১৬ মে ২০১৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি মোদির গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষের বিপুল রাজনৈতিক আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে ভারতীয় হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ রেখার আওতায় বাংলাদেশ তার ইচ্ছামতো যন্ত্রপাতি পছন্দ করতে পারবে বলে জানিয়েছেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা।

সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সফল ভারত সফর’-শীর্ষক এক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। সাবেক রাষ্ট্রদূত ও হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ওয়ালিউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট আবদুল মাতলুব আহমাদ, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চক্রবর্তী প্রমুখ।

সেমিনারে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূগোল ও ভাষাগত গভীর বন্ধন রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে এই সম্পর্ক সভ্যতাগত। এরই প্রেক্ষিতে ভারতে ৭-১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরটির, যেটি দীর্ঘ ৭ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে, পর্যালোচনা দরকার। ২০১৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ২০১৫ সালে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এই বিষয়গুলোর অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর ছিল একটি সুযোগ। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর আমাদের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুই প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত যৌথ বিবৃতি নিশ্চিত করেছে যে, ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক ভ্রাতৃবন্ধনের ভিত্তি করে রচিত। সার্বভৌমত্ব, সমতা, বিশ্বাস ও সমঝোতার ভিত্তিতে একটি সার্বিক অংশীদারত্বের প্রতিফলন যা কৌশলগত অংশীদারত্বকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘আমাদের সম্পর্কে একটি সোনালি অধ্যায় সূচিত হয়েছে।’

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, স্থল ও সমুদ্রসীমা চুক্তিসমূহের সফল বাস্তবায়ন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করেছে। আমাদের সহযোগিতা শক্তি সামর্থ্য বাড়ছে। বাকি অঞ্চলের অনুসরণের জন্য একটি নমুনা সম্পর্ক নির্মাণে আমরা একটি দারুণ অবস্থানে আছি। শুধু রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই নয় আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে দুই দেশের জনগণের মধ্যে ‘বন্ধুত্বের’ সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সম্পর্ককে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য তার ব্যক্তিগত গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে দিল্লীর প্রাণকেন্দ্রে একটি সড়কেরও নামকরণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর হিন্দী অনুবাদ উদ্বোধন করেন। উভয় দেশই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে যৌথভাবে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে যেটি ২০২০ সালে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পাবে।

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী ভারতীয় সৈন্যদের পরিবার পরিজনদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মান জানানো ছিল এক বিশেষ শুভেচ্ছার নিদর্শন যা ১২৫ কোটি ভারতীয় জনগণের হৃদয় স্পর্শ করে। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকারও মূল্যায়ন করেছি যা আমাদের সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য অতিরিক্ত দশ হাজার শিক্ষাবৃত্তি প্রদান (বাংলাদেশী টাকায় যার মূল্যমান ৪৬ কোটি); প্রতিবছর ১০০ মুক্তিযোদ্ধাকে ভারতীয় হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান; এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছরের মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা প্রদানের ঘোষণা দেন।

ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষের বিপুল রাজনৈতিক আগ্রহ রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের একটি অঙ্গীকারাবদ্ধ উন্নয়ন অংশীদার এবং আমরা বাংলাদেশকে সহজ শর্তে ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের অঙ্গীকার করেছি। সফরকালে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রদত্ত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ রেখার অতিরিক্ত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার সহজ শর্তে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এটি হচ্ছে ভারত প্রতিশ্রুত কোন একক দেশকে দেয়া বৃহত্তম অঙ্কের ঋণ যা প্রমাণ করে যে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে যথার্থ মূল্যায়ন করি এবং সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেই।

বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি চলমান ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। এতে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফর ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ রেখার জন্য সমঝোতা স্মারকসহ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এর আওতায় বাংলাদেশ তার ইচ্ছামতো যন্ত্রপাতি পছন্দ করতে পারবে। আমাদের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার একটি সফল দৃষ্টান্ত গত বছরে যৌথ অভিযানের সময় দেখা গিয়েছিল, যা ৬৩ জেলেকে উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় ভারত ও বাংলাদেশের কোস্টগার্ডদের মধ্যে পূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর করে তুলতে এপ্রিলে একটি এসওপি স্বাক্ষরিত হয়।

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর ছিল উচ্চ-প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমনÑ তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ, বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, ভূ-বিজ্ঞান ইত্যাদিতে সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেরও একটি সুযোগ। এই মাসের শুরুতে আমরা দক্ষিণ এশিয়া উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছি যেটি বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী সকল দেশকে টেলিযোগাযোগ, টেলি-মেডিসিন খাতে সেবা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় উন্নত সহযোগিতাসহ বহুমাত্রিক সুযোগ-সুবিধা দেবে।