১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশ আগামী বছর দুটি স্যাটেলাইটের মালিক হচ্ছে

  • বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ’১৭ সালের ডিসেম্বরে আর ন্যানো-স্যাট মে মাসে আকাশে উৎক্ষেপণ

ফিরোজ মান্না ॥ বাংলাদেশ আগামী বছর দুটি স্যাটেলাইটের মালিক হতে যাচ্ছে। একটি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ অন্যটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানো স্যাটেলাইট ( অন্বেষা ৩বি)। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে বিচরণ করবে ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপর দিয়ে, আর ন্যানো স্যাটেলাইটের বিচরণ ক্ষেত্র হবে এক থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার ওপরে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আগামী বছর ১৬ ডিসেম্বর আকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। ন্যানো স্যাটেলাইট একই বছরের মে মাসে উৎক্ষেপণ করবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। দুটি স্যাটেলাইট থেকে যোগাযোগ ও আবহাওয়া, একাডেমিক গবেষণাসহ ৪০ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ হচ্ছে রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় আর ন্যানো স্যাটেলাইট নির্মাণে সহযোগিতা দিচ্ছে জাপান। স্যাটেলাইট দুটি উৎক্ষেপণ হলে দেশে তথ্যপ্রযুক্তির যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বিটিআরসি সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ কাজ শতকরা ৫০ ভাগ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে উৎক্ষেপণের পর দেশসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেমের (৪০ টি ট্রান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড) গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। প্রকল্পের ৪০ শতাংশ টাকা সরকার বহন করছে। বাকি ৬০ শতাংশ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান পরে স্যাটেলাইটের আয়ের টাকা থেকে কিস্তি হিসেবে তাদের পাওনা কেটে নেবে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের জন্য অরবিটাল সøট ইজারা নেয়া হয়েছে। চুক্তির আওতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল সøটের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশন্সকে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বিটিআরসি। স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করতে মোট ৩ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এর মধ্যে গত বছর সরকার এই প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দিয়েছে। দাতা সংস্থা দেবে এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এই স্যাটেলাইটের দুটি বেসস্টেশন থাকবে। বেসস্টেশন নির্মাণের কাজও অনেকদূর এগিয়েছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপন হলে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে ব্রডকাস্টিং থেকে শুরু করে টেলিযোগাযোগের সব সেক্টর উন্মুক্ত হয়ে যাবে। বিদেশী স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। অন্যদিকে স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।

এদিকে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির তিন শিক্ষার্থী কাফি, মাইসুন ও অন্তরা জাপানে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের পাশাপাশি স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের নির্মিত স্যাটেলাইট ২০১৭ সালের মে মাসে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (কেআইটি) এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মধ্যে দেশের প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির জিডিএলএন সেন্টারে এক কনফারেন্সে উপাচার্য প্রফেসর সৈয়দ সাদ আন্দালিব এবং কেআইটির প্রফেসর মেংগু চো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বার্ডস নামক প্রজেক্টের মাধ্যমে এ ন্যানো স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। এজন্য এর নাম দেয়া হয়েছে অন্বেষা ৩বি (৩বি-বাংলাদেশ, ব্র্যাক ও বার্ডস প্রজেক্ট)।

ব্র্যাক সূত্র মতে, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব ম্যাথমেটিকস এ্যান্ড ন্যাচারাল সায়েন্সের চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবণ কেন্দ্রের (স্পারসো) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আবদুল্লাহ জিয়াউদ্দিন আহমাদ যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রযুক্তির অগ্রগতি সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খলিলুর রহমান এই প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ন্যানো স্যাটেলাইটে বাংলাদেশও হবে একটি উজ্জ্বল নাম। জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (কেআইটি) ল্যাবরেটরি অব স্পেসক্র্যাফট এনভায়রনমেন্ট ইন্টোরেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ড. আরিফুর রহমান খান এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। দেশের জন্য ন্যানো স্যাটেলাইট খুবই লাভজনক হবে বলে মনে করেন ড. আরিফ। এর মাধ্যমে দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হবে বলে তিনি মনে করেন।

সম্প্রতি ন্যানো স্যাটেলাইট নির্মাণ সম্পর্কে কাফি ও মাইসুন বলেন, আমরা সব সময় চেষ্টা করি যাতে আমাদের কাজ কারও কাজে লাগে। কিন্তু আমরাই দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বানাতে পারব এটা কল্পনাও করতে পারিনি। আশা করব, আমাদের এ প্রচেষ্টা বাংলাদেশের কাজে আসবে। অন্বেষা ৩বির মাধ্যমে আমরা স্যাটেলাইটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি জিনিস খুব ভালভাবে শিখছি। অন্বেষা ৩বি স্যাটেলাইট আমাদের শেষ নয়, এটা দিয়েই আমাদের স্যাটেলাইট গবেষণা শুরু। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই যতক্ষণ পর্যন্ত না বাংলাদেশকে প্রযুক্তির শিখরে পৌঁছে দিতে পারি। স্বল্প ব্যয়ের ছোট্ট স্যাটেলাইটকে ন্যানো-স্যাট বলা হয়। মহাকাশ গবেষণায় বাংলাদেশসহ পাঁচটি অনগ্রসর দেশে আন্তঃসীমান্ত প্রকল্প ‘বার্ডস প্রজেক্ট’ নিয়ে কাজ হচ্ছে। এর আওতায় ২০১৭ সালের মধ্যে কিউবস্যাট উৎক্ষপণ করা হবে। ন্যানো-স্যাট বিভিন্ন গবেষণা আর একাডেমিক কাজে গুরুত্বপূর্র্ণ অবদান রাখবে। ব্যয়বহুল কনভেনশনাল স্যাটেলাইটের তুলনায় ন্যানো-স্যাট বেশ ছোট, ওজন হয় ১-১০ কেজি এবং একে বিষুবরেখার ৫০০-১৫০০ কিলোমিটারের ভেতর স্থাপন করা যায়। কিন্তু বড় আকারের স্যাটেলাইট যেখানে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটগুলো (বঙ্গবন্ধু-১) ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে স্থাপন করতে হবে । এ ধরনের স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ ও উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি।

ন্যানো স্যাটেলাইটের জন্য ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ন্যানো-স্যাট গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের কাজ চলছে। অন্যদিকে কাইউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (কেটিআই) ল্যাবরেটরি অব স্পেসক্র্যাফট এনভায়রনমেন্ট ইন্টারেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ন্যানো-স্যাট নির্মাণ কাজে উৎসাহিত করছে।