২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিয়া হায়দারের ৮০তম জন্মদিনে আনন্দ-উৎসব

  • দাউদ হায়দার

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এক তারাতে কান্না’ (প্রকাশ : ১৯৬৩)-এর শেষ কবিতা ‘মৃত্যুর পরে’। লিখেছেন, ‘আমার মৃত্যুতে কেউ কাঁদল না, কেউ/মুহূর্তের দীর্ঘশ্বাসে, এমন কি আরও/একটু হাল্কা করল না ঘরের বাতাস।’

আর্তনাদ মাখা এই কবিতা কোন তারিখ সনে লেখা উল্লেখ নেই। হতে পারে ২০-২৫ বছরের সময় লেখা। ‘হতে পারে’ বিচার এই কারণেই, বই বেরুচ্ছে ১৯৬৩ সালে। তার আগে, পা-ুুলিপি তৈরি, প্রেসে মুদ্রণ, প্রুফ দেখা, প্রচ্ছদ তৈরি, বাঁধাই ইত্যাদি। জিয়া হায়দারের বয়স তখন সাতাশ। জন্ম ১৮ নবেম্বর ১৯৩৬ দোহারপাড়া, পাবনা। জিয়া হায়দারের মুখেই শুনেছিলুম, কয়েকজন বন্ধুর আর্থিক আনুকূল্যে, নিজের ট্যাঁকের খরচে প্রকাশিত। পঞ্চাশের অধিকাংশ কবিই ট্যাঁকের কড়িতে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছেপে সুখী। প্রকাশক পাওয়া ভার, তাও আবার ‘আধুনিক কবিতার বই।’ স্কুলজাতীয় পদ্য, শিশুতোষ পদ্যলিখিয়েরা হয়ত প্রকাশক পেতেন, তাও এক আঙ্গুলে গোনা। এখনকার ‘হালহকিকত’ বলতে অপারগ।

জিয়া হায়দার কী ক্রান্তদর্শী? কেন লিখলেন ‘মৃত্যুর পরে?’ কতজন কেঁদেছে তাঁর মৃত্যুর পরে (২ সেপটেম্বর ২০০৮)? নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় তো ওরই প্রতিষ্ঠা, হাতে গড়া। হাত ধরে অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে এসেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন, তৈরি করেছেন। আজ তাঁরা ফুটানি মারছে, বড় বড় বাতেলা ঝাড়ছে। ভুলে যাচ্ছে, বাপ না থাকলে বংশধর, উত্তরাধিকার হয় না। অবশ্য, বাংলাদেশে সবই সম্ভব। কী সাহিত্য-শিল্পসংস্কৃতি, কী রাজনীতিতে এমন কী মনমানসিকতা। লজ্জা নেই। লজ্জাহীন জাতি। বাংলাদেশের লজ্জা নেই, সবই উদোম। জিয়া হায়দারের ৮০তম জন্মবর্ষ, আজ থেকে অথচ কোন উদ্যোগ, আয়োজন নেই কোথাও। কেন থাকবে, আমরা বিস্মৃত জাতি। আমাদের আস্ফালন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীয় ভাষায়, ‘প্রকা- মুখওয়ালা ক্ষেত্রপাল লইয়া।’

জিয়া হায়দারের নানামুখ-পর্ব। কোন্ পর্ব নিয়ে আলোকপাত জরুরী, অনুজের পক্ষে সরব বেমানান। তাঁর কবিতা নিয়ে পাঠক-সমালোচকের ভ্রুভঙ্গি বাঁকা, ভুলে যান, তিনিই প্রথম, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় অতীত বাংলার মিথ, মাটি-শিকড়ের ঐতিহ্য তথা পুরাণের আধুনিক রূপকার। ‘কৌটার ইচ্ছেগুলো’ কাব্যগ্রন্থে ‘অধুনা রূপকথা, ‘এখনো রাধিকা’, ‘যোগসাধকের ভূমিকা’, ‘প্রাচীন পুঁথি ও বর্তমান গবেষক’, ‘লখিন্দর’, ‘বেহুলা’ ‘সনকা’, ‘চাঁদ সদাগর, ‘মনসা’ ইত্যাদি কবিতায় বাংলার যে ক্লাসিক রূপরস, নানা অভিধায়, শৈল্পিক মানসে, রূপাল্লেখ্যে, আর কোথায় পাচ্ছি?

