে। বিকল্প ব্যবস্থা না করলে ২০২০-২০২২ সালের দিকে সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

গত কয়েক বছরে দেশের স্থলভাগে বড় কোন মজুদের খবর দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা। আর বাইরে বাপেক্স যে দ্বিতীয়মাত্রার জরিপ পরিচালনা করছে সেখানেও বড় কোন সুখবরের কথা কেউ বলছেন না। কেবল ভোলার পুরাতন গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদ আগের ধারণার চেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দাবিও কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অতীতে কূপ খননের আগে আগাম গ্যাস আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বিপাকে পড়েছে বাপেক্স। শুধু নতুন গ্যাস ক্ষেত্রেই নয় পুরাতন গ্যাস ক্ষেত্রেও বাপেক্সের জরিপ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। কয়েক দফা দরপত্র ডেকেও যথেষ্ট সাড়া পায়নি পেট্রোবাংলা। উপরন্তু মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপের পর দুটি ব্লক ফেলে চলে গেছে। ওই জরিপেও গ্যাস পাওয়ার ২০ ভাগ সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। অপরদিকে জরিপের ফলাফলে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনার ৮০ ভাগই ঋণাত্বক বলে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ (হাই রিস্ক) জোনে কোন কোম্পানি বিনিয়োগ করে না। পেট্রোবাংলা কনোকো ফিলিসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে চেয়েও পিছিয়ে আসে ওই সময়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাগরে-তেল অনুসন্ধান ব্যয়বহুল বিষয়। সারাবিশ্বে তেলের দাম কমে যাওয়ায় এলএনজি এবং কয়লার দামও কমে গেছে। এতে করে কোন কারণে বহুজাতিক কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে তেল গ্যাস না পেলে অন্য কোন জায়গার বিনিয়োগ থেকে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে না। ফলে তেল এবং গ্যাস খাতে বিশ্বজুড়েই এক ধরনের বিনিয়োগ মন্দা চলছে। সঙ্গত কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসর দাম বৃদ্ধি করার পরও বড় কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

দেশে বিদ্যুত উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদনের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। বিগত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭২ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেখানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৪০ শতাংশে। দেখা যায় ২০০৯ সালে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন হতো ৮৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এভাবে গ্যাসের সংস্থান কমে যাওয়ায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুত উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমছে। পিডিবি বলছে তাদের পাইকারি (বাল্ক) মূল্যহার ৪ টাকা ৬৭ পয়সার বিপরীতে উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬ টাকা ৫৪ পয়সা। এতে বছরে প্রায় ৭ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার ঘাটতি হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদনের হার কমে যাওয়ায় ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার চাহিদা সামাল দিতে তেল চালিত বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোকে বেশি করে চালাচ্ছে। যা বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচকে উস্কে দিচ্ছে।

সরকারের কয়লা চালিত বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর একটিও নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। সংকট সামাল দিতে আরও এক হাজার মেগাওয়াটের তেল চালিত আইপিপি বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত কেন্দ্রকে নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুত বিভাগ। আরও ৭০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এখন মোট বিদ্যুত উৎপাদনের অন্তত ৩০ ভাগ তরল জ্বালানি (ফার্নেস তেল ও ডিজেলে) উৎপাদিত হয়। নতুন করে আরও এক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনে আসলে এর পরিমাণ ৪০ শতাংশের ওপরে চলে যাবে। সেখানে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়বে।

বিদ্যুতের মূল্যহার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে জ্বালানির বহুমুখীকরণের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে এলএনজিকে বিকল্প বিবেচনা করেছে সরকার। জাইকা বিদ্যুতের মহাপরিকল্পার খসড়া প্রণয়ন করেছে তাতেও এসব কথা বলা হচ্ছে। এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে বাংলাদেশকে বিদ্যুত উৎপাদনে এলএনজি নির্ভরতা বৃদ্ধি করতে হবে। তার পরিমাণ মোট গ্যাস ব্যবহারের ৭০ শতাংশ হবে। আর দেশীয় গ্যাস ব্যবহার হবে ৩০ শতাংশ। জাইকার করা খসড়া ২০৪১ সাল মেয়াদী মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, কয়লার ব্যবহার অন্তত ১৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন এলএনজি সহজে পাওয়া যায়। কয়লার মতো পরিবহন এবং ব্যবহারে কোন ঝামেলা নেই। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস হওয়ায় এতে কোন পরিবেশ দূষণও হয় না। যে কারণে এলএনজির প্রতি বেশি জোর দেয়া হচ্ছে।

সরকার একটি ভাসমান এবং দুটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এর মধ্যে বাংলাদেশের কাছে এলএনজি বিক্রির আকর্ষণীয় প্রস্তাব নিয়ে আসছে। তারা দীর্ঘ মেয়াদী এলএনজি বিক্রির চুক্তি করতে আগ্রহী।