১৯ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পঞ্চাশটিরও বেশি গান করেছি ॥ উমা খান

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক শিল্পী উমা খান। চট্টগ্রামের এক সঙ্গীত পরিবারে তার জন্ম। চলচ্চিত্র, বেতার, টিভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সঙ্গীতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। গান গেয়ে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মুক্তিযুদ্ধের সময় গান গেয়ে উজ্জীবিত করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, সংগঠিত করেছিলেন লাখ লাখ শরণার্থীসহ সাধারণ মানুষদের। সে সময়ের কিছু স্মৃতি ও আজকের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় দিনগুলার কথা বলুন।

উমা খান ॥ আমার জন্ম চট্টগ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমার বাবা ও মা খুব সাহসী ছিলেন। তাদের জন্যই হয়ত আমিও সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর সেখানের অনেকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৩ মার্চ সব স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। ২৬ মার্চের রাতে পাক বাহিনীরা গোলাগুলি শুরু করল। ২৮ মার্চ পর্যন্ত শহরে থাকার পর আমি, মা-বাবা, কল্যাণী দি ও প্রবাল দাসহ সবাই চলে গেলাম গ্রামের বাড়ি রাউজানের বীনাজুড়িতে। রাজাকারদের অত্যাচারে সেখানে ১৫ দিনের বেশি থাকতে পারিনি। অনেক জায়গায় ঘর থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। আমরা বৃষ্টি ও বার বার বজ্রপাতের মধ্য দিয়ে রাতে রামগড়ের কাছে পৌঁছলাম। খুদায় ক্লান্ত সবাই মায়ের নিয়ে যাওয়া আধা সের চাল এক বাড়িতে গিয়ে ফুটিয়ে সবাই খেয়েছিলাম। রামগড়ের বর্ডার পার হয়ে ওপারের ত্রিপুরার সাবরুম নদী জল কম থাকায় হেঁটে পার হলাম। ওপার পার হওয়ার পর দেখলাম শরণার্থী অনেকের কলেরা দেখা দিয়েছে। কয়েকটি ট্রাক দাঁড় করান ছিল তার নিচে রাত কাটিয়ে ভোরে বাসে করে আগরতলায় পৌঁছলাম। আমার বসন্ত হওয়ায় সেখানে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। পরে ৫ মে আমরা কলকাতা পৌঁছলাম।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কিভাবে যোগ দিলেন?

উমা খান : আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সঙ্গীত পরিবারে। আমার বাবা একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন। মাও ভাল গান গাইতেন। আমি, কল্যাণী দি ও প্রবাল দা আমরা তিন ভাই-বোন প্রত্যেকেই গান গাইতে পারি। বলা যায় ছোটবেলা থেকে আমি গানের জগতে। অনেকেই সে কারণে আমাকে চিনত। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন কলকাতায় গেলাম তখন অনেক গুণী ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সেখানের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আমরা তিন ভাই-বোন গান করেছিলাম। এ সময় দেখা হয়েছিল ড. সন্জীদা খাতুনের সঙ্গে। আমাদের গান শুনে তাদের ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামের সংগঠনের সঙ্গে আমাদের নিয়ে নিলেন। যার নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, জহির রায়হান, মোস্তফা মনোয়ার, ভারতের দীপেন বন্দোপাধ্যায়সহ অনেকে। আমরা ‘রূপান্তরের গান’ নামক গীতিনাট্যে গাইতাম। পরে এর নাম হয় ‘মুক্তির গান’। আমরা এটা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশন করতাম। জুনের প্রথমদিকে গড়িয়া হাটের মোড়ে সুরকার সমর দাস ও শিল্পী আবদুল জব্বারের সঙ্গে দেখা হয়। তারা আমাদের চিনতেন। ওনারাই আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আপনাদের কর্যক্রম কি ছিল?

উমা খান : কেন্দ্রটি ছিল কলকাতা ১৯-এর ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। সেখানে নিয়মিত গান রচনা, সুর ও রেকর্ডিং হতো এবং স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচার হতো। প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি গান শেখানো হতো এবং তার রেকর্ডও হতো। আমরা পঞ্চাশটিরও বেশি গান করেছি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। বেশিরভাগ গান ছিল সমবেত। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙর তোল তোল‘, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’সহ অনেক গান আমরা রেকর্ড করেছি। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব’ গানটি রেকর্ড করেছিলাম আমরা তিন ভাই-বোন। এটির সুর করেছিলেন সমর দাস।

শুনেছি আপনারা তখন আরও একটি সংগঠন করেছিলেন?

উমা খান ॥ এরই মধ্যে আমরা ২৬ জন মিলে ‘বাংলাদেশ তরুণ শিল্পী গোষ্ঠী’ নামে একটি সংগঠন করেছিলাম, এর সেক্রেটারি ছিলেন কল্যাণী দি। এ সংগঠনের হয়ে ‘একটি সূর্যের জন্ম’ নামে একটি আলেখ্য পরিবেশন করতাম। ১৯৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঘটনার ইতিবৃত্ত নিয়ে আলেখ্যটি রচনা করেছিলেন মোহিনী মোহন চক্রবর্তী। এটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাঠও করতেন তিনি। এ ছাড়া গণসঙ্গীত ও বিভিন্ন রকমের গান পরিবেশন করতাম।

স্বাধীনতার ৪৫ বছরের অর্জন সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?

উমা খান ॥ আমরা একটি স্বাধীন ভূখ- পেয়েছি। বাংলায় কথা বলতে পারছি, গাইতে পারছি, এর চেয়ে সার্থকতা আর কি আছে। এখন অনেকে স্বাধীন বাংলার গান খুব ভাল করে। তবে আরও শুদ্ধ ও যতœ নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান করা উচিত।

Ñগৌতম পা-ে