১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্ট, প্রবাসী বাঙালীদের অবদান ফিরে দেখা

মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্ট, প্রবাসী বাঙালীদের অবদান ফিরে দেখা
  • আলোকচিত্রে লন্ডন ১৯৭১

মোরসালিন মিজান ॥ একাত্তর সাল। দেশে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম। বীর মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে লড়ছেন। ঠিক একই সময় পাকিস্তানের বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ হচ্ছে বিদেশের মাটিতে। বিশেষ করে লন্ডনে প্রবাসী বাঙালীদের আন্দোলন অনন্য সাধারণ ইতিহাস গড়েছিল। বাংলাদেশের প্রতি সারাবিশ্বের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায় করার ক্ষেত্রে রেখেছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সেই সময়ের নানা মুহূর্ত আলোকচিত্রে ধারণ করা আছে। বিচ্ছিন্নভাবে ছবিগুলো দেখাও হয়েছে অনেকের। তবে এখন আরও অনেক বেশি ছবি। এক সঙ্গে দেখার সুযোগ। সুযোগটি করে দিয়েছে ‘লন্ডন ১৯৭১’ শীর্ষক প্রদর্শনী। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ৫ নম্বর গ্যালারি ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টটি সম্পর্কে চমৎকার ধারণা নেয়া যায়।

গ্যালারির সব ছবিই সাদাকালো। সাদাকালো কিন্তু ধ্রুপদী দেখতে। ছবি যতটা, তারও অধিক ইতিহাস। নিজেদের ক্যামেরায় সময়টিকে ধারণ করেছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক রজার গোয়েন। তার আলোকচিত্র প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। আরেক আলোকচিত্রী ইউসুফ চৌধুরী। প্রবাসী বাঙালী। আন্দোলনে ছিলেন। একই সঙ্গে শখের ক্যামেরায় ধারণ করেছেন দুর্লভ মুুহূর্ত।

প্রথমেই বলতে হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কথা। লন্ডনে প্রবাসী বাঙালীদের আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করার মূল কাজটি করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন আলোকচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় সেই প্রিয় মুখ। একটি ছবিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেটের সেটটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। আরও বহু কর্মকা-ের সঙ্গে ছিলেন।

প্রদর্শনীর ছবিতে বেশি এসেছে সমাবেশ ও মিছিলের ছবি। একটি আলোকচিত্রে লন্ডনের হাইডপার্ক স্পীকার কর্ণারে আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশ। বিপুল উপস্থিতি। তবে সবেচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হন বাঙালীর প্রাণস্পন্ধন বঙ্গবন্ধু। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতার প্রতিকৃতি তুলে ধরছিল বাংলাদেশকেই। ট্রাফালগার স্কয়ারেও অভিন্ন দৃশ্য। ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট ওখানে মহাসমাবেশের আয়োজন করে এ্যাকশন বাংলাদেশ। সমাবেশের উত্তাপ ক্যামেরাবন্দী করেন রজার গোয়েন।

মিছিল ছিল প্রায় প্রতিদিনের। ওয়েস্ট মিনিস্টার অতিক্রম করার সময় একটি মিছিলের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন রজার গোয়েন। মিছিলটি দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়, এত মানুষ! যেন আজকের বাংলাদেশ থেকে তোলা কোন ছবি। ৪ জুন অনুষ্ঠিত একটি মিছিলের পুরোভাগে নারী। ইউকে মহিলা সমিতির আয়োজিত মিছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের হাতে বাংলাদেশের সমর্থনে লেখা প্ল্যাকার্ড। আলোকচিত্রটি গভীর মনোযোগের সঙ্গে দেখলে চোখে পড়ে, অনেক মা তাদের শিশু সন্তানকে ট্রলিতে ঘুম পাড়িয়ে সেটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন! এতকাল পরও দেশমাতৃকার প্রতি তাদের দরদ দেখে বুক গর্বে ভরে ওঠে। মনে আপনি বলে ওঠেÑ স্যালুট।

মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন প্রবাসীরা। নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। একটি ছবিতে সেই দৃশ্য। খোলা আকাশের নিচে খাদ্য তৈরি করছেন কয়েকজন। বিক্রি করে সংগ্রহ করছেন অর্থ। বলার অপেক্ষা রাখেন না, মহা দুর্যোগের দিনে ওই অর্থ বিপুল কাজে এসেছিল বাংলাদেশের।

বিদেশী বন্ধুদের অবদানের কথাও স্বীকার করে নেয় প্রদর্শনীর আলোকচিত্র। ইউসুফ চৌধুরীর তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, বার্মিংহামে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে বক্তৃতা করছেন ব্রিটিশ এমপি স্টোন হাউস। অপর ছবিতে নাম না জানা বিদেশী এক নারী। সমাবেশের অগ্রভাগে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি হাতে দাঁড়িয়ে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্দোলনের প্রাণ বঙ্গবন্ধু এসে পৌঁছেন লন্ডনে। দিনটি ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। আহা, কী পাওয়া! সেদিনের একাধিক আলোকচিত্রে সকলের মধ্যমণি শেখ মুজিব। ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলনটির ছবি বার বার দেখা। তবু কেমন যেন আবেগে ভাসায়।

প্রদর্শনীতে আছে আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত সমাবেশের পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, পত্রিকার কাটিং, চিঠি ও বিভিন্ন নথির অনুলিপি। এসব থেকেও খুঁজে পাওয়া যায় সময়টা। শিল্পী আবদুর রউফের হাতে লেখা একটি পোস্টারে ৪ এপ্রিল হাইডপার্ক স্পীকার কর্ণারে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেয়ায় আহ্বান। তাজউদ্দিন আহমদের নিজ হাতে লেখা চিঠিটি দেখেও থামতে হয়। কী সুন্দর হাতের লেখা! ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল লেখা চিঠিতে প্রবাসী বাঙালীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বঙ্গতাজ। উৎসাহিত করেন।

এভাবে মুক্তিযুদ্ধের আগের সময় থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে যাত্রাবিরতির সময় পর্যন্ত ওঠে আসে আলোকচিত্রে। বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশের জন্য সংগ্রাম করা মানুষগুলোকে দেখে নতুন করে আবেগতাড়িত হতে হয়।

প্রজেক্ট লন্ডন ১৯৭১ আয়োজিত প্রদর্শনীটি শনিবার শেষ হওয়ার কথা। শেষ হবে। তবে মনে রাখার মতো। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ও সমন্বয়কারী উজ্জ্বল দাশ। একটি ধন্যবাদ পেতে পারেন এই তরুণ।

নির্বাচিত সংবাদ