১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বহুমাত্রিক গল্প লেখাই আমার পরম আরাধ্য -পূরবী বসু

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

প্রথমেই জানতে চাই পরবাসে কেমন আছেন? কেমন কাটছে দিন?

জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ-ই তো কাটিয়ে দিলাম দেশের বাইরেÑ এক ভিনদেশে। চার দশকের বেশি সময় এই মার্কিনমুলুকে থাকছি... তারপরেও এখানে সব সময়েই নিজেকে পরবাসী বলেই মনে হয়। দেশ ও দেশের প্রিয় মানুষদের মিস করি অহরহ। তিন তিনবার এখানকার পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে যাই। কিন্তু কোন না কোন কারণে আবার ফিরে আসি। তারপরেও, এখনও সুযোগ পেলেই দেশের মাটিতে ছুটে যাই, প্রায় প্রতি বছরই। গেল বছর পনেরো মাসে পাঁচবার গেছি দেশে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা স্বীকার করতেই হবে। বিদেশে যদি থাকতেই হয়, সবকিছু দেখে-শুনে-পড়ে, সবদিক বিবেচনা করে, মনে হয় আমেরিকাই সর্বশ্রেষ্ঠ।

আপনার লেখালেখির শুরুর দিকটা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী...

লেখালেখির শুরু চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াকালে। তখন একটি হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায় আমার একটি গোয়েন্দা গল্প প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে মাঝে মাঝে লিখতাম দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায়। যেমন, কচিকাঁচার আসর, সাত ভাই চম্পা, খেলাঘর ইত্যাদিতে। এমনি করে আস্তে আস্তে একটু আধটু বড়দের কাগজে, ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করি।

ছোটবেলায় লেখালেখিতে বাবার উৎসাহ পেয়েছি। উনিশ বছর বয়সে বাবাকে হারাবার পর পরিবার থেকে আমার লেখার ব্যাপারে জ্যোতি (জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত) ছাড়া যার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও উৎসাহ পেয়েছি, সে আমার বড়বোনের বড় ছেলে অলক কুমার মিত্র। তবে আমি মনে করি, আমার জীবনের দুটি ঘটনা আমার লেখার জন্য সহায়ক হয়েছে। প্রথমত, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মতো শক্তিশালী গল্প লেখকের সঙ্গে আমার বিয়ে, এবং তা অতি অল্প বয়সে। আমার তখন আঠারো বছর বয়স। সত্যি বলতে গেলে, সাহিত্যচর্চার কথা বলতে গেলে স্বীকার করতেই হয়, আমি জ্যোতির কাছে, জ্যোতির সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি, যদিও আমার লেখার ঢং তাঁর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে ধৈর্যসহকারে আমার ভালমন্দ প্রায় সব লেখাই সমান উৎসাহে পড়ে। তবে কখনও কোন লেখার সরাসরি বিরূপ সমালোচনা করে না। পরিবর্তন বা পুনর্লিখনের ব্যাপারেও উৎসাহ দেয় না বা নিবৃত্ত করে না। আরও ভাল লেখার জন্য কী করতে পারি সে সম্পর্কে কোন ধারণা দেয় না। বলে, আমি একজন স্বতন্ত্র লেখক। পাঠকরাই আমার মূল্যায়ন করবে। লেখক-পাঠকের মাঝখানে সে ঢুকতে চায় না। তবে মুখে কিছু না বললেও ওর চোখমুখের অভিব্যক্তি, সুনির্বাচিত শব্দ ব্যবহারে আমি টের পেতাম, এখনও পাই, গল্পটা কেমন হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আমাকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন যাঁরা এবং যে প্রতিষ্ঠানসমূহ, যাঁদের জন্য মাঝখানে দশ বছরের মতো সময় বাংলাদেশে থাকার ও চাকরি করার সুযোগ পাই। এই ব্যাপারে বেক্সিমকো ফার্মার অকাল প্রয়াত প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডিএইচ খানের কাছে আমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ আমার সরাসরি সুপারভাইজার, ব্র্যাকের স্যার ফজলে হাসান আবেদের কাছে। বলতে দ্বিধা নেই ব্র্যাকের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ করা আমার কর্ম জীবনের সবচেয়ে পরিতৃপ্তির কাজ ছিল। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত নব্বইয়ের প্রায় পুরো দশকটা দেশে না থাকলে লেখালেখিতে ফিরে আসা ও তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হতো না।

এছাড়াও আমাদের কিছু উদার এবং আধুনিকমনস্ক খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিনের সাহিত্য সম্পাদকদের বদান্যতায় লেখার ব্যাপারে উৎসাহ জেগেছে। তাঁরা অনেকেই নিয়মিত লেখা চেয়ে যোগাযোগ করেন, এবং খুব যতœসহকারে তা ছাপান। তাঁদের আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

লেখালেখি শুরু করার দীর্ঘসময় পরে মাত্র কয়েক বছর আগে লিখলেন প্রথম উপন্যাস ‘অবিনাশী যাত্রা’। হঠাৎ উপন্যাস লেখার ইচ্ছে হলো কেন?

উপন্যাস না লিখলেও লেখার ইচ্ছা ছিল বরাবর। ‘অবিনাশী যাত্রা’ আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। তবে এটাই আমার প্রথম লিখিত উপন্যাস নয়। আমার যখন বাইশ বছর বয়স তখন আমি একটি উপন্যাস লিখেছিলাম। নাম ‘মালতি! মালতি!’ কিন্তু হাতে লেখা সেই পা-ুলিপিটি হারিয়ে গিয়েছিল। বহু বছর পর তা খুঁজে পেয়েছি।

আপনার দু’একটি কবিতাও পড়েছি সম্প্রতি। কবিতা কি শখের বসে লিখছেন?

আপনার প্রশ্নটির ভেতর আমার কবিতা সম্পর্কে কেমন একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে বলে আমার মনে হচ্ছে, যা খুব ইতিবাচক নয়! ‘শখের’ শব্দটার সঙ্গে নিষ্ঠার অভাবের একটি সম্পর্ক থাকে সাধারণত। তবে এটাও সত্য, আমি বুঝি, কবিতা আমার পঁঢ় ড়ভ ঃবধ নয়। আমি ঠিক শখ করেও কবিতা লিখি না। সামাজিক, রাজনৈতিক কোন ঘটনা বা বিষয় আমাকে যখন খুব নাড়া দেয়, তখন সে সম্পর্কে বিষদ প্রবন্ধ রচনার জন্য আমি হয়তো তৈরি নই, অথবা লেখা সম্ভব হচ্ছে না, তখন অল্প কথায় কবিতার মতো কিছু লেখার চেষ্টা করি নিজের প্রতিক্রিয়া জানাবার জন্য। তাছাড়া আমার গল্পের মতো-ই আমি আমার কবিতা নিজের মতো করে লেখার পক্ষপাতি। তা যদি প্রথাবিরোধী, অসফল কবিতা হয়, হবে। কবিতাতে মনোমুগ্ধকর ইমেজারি বা রূপকল্প, নান্দনিক কিছু শব্দচয়ন, খানিকটা অস্পষ্টতা যে থাকতেই হবে, আমি তার বাধ্যবাধকতা মানি না। কবিতার প্রয়োজনে তারা আসতে পারে। কিন্তু তাদের ব্যবহারের প্রয়োজনে কবিতা লিখব না। আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলি, না শখ করে নয়, পরিশ্রম করে মনোযোগ দিয়েই কবিতা লেখার চেষ্টা করি, করব।

একাধারে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখছেন। কোন শাখায় লিখতে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

গল্প ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

আপনার গল্প ভাবনা জানতে চাই

গল্পের বিষয় তো চিরন্তন। মানুষের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, রাগ, অভিমান, হিংসা, দ্বেষ, ক্রোধ ইত্যাদি মানবিক সব অনুভূতি নিয়ে গল্প লেখা হয়ে আসছে কয়েকশ’ বছর ধরে। সময় যাবার সঙ্গে সঙ্গে গল্পের উপজীব্য তো বদলায় না! বদলায় গল্পের শৈলী-কলাকৌশল। বদলায় ভাষা, শব্দ চয়ন ও প্রয়োগ। আমি তেমন গল্প লিখতে চাই যে গল্পপাঠ শুরু করে শেষ করতে সাধারণ পাঠক আগ্রহী হবেন। তার মানে লেখাটা মোটামুটি সুখপাঠ্য হবে। কিন্তু একবার পড়ে যা মনে হলো, দ্বিতীয়বার পড়লে বা বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়লে তার চেয়ে বেশি কিছু আবিষ্কার করা যাবে অথবা সেখানে নতুন কিছু উন্মোচিত হবে। মানে গল্পগুলো সবসময় এক রৈখিক না হয়ে বহুমাত্রিক/বহুকৌণিক গল্প হলে ভাল হয়। যেখানে সাদামাটা কাহিনীর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে কিছু মোচড় বা বাঁক, মানে আরেক গল্পÑঅন্য কোন কথা। এ রকম বহুস্তরের বা বহুমাত্রিক গল্প কিন্তু পড়তে সহজ সরল। এমন বহুমাত্রিক গল্প লেখাই আমার পরম আরাধ্য। সতর্ক পাঠক অবশ্য প্রাথমিক পাঠেই বহুমাত্রিক গল্পের সেই স্তরের বা মাত্রার বিন্যাস টের পান। তবে এক রৈখিক ভাল গল্প যে হয় না তা নয়। আমি খুব সহজ বাক্য গঠনে, অতি পরিচিত শব্দ ব্যবহারে, ভনিতাহীন গল্প লিখতে চাই। পড়তে ঝরঝরে ও সহজ, সুখপাঠ্য লাগবে। কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে থাকবে আরও কিছু মালমসলা যা ধরতে না পারলেও গল্পপাঠের আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হবেন না পাঠক। ধরতে পারলে আরও বেশি আকর্ষণীয় মনে হবে।