পঞ্চাশের, ষাটের পরবর্তী কোন দশকের কবিতায়, ঐতিহ্যের রস, সংস্কৃতির মিথের গরিমা নেই, অনুল্লেখ্য।

একটি বিষয়ে কৌতূহল খুবই, পঞ্চাশ দশকের সব উল্লেখযোগ্য কবির জন্ম (ভুললে চলবে না, এঁরাই ৫০ দশকের কবিতার নির্মাতা। ভাল-মন্দ বিচার বাহুল্য।) ১৯৩৬ সালে। ফজল শাহাবুদ্দীন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল। জিয়া হায়দার। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। আল মাহমুদ। মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ।

এই ছয়জন আবার তিন ভাগে বিভক্ত। ফজল শাহাবুদ্দীন সাংবাদিক। গল্পও লিখেছেন। আবু হেনা মোস্তফা কবি। একাডেমিক। অধ্যাপক। গানও লিখেছেন। জিয়া হায়দার সাংবাদিক, গীতিকার কবি, অধ্যাপক, গবেষক। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামন কবি, গীতিকার, গবেষক, অধ্যাপক। আল মাহমুদ সাংবাদিক, কবি। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক। এঁদের মধ্যে জিয়া হায়দার আবার নাট্যকার, নাট্যকৌশলী, নাট্যবিশারদ নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। অন্য পাঁচ কবি নাটকের প্রতি খুব যে আগ্রহী, খুব দেখিনি। আবু হেনা মোস্তফা কামাল (মামা। আপন নয় যদিও।) বলছিলেন একবার, ‘রোউফের (জিয়া হায়দারের ডাকনাম) নাট্যপ্রীতি ওঁর ছোট চাচা আবুল কাশেমের ঘরানায়।’ ‘ঘরানা’ শব্দটির ব্যাখ্যা চাইনি, বলতে চেয়েছেন হয়ত, ‘তোমাদের দোহারপাড়ার বাড়িতে তোমাদের ছোট চাচাই নাটক আমদানি করেন।’ -ভাগ্যিস করেছিলেন, ভাবি এখন। বাইবেলে আছে বাতাসে বীজ ছড়িয়ে দাও, কোথাও না কোথাও পড়বে, রোপিত হবে। বীজ থেকে গাছ, মহীরুহ হবে। জিয়া হায়দারের পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে নাট্যহাওয়া ছিল, পারিবারিক বলয়ে।

পিতা মোহাম্মদ হাকিমউদ্দিন শেখ ছিলেন সামন্ত, সেকেলে ভাষায় জমিদার। বাড়ির পুকুর সংলগ্ন ছিল নাট্যঘর, নাট্যমঞ্চ। ছিল কি সত্যি? ছিল হয়ত, ১৯৭৪ সালেও স্থাপত্যকলার কিয়ৎ অংশ দ-িত। যেন পোড়োবাড়ি। সাপগোক্ষুরের বাস। এই স্থাপত্যকলা দেখে সৈয়দ শামসুল হকের দৃঢ় বিশ্বাস (পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে গিয়েছিলেন, ষাট দশকের গোড়ায়) ‘তাদের বাড়িতে নাট্যঘর, নাচঘরও ছিল। দৃশ্যকাব্যকলায় অভিজ্ঞ মানুষ তিনি। নাটকে জিয়া হায়দারের হাতেখড়ি পাবনায় (শহরে), ছোট-বড় নাট্যপ্রতিষ্ঠান ছিল কয়েকটি, কতটা জড়িত ছিলেন সরাসরি, বলতে অপারগ। ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কবিতা-গান লিখেছেন, সাংবাদিকতায় যুক্ত হচ্ছেন (সাপ্তাহিক পল্লীবার্তা। সাপ্তাহিক চিত্রালী। (দৈনিক ইত্তেফাক), যোগ দিচ্ছেন অধ্যাপনায় (তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ), সহকারী সাংস্কৃতিক অধিকর্তা (বাংলা একাডেমি), সিনিয়র প্রোডিউসার (ঢাকা টেলিভিশন), বত্রিশ বছর অধ্যাপনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের নাট্যকলা শাখায়।

আমেরিকা থাকাকালীন (হনুলুলু, হাওয়াই ছাত্র) প্রথম নাটকের খসড়া (শুভ্রা সুন্দর কল্যাণী আনন্দ)। পরে বই প্রকাশিত। নাটক লেখা, প্রযোজনা, নাটক অনুবাদ, নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধাদি, নাট্যপ্রতিষ্ঠান তৈরি (নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়)। কবিতায় আগের মতো মনোযোগী নন, বেতার-টিভিতে গীত রচনা করেই ছেড়ে দিয়েছেন (গানের দুটি রেকর্ডও বেরিয়েছিল)। ক্রিস্টোফার মার্লোর ডক্টর ফস্টাস (ঢাকা-কলকাতা থেকে প্রকাশিত), জ্য পল সার্ত্রের নো এক্সিট (আতাউর রহমানের সঙ্গে), জ্য আনুই-এর আন্তিগোনে লী রোই জোনসের গ্রেট গুডনেস অব লাইফ, টম জোনসের দ্য ফ্যান্টাস্টিকস, ফ্রানৎস্ জেভিয়ার ক্রোয়েটৎস এর দ্য নেস্ট, এ্যাডগার এ্যালান পোর গল্পের নাট্যরূপ (বাংলায় নামকরণ উন্মাদ সাক্ষাতকার)। রহস্য বই শেকস্পিয়ার অনুবাদ করেননি কখনই। হতে পারে বাংলায় শেকস্পিয়ার এত বেশি অনূদিত চর্বিতচর্বনের মানে হয় না।

জিয়া হায়দারের মৌলিক নাটকের সংখ্যা বেশি নয়, ছয়টি। অধিকাংশ নাটকই কাব্যময়তায় আচ্ছন্ন। অবশ্য, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক চিত্রাবলী নানা মেজাজে প্রকাশিত। গোটা বাংলাদেশই তো নাটকে কী পরিবারে, কী সমাজে, কী রাষ্ট্রে, কী রাজনীতির ডামাডোলে।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘টু প্লেজ’ (আগস্ট ২০০১), ‘ফোর প্যাসেঞ্জার’ (অনুবাদ : দেবব্রত মুখোপাধ্যায়) এবং ‘মাম্বো-জাম্বো’ (অনুবাদ : কাজী মোস্তাইন বিল্লাহ)-এর ভূমিকায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন : Ô(Zia Hyder’s) Four Passengers Provide The Running Commentary on a mental and Intellectual States of his carrecters- Who by Extension Could be anyone, Modern day Figures Showing Gaps that exit in their perception of themselves and the world, their tragedy lies not with the world but with theamselves, and parhaps with the fast changing times.

রহিমা খাতুন ও মোহাম্মদ হাকিমউদ্দিন শেখের প্রথম পুত্র জিয়া হায়দার তিন মায়ের ১৬ সন্তানের মধ্যে তৃতীয়।

জিয়া হায়দারই পাবনার দোহারপাড়ার বাড়িতে কাব্যসঙ্গীত নাটক তথা সংস্কৃতির ঘনপত্তন তৈরি করেন। নাটকের প্রতি দুর্মর ভালবাসা। অনুজ আরিফ হায়দার এখন নাটক বিষয়ক ডক্টরেট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলার অধ্যাপক।

জিয়া হায়দারের ৮০তম জন্মদিনে কান্না নয়, সগর্বে আমাদের আনন্দ উৎসব।

১৭.১১.২০১৬ বার্লিন, জার্মানি