১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হেনরী মাতিস ॥ খেয়ালির রঙ তুলি

  • সুমাইয়া ইসলাম নিপা

শিল্পী হেনরী মাতিস ও তাঁর শিল্পকর্ম : ওমেন উইথ এ হ্যাট

মাতিসের ছবি তাঁর বিমূর্ত চরিত্রের জন্য নয়, বরং তার ইম্প্রেশনিস্ট ভাবমুখিনতা, তার স্পষ্টতার জন্য পরিচিত। এই ছবি দেখে আমাদের মাথা চুলকাতে হয় না। ফব পর্যায়ের ছবিগুলো থেকেই আমরা জানি উজ্জ্বল রঙ ও কিছুটা অসম্পূর্ণ নির্মাণের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। তাঁর তুলির আঁচড় শিল্পের জগতে নব উদ্যম তৈরিতে সহায়তা করে। শিল্পকে ভিন্ন চোখে দেখতে উদ্ভূত করে। কম্পোজিশন, পরিপ্রেক্ষিত রঙ প্রলেপন থেকে শুরু করে শিল্পের সকল বাক্যের শব্দে সংযুক্তি ও ভিন্নতা আনয়ন করেন এই শিল্পী। যে জিনিসটা মাতিসের শিল্পকর্মকে বিশেষভাবে মূল্যবান করেছে সেটা হচ্ছে অনুভূতির সততা। রঙের কোন বুদ্ধি-বৃত্তিজাত যান্ত্রিক ব্যবহারে তিনি বিশ্বাসী নন। অনুভূতি পরিবর্তনশীল, তার উপর ভিত্তি করে রঙের বিন্যাসও পাল্টে যায়। প্রাথমিক ও উজ্জ্বল রঙকে প্রায় ঢেলে দিয়েই ফব আন্দোলনের সকল শিল্পকর্ম রচিত। রঙ মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপনের মাধ্যম ছিল না, বরং বিষয়বস্তু হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। আমাদের চারদিকের প্রকৃতির বিষয়বস্তু আমরা যে রঙের মাধ্যমে দর্শন করি, তা থেকে সরিয়ে নিয়ে শিল্পীর কল্পনা রঙে সাজিয়ে তুলে ধরেছেন প্রকৃতিকে। বাস্তব রঙ বর্জনে গাছের পাতা হয়েছে নীল, গুড়ি লাল। মুখের গোলাপী আভা এখানে সবুজে স্থান পেয়েছে। লাল এর পাশে কড়া সবুজ নীলের সঙ্গেই কমলাকে উপস্থাপনের মাধ্যমে জবরজং অগোছালো নক্সাচিত্র বলে মনে হয় এ আন্দোলনের কাজগুলো। তাই তো ১৯০৩ সালে ফ্রান্সকেন্দ্রিক স্যালোন ডি অটোম নামে প্রদর্শনীতে এই বৈশিষ্ট্যের শিল্পকর্মগুলো দেখে দর্শক হকচকিয়ে যায় এবং শিল্প সমালোচক লুইস ভক্সিলেস তার গিল ব্লেস পত্রিকায় এই শিল্পী মহোদয়দের বন্যজন্তু আখ্যা দেন। শিল্পীরা সাদরে এ নাম গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে এ নামেই নিজেদের অভিহিত করেন। অ-ইউরোপীয় শিল্প দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হন। বিশেষ করে পার্সিয়ান কার্পেট, জাপানী প্রিন্ট, ভারতীয় পটচিত্র, আফ্রিকান মাস্ক, আদিম ভাস্কর্য, অনুপ্রেরণা দাতা ছিল শিল্পীদের নিকট। শিল্পী মাতিস আজীবন ফব ধারায় কাজ করেছেন। যার ফলে ফবিস্ট শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আনুপাতিক মাপের তোয়াক্কা না করে মনমতো