আপনার লেখার একটি বৃহৎ অংশজুড়ে আছে নারীরা। একজন লেখক হিসেবে বর্তমান নারীদের কীভাবে দেখছেন?

বর্তমান নারীরা আগেকার নারীদের চেয়ে অনেক বেশি অধিকার সচেতন এবং অপেক্ষাকৃত কম বৈষম্যের শিকার। তারা পড়ালেখা করছেন, ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরা উপার্জন করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদের সুযোগসুবিধাও আগের তুলনায় অনেক বেশি, যদিও সকল সমাজেই নারী-পুরুষ বৈষম্য এখনও যথেষ্ট রয়েছে। সেসব থেকে উত্তরণ কালে বা উত্তরণের পথে একটা ব্যাপারে নারীদের সচেতন থাকতেই হবে। আর সেটা হলো নারীর সৌন্দর্য, যৌবন ও কল্যাণময়ী রূপের তোষামোদ করে তাদের যেন ব্যবহার করতে বা ঠকাতে না দেয়া হয়। এটা ঘরে-বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই। অনেক মেয়েই এই ব্যাপারে তেমন সচেতন নন এবং এই শোষণগুলোর ধরন বুঝতেই পারেন না। নারীকে বুঝতে হবে, পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ বা তাদের কাছ থেকে পাওয়া বাহ্যিক প্রশ্বস্তি-ই নারী জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বা সার্থকতা নয়। এটা যখন বলছি ব্যক্তি জীবনে নারী-পুরুষের চিরন্তন প্রেমের মতো মহামূল্যবান, চিরন্তন, আবশ্যিক ও নান্দনিক ব্যাপারটির কথা কিন্তু বলছি না। সমষ্টির দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এবং মেয়েদের আত্মসচেতনতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন থাকার বিষয়ে মন্তব্য করছি মাত্র। আরও একটি জরুরী ব্যাপার। ঘরে ও বাইরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীশিক্ষা ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই।

আপনার প্রিয় লেখক কারা? কোন বইগুলো বারবার পড়েন

এভাবে ঝট করে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুব মুশকিল। তবে কয়েকজন প্রিয় লেখকের নাম করছি। সম্পূর্ণ তালিকা এটা নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, কবিতা সিংহ, মৈত্রেয়ী দেবী, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অসীম রায়; আর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ তো বটেই। পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মা নদীর মাঝি, উত্তরঙ্গ, জগদ্দল, বিবর, গোপাল দেব, গল্পগুচ্ছ আমার প্রিয় বই।

লেখক সমাজের কাছে দায়বদ্ধ অথবা লেখক সমাজের কাছে দায়বদ্ধ নয়Ñ এ দুটি কথা প্রচলিত আছে। আপনার কী মনে হয়?

অবশ্যই লেখক সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। কেননা সমাজের ভেতরেই তাঁর বসবাস। সমাজের বাইরের কেউ নন তিনি। তবে সামাজিক সংস্কার তাঁর কাজ নয়। সমাজের ছবি তুলে ধরা তাঁর কাজ । সে ছবি যদি অপ্রিয়ও হয়, লেখকের পিছপা হলে চলবে না।

সম্প্রতি আমরা ছোটগল্পে তরুণদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় মুখ দেখতে পাচ্ছি। এ সময়ের তরুণ গল্পকার সম্পর্কে কিছু বলুন

