১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্লামারী বধ্যভূমির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭১ সালে পাক হানাদারবাহিনী ও তাদের এ দেশী দোসর রাজাকার, আলবদর- আলশামসরা খুলনাতে অসংখ্য নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি বানিয়েছিল। গল্লামারী বধ্যভূমি তার একটি। এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলেও তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। এটি খুলনার প্রধান শহীদ স্মৃতিসৌধ। গল্লামারী বেতার ভবন নির্যাতন কেন্দ্র তার আদল হারিয়েছে। এই বধ্যভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। হেলিপোর্ট নির্যাতন কেন্দ্রস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন সার্কিট হাউস ভবন। ভূতের বাড়ি যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়, এই নির্যাতন কেন্দ্রটি এখন আনসার-ভিডিপির কার্যালয়। এভাবে খুলনার অনেক নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি নানা কারণে হারিয়ে গেছে। খুলনায় গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ, হত্যাস্থল, নির্যাতন কেন্দ্র চিহ্নিতসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। খুলনা জেলায় অর্ধশতাধিক নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি স্থানে স্মৃতি ও পরিচিতি ফলক উন্মোচন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত অন্যান্য নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমিতে ফলক স্থাপন করা হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খুলনাসহ এতদঞ্চলে সবচেয়ে বেশি গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। গল্লামারী, চুকনগর, শিরোমনি, চরেরহাট, দেয়াড়া, রেল এলাকা, ফরেস্টঘাট প্রভৃতি স্থানে বড় বড় গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ভূতেরবাড়ি, হেলিপোর্টসহ বিভিন্ন স্থানে ছিল নির্যাতন সেল। গল্লামারী এলাকায় রেডিও সেন্টারে অসংখ্য নর-নারীকে ধরে এনে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে লাশ পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়া হয়। কালের বিবর্তনে খালটির অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া ভার। এই এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী যে রেডিও সেন্টারে ঘাঁটি গেড়েছিল সেটিও এখন নেই। স্বাধীনতার পর এই রেডিও সেন্টার (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার, খুলনা কেন্দ্র) নগরীর নূরনগর এলাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে। আর পুরনো সেই রেডিও সেন্টারের একতলা ভবনকে ঘিরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

পরবর্তীতে একতলা ভবনটি সংস্কার করা হয়েছে। এতে ভবনের পুরনো আদলের পরিবর্তন ঘটেছে। ওই ভবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন দাঁড়িয়ে আছে বহু শহীদের রক্তে রঞ্জিত গল্লামারী বধ্যভূমির ওপর।

২০১৪ সালের ১৯ মে খুলনা মহানগরীর শের-এ-বাংলা রোডের ভাড়া বাড়িতে বাংলাদেশে প্রথম ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হয়। এর সভাপতি বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ গবেষক প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন এবং সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন ডা. শেখ বাহারুল আলম। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া নগরীর ২৬, সাউথ সেন্ট্রাল রোডের নিজস্ব ভবন থেকে আর্কাইভ-জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণসহ বধ্যভূমি, রাজাকার বাহিনীর অত্যাচারের স্থানসমূহ চিহ্নিতকরার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো গেটের সামনে (গল্লামারী বেতার ভবন নির্যাতন কেন্দ্র), নতুন সার্কিট হাউস ভবনের গেটের পাশে (হেলিপোর্ট নির্যাতন কেন্দ্র), আনসার ভিডিপি কার্যালয়ের সামনে গেটের পাশে (ভূতের বাড়ি নির্যাতন কেন্দ্র), সরকারী পাইওনিয়ার কলেজের সামনে (খুলনা প্রথম গণহত্যা), খালিশপুরের চরেরহাট গণহত্যাস্থল, হ্যানে রেলওয়ে স্কুলের সামনে, ফুলতলার জামিরা ইউনিয়নের চারাবাটি, বটিয়াঘাটার বাদামতলা এবং খালিশপুর নয়াবাটি মুন্সিবাড়ী গণহত্যার কবর সংরক্ষণ ও পরিচিতি ফলক উন্মোচন করা হয়েছে। এগুলোতে লেখা রাজাকার-আলবদরসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের বীভৎসতার কাহিনী মানুষ পড়ছে এবং ঘৃণ্য অপরাধীদের প্রতি তাদের ঘৃণাবোধ সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে খুলনাবাসীর বহু আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৯৫ সালের স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে ছোট পরিসরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে স্মৃতি সৌধটি বড় আকারে তৈরি করা হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। স্মৃতিসৌধে প্রতি বছর স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এবং বিজয় দিবসে প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পক্ষ থেকে শহীদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে।

Ñঅমল সাহা, খুলনা থেকে