গড়ন তৈরি করতেন। সরলতা পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়েই মাতিসের শিল্প। সারল্য ভাব আনয়নে শিশুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন লক্ষণীয়। শিল্পী মাতিস তাঁর শিল্পে কতগুলো ভারি রঙের ফর্ম দ্বারা উপস্থাপনে নক্সধর্মী পরিবেশ তৈরি করে দ্বিমাত্রিক রঙ প্রলেপনে কন্ট্যুর লাইনে ত্রিমাত্রিকভাব ফুটিয়ে তুলেছেন। কাছের বস্তু থেকে দূরের বস্তুতে হালকা রঙের আমেজকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। ব্যাক গ্রাউন্ড এবং সামনের বস্তুতে একই রঙ ব্যবহারের চরম সাহসিকতা দেখা যায় তাঁর কাজে। প্রতিটি ছবিতেই আদিম ভাস্কর্যের সুভাস পাওয়া যায়। পার্সিয়ান কার্পেটের ফুলেল মোটিভ লক্ষ্য করা যায় তাঁর পছন্দের বিষয়বস্তু ডাইনিং টেবিলের ক্লথে। নারীর পোশাকে, ব্যাকগ্রাউন্ডেও এই মোটিভ পরিলক্ষিত হয়। যার দরুণ চিত্রকর্মগুলোকে আপাত দৃষ্টিতে ডিজাইনের মতো সাজানো মনে হয়। বলিষ্ঠ ব্রাশ স্ট্রোক, স্বেচ্ছাচারী কম্পোজিশন এবং দ্রুততার সহিত তুলি সঞ্চালনের ফলে কিছু চিত্রকর্ম অসমাপ্ত মনে হয় যা মূলত পরিপূর্ণ চিত্রই। রঙ এবং কন্ট্যুরের রিদমিক আয়োজনকে একই সমতলে উপস্থাপন করেন এই শিল্পী। লাল রঙের প্রতি দুর্বলতা থেকেই হয়তো আবেগের দৃশ্যমানতা ফুটিয়েছেন তাঁর বিখ্যাত চিত্রগুলোতে। তারই অস্তিত্ব ধারণ করছে ‘দ্য রেড স্টুডিও’, ‘হারমনি ইন রেড’, ‘ওডালেস্ক ইন রেড জ্যাকেট’ সহ বেশকিছু শিল্পকর্ম। ‘দ্য রেড স্টুডিও’ চিত্রে আসবাবপত্র, দেয়াল, মেঝে, টেবিল ক্লথে একই সমতল লাল রঙ ব্যবহারে রঙ বর্জন করার পা-িত্যপূর্ণ প্রমাণ দেখিয়েছেন। তবে সমতল ও আনুভূমিক তলকে কয়েকটি রেখা দ্বারা বিভাজন করেছেন। ‘হারমনি ইন রেড’ চিত্রেও পার্সিয়ান লাল কার্পেট পরিবেষ্টিত ফ্ল্যাট পরিবেশ দেখা যায়। মহিলা ফলের ঝুড়ি টেবিলে সাজাচ্ছে পাশে জানালা দিয়ে দূরের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তবে ক্ষণিকের জন্য জানালা এবং দূরের দৃশ্য ঝুলন্ত চিত্রকর্ম বলে মনে হয়। এতে সূক্ষ্ম বক্র রেখা এবং রঙের তীব্রতায় ডাইমেনশনাল অনুভূতির আভাস মেলে। মাতিসের প্রথম দিকের কাজের মধ্যে ‘লা লাক্সি’ অন্যতম। সেজা ও সুর‌্যার প্রভাব সুস্পষ্ট। তিনজন নরনারী, পটভূমিতে সমুদ্র, পাহাড়, আকাশ সবকিছুতেই কাছাকাছি রঙের ছোয়া একে অপরকে অবিচ্ছিন্ন করেছে। মাতিসের প্রতিটি চিত্রের ফিগারগুলো আউট লাইনে দ্বিমাত্রিকভাবে আঁকা হলেও এনাটমি জ্ঞানে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তা অনুধাবন করা যায়। ফব রীতির চিত্রগুলোর মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং ফব বৈশিষ্ট্যে উৎকৃষ্ট চিত্রের উদাহরণ শিল্পী মাতিসের ‘দ্য ওপেন উইন্ডো’ যেখানে বাইরের দিকে উন্মুক্ত গরাদহীন জানালাসহ একটি ঘরের দেয়ালের খ-চিত্র উপস্থাপিত। জানালার বাইরে একটি বারান্দা ফুলের টব আঙ্গুরলতা, সাগর, আকাশ, নৌকা উজ্জ্বল সবুজ, নীল, পার্পল এবং কমলা রঙের প্রশান্ত খাড়া স্ট্রাইপে ভেতরের দেয়াল ও জানালা কম্পোজ করা। বহির্দৃশ্যে ধূসর রঙের দক্ষ ছোট তুলির আঁচড় পরিমার্জিত করেছে চিত্রটিকে। শিল্পীর স্ত্রী এ্যামেলীকে নিয়ে করা ‘ওমেন উইথ এ হ্যাট’ চিত্রটিতে এ্যামেলী চেযারে বসা, দৃষ্টি দর্শকের দিকে। মাথায় বিশাল টুপি সবুজ রঙের আধিক্য মুখে পোশাকে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে। টুপিটি দেখতে সবজি ভর্তি থালার মতো মনে হয়। রঙ প্রলেপনে ছাড়া ছাড়া ভাব, চিত্রটি দেখে অসম্পূর্ণ মনে হয়। তাঁর আরও দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ ‘দ্য ডান্স’ এবং ‘লা মিউজিক’। দুটি চিত্রে যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়। পাঁচটি মানব ফিগার, বিবস্ত্র এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সবুজ ও নীল ফ্ল্যাট রঙ দিয়ে বিভাজন করেছে আকাশ ও ভূমি উপস্থাপনে। দুটি চিত্রেই এমনটি দেখা যায় এবং ফিগারের লাল রঙ ব্যবহার করেছেন যা ফবিজম ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংস্কারমুক্ত আদিমতার উপস্থাপন শর্তেও শিল্পীর শিল্প রচনাকে স্বাধীনতা দান করেছেন ফবিস্ট শিল্পী হেনরী মাতিস। শিল্পের অঙ্ককে গদবাঁধা সূত্র থেকে মুক্ত করে স্বেচ্ছাচারী মুক্ত ভাবনাকে ইচ্ছামতো রঙের পাত্রে ঢেলে শিল্পকে নতুনভাবে ভাবতে ও উপস্থাপন করতে শেখালেন ফবিস্ট শিল্পীরা। আর মাতিসের হাত ধরেই এই ভাবনার জগতে চলতে থাকে ফবিজম ধারা বহু আলোচনা সমালোচনাকে সঙ্গী করে। যদিও পরবর্তী ধারা সূচনায় ফবিজমের গুরুত্ব অবর্ণনীয়। হেনরি মাতিস তাঁর দীর্ঘ শিল্পী জীবনে বিভিন্ন সময়ে চিত্রকলা থেকে ড্রইং, ভাস্কর্য আর অন্যান্য শিল্প-মাধ্যমে বিচরণ করেছেন। এক পর্যায়ে তুলির বদলে হাতে তুলে নিয়েছেন কাঁচি। পরিণত বয়সে অসংখ্য পেপার কাটিং করেছেন। বেশিরভাগ কাজ করেছেন বড় আকারে।

সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে মাতিসের এ রকম বহু শিল্পকর্ম। মাতিসের কাজগুলোকে সিম্ফোনিক নয় জ্যাজের মতো অনর্গল মনে হয়। জ্যাজের মতোই কাট আউটগুলো খোলা অর্গল দিয়ে অবারিত ধ্বনি-বন্যায় আমাদের এক আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত রঙের উৎসবে ভিজিয়ে দেয়।