আজকাল বেশ কয়েকজন তরুণ লেখক ভাল গল্প লিখছেন। আমার মনে হয় না, আমি তাঁদের প্রত্যেকের লেখা যথেষ্ট পরিমাণে অধ্যয়ন করেছি যে তুলনামূলক আলোচনা করতে পারি। তবে গত নবেম্বরে সাদিয়া মেহজাবিন ইমাম তাঁর ছোটগল্প সংকলন ‘পা’-এর জন্য হুমায়ূন আহমেদ-এক্সিম ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (তরুণ কথাসাহিত্যিক ক্যাটাগরি) লাভ করেন। এমন আরও উদাহরণ আছে। এটা খুব আনন্দের ব্যাপার আমার জন্য যে, এই নতুন প্রজন্ম কথাসাহিত্যের দিকে ঝুঁকছেন তুলনামূলক বেশি। এট আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সঠিক না-ও হতে পারে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সঙ্গে পরিচয় পরিণয় কীভাবে?

জ্যোতি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই বাস করত। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দর্শন বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব জ্যোতিকে তাঁর পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জ্যোতি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সের ছাত্র ছিল। আমার সঙ্গে জ্যোতির প্রথম যখন দেখা হয়, তার পাঁচ বছর আগেই তার পড়াশোনা শেষ। বাংলা একাডেমিতে কিছুদিন কাজ করার পর তখন সে পাকিস্তান অবজার্ভারে চাকরি করে। আমি সবে ফার্মেসিতে অনার্স পড়ছি তখন। ক্যাম্পাসেই আলাপ জ্যোতির সঙ্গে। বিয়ের আগে মাত্র চারবার দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। আর দেখা হবার এক মাস পরেই আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার সব ঠিক ছিল। আর সত্যি সত্যি বিয়ের পাঁচ দিন পরেই জ্যোতি পড়তে আমেরিকা চলে যায়। ফলে আপনি যথার্থ-ই প্রশ্ন করেছেন আমাদের পরিচয় ও পরিণয় সম্পর্কে। দুইপর্বের মাঝখানের পর্বের অর্থাৎ প্রণয় করার কোন সুযোগ বা সময় ছিল না আমাদের!

আপনারা বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক দম্পতি...

আমাদের মতো আরও এক দম্পতি আছেন বাংলাদেশেÑযাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁরা সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক। এই পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার জন্য যেমন জীবনের অন্যতম প্রধান অর্জনের বিষয়, তেমনি দায়বদ্ধতার ব্যাপারও বটে।

কবি আবুল হাসান আপনাদের বাসায় আসতেন।

এ বিষয়ে দু’কথা শুনতে চাই

আমি এই বিষয়ে শালুক পত্রিকার আবুল হাসান সংখ্যায় লিখেছি যা বেশকিছু সাময়িক পত্রিকায়, অনলাইন নিউজে প্রকাশিত হয়েছে। সে কবেকার কথা। তবে আবুল হাসানের অনুরোধে তাঁর দূত হয়ে আমি একবার তাঁর পুরনো প্রেমের ডালা নিয়ে রোকেয়া হলে আমার এক পূর্বপরিচিতার কাছে গিয়েছিলাম। সে মিশন ব্যর্থ হয়েছিল!

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গেও আপনার কিছু স্মৃতি আছে...

যদিও হুমায়ূনরা আর আমরা প্রায় তিন বছর ধানম-ির ১০-এ ছিলাম। এক সড়কে একেবারে মুখোমুখি দুটি বাড়িতে বাস করতাম মধ্য নব্বইতে। তখন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠেনি। একবার কি দু’বার মাত্র দেখা হয়েছে। হুমায়ূন ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো কোলন ক্যান্সারে হুমায়ূনের মৃত্যুর কিছুদিন আগে। সে সপরিবারে আমাদের বাড়িতে, ডেনভারে (নিউইয়র্ক থেকে ১৮০০ মাইল দূরে) বেড়াতে এসেছিল। লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিউইয়র্কে হুমায়ূনের ক্যান্সার চিকিৎসা ও মৃত্যুকে নিয়ে অনর্থক সব জটিলতা ও মনগড়া অভিযোগে যখন দেশ ছেয়ে গেছে, তখন কর্তব্য মনে করে আমার অতি কাছে থেকে দেখা পুরো ঘটনাটির বিষয়ে বিস্তৃত লিখেছিলাম যা অন্যপ্রকাশ একটি পুস্তকাকারে বের করেছিল। আমার বড় সান্ত¡না, এই বইটি প্রকাশিত হলে এইসব গুঞ্জন, অনর্থক মিথ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি অনেকাংশেই বন্ধ হয়েছিল।

