২৩ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রত্নগর্ভা এক মহীয়সী নারী

  • খোরশেদ আরা

রেশাতুন নাহার সাতক্ষীরা জেলার তৎকালীন বিশিষ্ট জমিদার আলহাজ নিয়ামত আলী সরদারের কনিষ্ঠা কন্যা। সে সময় ব্রিটিশরা এসব ধনাঢ্য জমিদারদের নানান খেতাবে ভূষিত করত। নিয়ামত আলী সরদারও ব্রিটিশ প্রদত্ত ‘খান সাহেব’ পদবীতে ভূষিত হন। এই রকম একটি উচ্চবিত্ত জমিদার তনয়া রেশাতুন নাহারের বিয়ে হয় সৎ, আদর্শনিষ্ঠ, সুদর্শন এবং সুশিক্ষিত উদীয়মান যুবক সামছউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বাগেরহাট জেলার বৈটপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত সম্পন্ন গৃহস্থের সন্তান। পিতা শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আরও উল্লেখ্য, তিনি ১৯৩৮ সালে পদার্থ বিদ্যায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। অবিভক্ত ভারতের বিখ্যাত ‘প্রেসিডেন্সী কলেজ’ থেকে। ১৯৪০ সালে কলকাতার ‘টিচার ট্রেনিং কলেজ’ থেকে বিটি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বিয়ে করেন মাত্র ১১ বছরের বালিকা রেশাতুন নাহারকে। তৎকালীন সবচাইতে সম্মানজনক পেশা শিক্ষকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিলেন এই কৃতী শিক্ষাবিদ। শিক্ষক স্বামীর সংসার করতে গিয়ে একেবারেই কাছ থেকে দেখেন কিভাবে স্বামী অসংখ্য ছাত্রের জ্ঞান প্রদীপ নিজ হাতে প্রজ্বলিত করেছেন। আট সন্তানের জননী এই মহীয়সী মায়ের ছেলেমেয়েরা সততা, মেধা এবং আদর্শনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে দেশ-বিদেশে স্ব স্ব স্থানে নিজেদের আসন মজবুত করেছেন। সন্তানদের অসামান্য সাফল্যের কারণে ২০০৮ সালে আজাদ প্রোডাক্টস কর্তৃক রতœগর্ভা পুরস্কারে তিনি অলঙ্কৃত হন। ২০০২ সালে সামছউদ্দিন আহম্মেদ মারা গেলে এই মহীয়সী নারী তার স্বামীর সারা জীবনের ব্রতকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠা করলেন এক যুগান্তকারী প্রকল্প ‘সামছউদ্দিন নাহার ট্রাস্ট’। যা বিদ্যালয়, তথ্য প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য সেবার সমন্বয়ে গঠিত হয়। রেশাতুন নাহার স্বামীর সহায় সম্পদ যা ছিল সন্তানদের সম্মতিতে সবই দান করে দেন এই মহতী উদ্যোগে। উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের তত্ত্বাবধান এবং তারই অগ্রগামী ভূমিকায় ‘সামছুদ্দিন নাহার ট্রাস্ট’ তার আধুনিক কার্যক্রম নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে বিদ্যালয়টি পরিচিতি লাভ করে ‘বদর-সামছু উদ্দীপন বালিকা বিদ্যালয় হিসেবে। জন্মলাভ থেকেই শুধু বিদ্যালয়ই নয় সমান গুরুত্ব পেতে থাকে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ‘স্বাস্থ্যসেবা’র খাতটিও। অবৈতনিক এই প্রতিষ্ঠানটি মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতিদিন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত, গরিব-দুঃখী, অসহায় অসংখ্য শিশু-কিশোরের কলকাকলিতে। এসব পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র বোর্ডের পাঠ্যক্রম নিয়েই পরিবেষ্টিত থাকে না, তাদের নজর গিয়ে পড়ে আধুনিক যন্ত্র কম্পিউটারের ওপর এবং নিজেদেরকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য তারা স্বাস্থ্যসেবাকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এখন অবধি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্বে তার সুযোগ্য এবং কৃতী সন্তানরা। অবশ্য পাশাপাশি গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদেরও পরিচালনা বোর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক কার্যক্রম বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামকে ছাড়িয়ে আরও বহু জায়গায় এর বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়। বিদ্যালয়টি তো বটেই তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য খাতের উন্নত এবং আধুনিক কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বিশিষ্ট জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। বিদ্যালয়টি সফলতার শীর্ষে পৌঁছতে না পারলেও তার নিজস্ব এবং ব্যতিক্রমী কার্যক্রম নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলার নিরলস সাধনায় নিমগ্ন। স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষের যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দিয়েছে তা নির্দ্বিধায় বলাই যায়। এই বিদ্যালয়ের এক আয়ার দুই মেয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট পাবলিক বিদ্যালয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়। ছোট মেয়ে মদীনা এই বিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পাস এবং বাগেরহাট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। কোন প্রাইভেট এবং কোচিং ছাড়াই মদীনা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বারই ভর্তি পরীক্ষায় সফলতা অর্জন করে। তারা দু’বোনই এখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সম্মানের ছাত্রী। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির সফলতা উল্লেখ করার মতো। এই গ্রামেরই ১৬/১৭ বছরের কিশোরী দীপা প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠানটির নানামাত্রিক কার্যক্রমে আগ্রহ বোধ করে এবং এক সময় নিজেকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। দীপার বয়ান থেকেই বলা যায় ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সে এর কার্যক্রম কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়। কম্পিউটার যন্ত্রটি চিনলেও এর যথাযথ ব্যবহারে একেবারেই আনাড়ি। এক সময় এই প্রযুক্তির প্রতি তার আগ্রহ বাড়ার কারণে এবং শেখার জন্য যা যা প্রয়োজন সবই যোগাড় করতে থাকে। ক্রমান্বয়ে সামছউদ্দিন নাহার ট্রাস্টের ত্রিবিধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও তার লক্ষ্য স্থির থাকে তথ্যপ্রযুক্তির দিকে। এখানেই নিজেকে শাণিত করার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়।

ইতোমধ্যে সে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সময় থেকেই করতে থাকে। ট্রাস্টের সহযোগিতায় স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর দুটো ডিগ্রীই সে অর্জন করে। তারও আগে দীপার জীবনে আসে আর এক সুবর্ণ সুযোগ। ঢাকার ‘ডিনেট’ নামক এক প্রতিষ্ঠান থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ করানোর একটি প্রকল্প চালু হয়। সেখানে দীপা প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। এরপর তাকে আর পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি। ডিনেটের ট্রেনিং শেষ করে এক সময় সে নিজেই প্রশিক্ষক হিসেবে বাগেরহাট জেলার সকল ইউনিয়নের পরিষদের তথ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার দুর্লভ গৌরবও অর্জন করে। ইতোমধ্যে তার বিয়ে হয় এবং এক সন্তানের জননী সে। স্বামী কিংবা তার শ্বশুরবাড়ি থেকে তার কর্মস্থল কিংবা পেশা নিয়ে কোন আপত্তি তোলা হয়নি। ফলে বিয়ের পর তাকে তার পেশাও ছাড়তে হয়নি। প্রতিষ্ঠান যেমন তাকে সুযোগ করে দিয়েছে একইভাবে নিজের উৎসাহে, উদ্দীপনা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কর্মদক্ষতা এবং নিরন্তর শ্রম সাধনায় দীপা আজ তার অবস্থানে প্রত্যয়ী একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। এখানে আরও একটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী পুরুষে বৈষম্য করা হয় না। যোগ্যতার ভিত্তিতেই সবকিছু নির্ধারণ করা হয়।