১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

নারায়ণ চন্দ্র শীল ॥ অনেকটা নীরবে চলে গেল ওস্তাদ মমতাজ আলী খানের প্রয়াণ দিবস। গতকাল বুধবার ছিল প্রয়াত এই সঙ্গীতজ্ঞের মৃত্যুবার্ষিকী। বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিল্পীই ওস্তাদ মোমতাজ আলী খান সম্পর্কে তেমন একটা জানেন না। কিন্তু যখন গান বেজে ওঠে ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া’ অথবা ‘গুন গুনা গুন গান গাহিয়া নীল ভ্রমরা যায়’। তখন খোঁজ নিয়ে দেখে তার স্রষ্টাই হলো মোমতাজ আলী খান। বাংলার গ-ি পেরিয়ে ভারতবর্ষে ও তাঁর গান সমধিক জনপ্রিয়। ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের হাত ধরেই বহু শিল্পী পেয়েছে জনপ্রিয়তা, হয়েছেন সঙ্গীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। গুণী এই শিল্পীর জন্ম ১৯১৫ সালের ১ আগস্ট মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরের ইরতা কাশিমপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আফসার আলী খান ও মাতা বেদৌরা খান। সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে গান শেখার জন্য কোলকাতায় যান। সেখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে দীর্ঘ পাঁচ বছর তালিম নেন পদ্মভূষণ উপাধিপ্রাপ্ত ওস্তাদ নেসার হোসেন খানের কাছে। পাশাপাশি ওস্তাদ জমির উদ্দিন খানের কাছে খেয়াল, ঠুমরী ও গজলে তালিম গ্রহণ করেন তিন বছর। একাগ্রে অনুশীলনের ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলার আবহমানকালের মাটির সুরে দোতারা সহযোগে লোকসঙ্গীতের চর্চা করতেন। বাংলার শাশ্বত লোকজ সংস্কৃতির ধারাকে মূলধন করে এই মহান সাধক হাতে তুলে নেন কলম ও দোতারা। এ সময় তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর শিষ্যত্ব লাভ করেন এবং তাঁর স্নেহধন্য হবার গৌরব অর্জন করেন। এই ওস্তাদের সহায়তায় মোমতাজ আলী খান কলকাতার সং পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩২ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ‘ওরে শ্যাম কেলে সোনা, তোমায় বারে বারে করি মানা’ এবং ‘আমি যমুনাতে যাই বন্ধু, তোমার সনে দেখা না পাই’ এ দুটি গান তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হলে তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর ১৯৩৩ সালে কলকাতা বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৩৫ সালে ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর কাছে অনেক ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরীক্ষা দিয়ে শিষ্যত্ব লাভ করেন এবং দু’বছর তাঁর কাছে সরোদে তালিম নেন মোমতাজ আলী খান। ১৯৩৩ সালে ‘অভিযাত্রী’ চলচ্চিত্রে কণ্ঠদান করেন তিনি। এরপর ‘মধুচন্দ্রিমা’, ‘অশ্রু দিশারী‘, ‘কলংক’ ইত্যাদি ছবিতে কণ্ঠদান করেন। ১৯৩৪ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে মোমতাজ আলী খান শান্তিনিকেতনে যান। পরিচয়ের এক পর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, দেহতত্ত্ব, বিচ্ছেদী প্রভৃতি গান শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুগ্ধ হন। একই সালে কলকাতা বেতারে সঙ্গীত পরিবেশনের সময় কে. মল্লিকের সান্নিধ্য লাভ করেন, পরবর্তীতে তাঁর মাধ্যমে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয়। কবি নজরুল মোমতাজ আলী খানের গান শুনে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে দিয়ে দু’টি ইসলামী গান রেকর্ড করান। ১৯৪৩ সালে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের একমাত্র মহিলা বাদক শিল্পী কাজল খানের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন মোমতাজ আলী খান। শিল্পী কাজল খান ছিলেন ওস্তাদ ফুলঝুরি খানের ছাত্রী। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে মোমতাজ আলী খান সাউথ ইস্ট এশিয়ান মিউজিক কনটেস্টে প্রথম হয়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন। ১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে পি আই এ-র আর্টস একাডেমিতে সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মোমতাজ আলী খান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচিত ‘বাংলা মায়ের রাখাল ছেলে বাঁশী দিল টান’, ‘বাংলাদেশের মাটি ওগো তুমি আমার জন্মস্মৃতি’ গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে। ১৯৬০ সালে লালন গবেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের অনুরোধে তিনি লালনের বহু গানের সুর করে নিজে রেকর্ড করেন এবং আবদুল আলীম, লায়লা আরজুমান্দ বানু ও মাহবুবা রহমানসহ বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে রেকর্ড করান। পাকিস্তান আসলে বেশকিছু চলচ্চিত্রে গায়ক, গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের লোকসঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বহু শিল্পী সৃষ্টি করেন। ১৯৯০ সালের ৩১ আগস্ট লোকসঙ্গীতের প্রবাদ প্রতিম সাধক ওস্তাদ মোমতাজ আলী খানের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর স্মৃতির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।