সমকালীন বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই

আমি এই ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। কিন্তু বিশ্ব দরবারে আরও পরিচিত হবার জন্য ভাল অনুবাদের দরকার। ইংরেজী, ফরাসী, স্পেনিসে, বিশেষ করে ইংরেজীতে অনুবাদ। আমাদের দেশের একটি বড় গ্রুপ আছে যারা ইংরেজীতে সাহত্যচর্চা করেন। তাদের কারও কারও সঙ্গে আমার আলাপ আছে। দুর্ভাগ্য আমাদের-ই। বিচ্ছিন্নভাবে দু’একজন ছাড়া এই বিশাল ও বুদ্ধিদীপ্ত গ্রুপটির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যচর্চা করার প্রধান স্রোতের লেখকদের চলা বসা-সংযোগ খুব দেখি না। থাকলে দুই দল-ই উপকৃত হতো বলে আমার বিশ্বাস।

নতুন যারা লেখালেখি করতে আগ্রহী, তাদেরকে কী পরামর্শ দেবেন?

অনেক অনেক পড়াশোনা কর। স্বদেশের ও বিদেশী সাহিত্য সাম্প্রতিকÑক্লাসিক উভয়ই। একটি লেখা লিখে মনমতো না হলে আবার লেখ। আজকের কম্পিউটারের যুগে পুনর্লিখন ও সম্পাদনা তো খুব সহজ। আর বই ছাপাবার জন্য বেশি তাড়াহুড়া কর না। অন্যদের লেখা প্রসংশা করতে শেখ।

সামনে আসছে বইমেলা, পাঠকরা এই বইমেলায় আপনার কাছ থেকে কী কী বই পেতে পারে?

মনে হচ্ছে দুটি বই আসবে। ১) অন্যপ্রকাশ থেকে আমার কাছে লেখা শামসুদ্দীন আবুল কালামের পত্রগুচ্ছ। ২) বেঙ্গল পাবলিসার্স থেকে গত দুই বছর ধরে লেখা ‘আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙালী নারী’।

আপনার জন্ম ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে আপনি এখন একবিংশ শতাব্দীর বাসিন্দা। একজন লেখক হিসেবে জীবনকে ও জীবনের এই পরিভ্রমণকে কীভাবে দেখেন?

একবিংশ শতাব্দীতে মানষের আয়ু বেড়েছে সত্য। অনেক ধরনের রোগের, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিকার/প্রতিরোধেরও বেশকিছু ব্যবস্থা হয়েছে। তবু আজও জীবন রয়ে গেছে ক্ষণস্থায়ী ও অনিশ্চিত।

এটুকু জীবনে মানুষে মানুষে শত্রুতা, মারামারি- বাহ্যিক সামান্য কিছু পার্থক্যের জন্য একে অপরকে ঘৃণা করা, অবহেলা করা, তাচ্ছিল্য করা, বৈষম্য করা, ক্ষতি করা, একেবারেই অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য। প্রাগৈতিহাসিক যুগে খাদ্যের অন্বেষণে বাঁচার তাগিদে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মানুষ তা করলেও আজ একুশ শতকে তা পুরোপুরি বেমানান। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহ-অবস্থানের মনোভাব আয়ত্ত করা এই শতকের বড় চ্যালেঞ্জ।

এত বড় সমাজে আমি একজন ব্যক্তিমাত্র, আমার ক্ষমতা সীমিত, তবু বৃহত্তর কল্যাণে শুভ বা মাঙ্গলিক কিছু যদি ঘটতে দেখি, আমি সরবে সানন্দে তাকে অভিবাদন জানাই, তেমনি অশুভ বা ক্ষতিকর কিছু চোখে পড়লে তার সমালোচনা করি। প্রতিবাদ জানাই। বৃহত্তর স্বার্থে, সমাজে আমার দায়িত্ববোধ থেকে সেটা করা জরুরী বলে আমি মনে করি, তা শেষ পর্যন্ত কোন সুফল বয়ে আনুক বা না আনুক।

অবসর সময় কীভাবে কাটান

বই পড়ে, কম্পিউটারে লেখালেখি করে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, পছন্দমতো সিনেমা দেখে, গান শুনে, আর বেড়িয়ে, নতুন নতুন জায়গা ও মানুষের সঙ্গে দেখা করে অবসর সময় কাটে। নতুন কোন রান্না শিখতে, উল বুনতে, বিভিন্ন রঙ ও কালি নিয়ে আঁকিঝুঁকি করতেও ভাল লাগে।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

এই মাত্রা পাওয়া