১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাহিত্যের আড্ডা থেকে আবির্ভাব

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাচীন শহর ময়মনসিংহে তারুণ্যের প্রতীক ও পতাকা ছিল লিটল ম্যাগাজিন। আর এই লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল সাহিত্য ভাবনার অসংখ্য তারকা লেখকের। ওই সময়কার উদীয়মান লেখকদের মুক্ত চিন্তার মুদ্রিত লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে রীতিমতো গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল দুই বাংলার লেখকদের মধ্যে। এটি ছিল স্বাধীনতাত্তোরকালে। যদিও ময়মনসিংহে লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। তারও আগে ১৯১২ সালে, বাংলা ১৩১৯ সালের কার্তিক মাসে শারদীয় দুর্গাপূজার সময় কেদারনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় সাহিত্যপত্র ‘সৌরভ’ প্রকাশিত হয়।

প্রথম দিকে পুস্তকাকারে বের হলেও পরে সেটি ম্যাগাজিন চরিত্রে প্রকাশ পায়। ময়মনসিংহের ইতিহাস রচনায় ওই সময়ে সৌরভ বিশেষ অবদান রাখে। বিশেষ করে সৌরভের মাধ্যমেই ‘মৈমনসিংহ গীতকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সংগৃহীত হওয়ার সুযোগ ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। চন্দ্র কুমার দে সৌরভের এক সংখ্যায় মৈমনসিংহ গীতিকার পালাগানগুলোর সামান্য অংশ প্রকাশ করলে ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। পরবর্তীতে ড. সেন ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ পালাগান সংগ্রহের দায়িত্ব দেন চন্দ্র কুমারকে। সৌরভ ওই সময়ে এই ভূমিকা পালন না করলে ময়মনসিংহের লোকজ ঐতিহ্যের এ অমূল্য সম্পদ হয়ত লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যেত। সে সময় সৌরভই ছিল উৎকৃষ্টমানের মাসিক সাহিত্য পত্রিকা- এই মন্তব্য জেলা পরিষদ প্রকাশিত ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থে ‘ময়মনসিংহের পত্রপত্রিকা’ লেখক প্রয়াত অধ্যাপক আবদুল কাদির খানের। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব মুখপত্র ‘অরণি’ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, বাংলা ১৩৬৮ সালে। ডা. অবনী নন্দী ও খ্যাতনামা সাংবাদিক রাহাত খান যুগ্মভাবে সম্পাদনা করতেন প্রথমদিকে এই সাহিত্য পত্রিকাটি।

১৯৬৯ সালে, বাংলা ১৩৭৬ সালের চৈত্র মাসে খগেশ তালুকদার ও নুরুল হকের যুগ্ম সম্পাদনায় তৎকালীন পূর্ব পকিস্তানের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন ‘চরৈবেতি’ প্রকাশ করে আমরা সমুদ্রমুখী সাহিত্য চক্র। সরদার নুরুল আনোয়ার, সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক সুধীর দাস যুক্ত ছিলেন চরৈবেতির সঙ্গে। নিয়মিত লেখক ছিলেন যতীন সরকার, শামসুজ্জামান খান, দেলওয়ার আহমদ, গোলাম সামদানী কোরায়শী, আশুতোষ পাল, প্রণব চৌধুরী। মাত্র ২টি সংখ্যা বের হয়েছিল চরৈবেতির। ১৯৬১-৬৯ পর্যন্ত কবি মোশাররফ করিমের সম্পাদনায় ‘তিলোত্তমা’ বের হয়। কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি হেলাল হাফিজ ও আলতাব হোসেন ছিলেন এর প্রাণ। কথাসাহিত্যিক ‘প্রিয় প্রসঙ্গ’ সম্পাদক সালিম হাসান জানান, স্বাধীনতাত্তোর ময়মনসিংহে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনায় প্রতিযোগিতা ও এক ধরণের জোয়ার সৃষ্টি হয়।

১৯৭০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই জোয়ার অব্যাহত থাকে। কথাসাহিত্যিক রাহাত খান, অধ্যাপক বিমল কান্তি দে ও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের সম্পাদনায় বের হয় ‘দীপাবলী’। প্রয়াত কবি মোয়াজ্জম হোসেন আজাদ সম্পাদিত ‘শুভ্র শিখা’, সালিম হাসান সম্পাদিত ‘সম্মোহনী’ নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ‘সেঁজুতি’ কবি আতাউল করিম শফিক ও মামুন মাহফুজ সম্পাদিত ‘উপমা’, কবি শফিকুল ইসলামের ‘কবিতা’ চন্দনা চাকমার ‘সজনী’, ছিল ওই সময়কার শিল্প সাহিত্যে প্রবাহ সৃষ্টিকারী আলোচিত লিটল ম্যাগাজিন। এসবের মাধ্যমে তরুণ ও সম্ভাবনাময় কবি-সাহিত্যিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরে হাবিবুর রহমান শেখ সম্পাদিত ‘চন্দ্রাকাশ’ ইফফাত আরা সম্পাদিত ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ কবি শফিকুল ইসলাম সেলিম সম্পাদিত ‘কবিতা’, কবি ফরিদ আহমদ দুলাল সম্পাদিত ‘স্বতন্ত্র’ ইমদাদুল হক সেলিম ও স্বপন ধরের ‘জলদ’ ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের ‘স্বরচিত’ এই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। এ সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে দুই বাংলার লেখকদের মধ্যে যেমন সেতুবন্ধন তৈরি হয়, তেমনি প্রতিযোগিতাও চলে।

সাহিত্য পত্র চরিত্রের লিটল ম্যাগাজিনে মূলত গল্প, কবিতা, ছড়া ছাড়াও স্থানীয় ও জাতীয় নানা ইস্যু নিয়েও লেখালেখি হয়েছে। এর বাইরে এসব লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনার মাধ্যমে সৃষ্টিশীল অসংখ্য তরুণ মেধাবী কবি- সাহিত্যিক তৈরি হয়েছিল ওই সময়ে। মূলত সাহিত্যের আড্ডাকেন্দ্রিক আসর থেকেই লিটন ম্যাগাজিনের আবির্ভাব হয়। প্রকাশনাকে ঘিরেও ছিল সাহিত্যের আড্ডার আসর। এ রকম একটি আড্ডার নাম ছিল ‘শুক্র বাসরীয় সাহিত্য সংসদ’।

হেলেনা খান, কথাশিল্পী রাহাত খান, প্রয়াত অধ্যাপক আবদুুল কাদির খান, এ্যাডভোকেট রুহুল আমিন, প্রয়াত আনোয়ারুল হাকিম খান, অধ্যাপক সুধীর দাসসহ অনেকে জমিয়ে রাখতেন সাহিত্যের এই আড্ডা। কবি শামসুল ফয়েজ, আশরাফ মীর, তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদ, আতা সরকার, সৈয়দ সিদ্দিকী, সেলিম মাহমুদ, নাজমুল করিম সিদ্দিকী, প্রয়াত সাজাহান সিরাজী, সিদাতুল মুনতাহা, কবি মাহমুদ আল মামুন, নাসরিন জাহান, পারভীন সুলতানা রুবী, মাসুদ বিভাগী, আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, সজল আশফাক, স্বপন ধর, ইমদাদুল হক সেলিম, আলী ইদ্রিসসহ অসংখ্য লেখক তৈরি হয়। নব্বইয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন বেগবান হলে ঝিমিয়ে পড়ে এসব প্রকাশনা।

-বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে