১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমকামিতা: দুই পুরুষে ঘর!

সমকামিতা: দুই পুরুষে ঘর!

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশে সমকামিতার কোন বৈধতা নেই। বর্হিবিশ্বে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ হলেও মুসলিম দেশ হিসেবে এখানে আইনে রয়েছে কড়াকড়ি। শাস্তির বিধান ছাড়াও সমকামীরা সামাজিক ভাবে নানাপদে হেয় প্রতিপন্ন। সমলিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকারীর সঙ্গে পরিবারও সম্পর্ক ছিন্ন করে। তারপরও লোকচক্ষুর অন্তরালে সমকামী সম্পর্ক থেমে নেই। রাজধানী ঢাকায় বিলাসবহুল বাসা ভাড়া নিয়ে এক শ্রেণীর পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনসর্ম্পক স্থাপন করছে। একইভাবে নারীরাও সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। নারীতে নারী সমকামী সম্পর্ক গভীর হচ্ছে।

২০১৩ সালে দুই সমকামী নারীর বিয়ে নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলে ব্যাপক সমালোচনা। দুই নারীর পক্ষে কথা বলায় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে দেশে সমকামিতা উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়। উলামা মাশায়েখ সংহতি পরিষদ নামের একটি সংগঠন ঢাকার ইউনুস সেন্টার ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে সংগঠনটি ওই দুই নারীকে সামাজিকভাবে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। দুই নারীর বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই আরও একটি ঘটনা নজরে এসেছে। মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান ও মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম নামের দুই যুবকের সমকামী সম্পর্ক নিয়ে চারদিকে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

জানা গেছে, মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান ও মোহাম্মদ আজহারুল ইসলামকে সবাই বন্ধু হিসেবেই জানতেন। তারা রাজধানীর ভাটারা থানার জোয়ার সাহারা এলাকার ক-১৪১/৪ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। কিন্তু সম্প্রতি একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের হুমকির প্রেক্ষিতে জানা যায় ওয়াহিদুজ্জামান ও আজহারুল প্রকৃতপক্ষে সমকামী। তারা একে অপরকে ভালোবাসেন এবং তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক রয়েছে। হিযবুত তাহরীর নামের নিষিদ্ধ একটি সংগঠন এক চিঠিতে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। তাদের সমকামিতার ঘটনা প্রকাশ হলে পরিচিত মহলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জানা গেছে, পরিবার পরিজন ও কাছের বন্ধুরাও তাদের এড়িয়ে চলছে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি ওয়াহিদ্দুজামান নামের এক সমকামী বাজার করার উদ্দেশ্যে বাসার বাইরে বের হলে তার উপর হামলা হয়। সে গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ভর্তি করে। প্রাথমিক চিকিৎসা সহ তাকে হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসা দেয়া হয় বলে ঢামেক সূত্রে জানা গেছে। আক্রমণের ঘটনায় মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান বাদী হয়ে রাজধানীর ভাটারা থানায় সধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। ২০ জুলাই ২০১৪ তারিখে থানায় করা ওই জিডির অনুলিপি থেকে জানা গেছে, তাকে হিযবুত তাহরীর, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ নামের বিভিন্ন সংগঠন প্রাণ নাশের হুমকি দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ভাটারা থানার সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) গোলাম রসুল বলেন, মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান প্রাণ নাশের হুমকি পাওয়ার কথা আমাদের লিখিতভাবে জানিয়েছেন। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোন কারণ উল্লেখ করেন নি। যে এলাকায় তিনি থাকতেন সেই এলাকায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি ওয়াহিদুজ্জামান ও আজহারুল বন্ধু হলেও মূলত তারা সমকামী। অর্থাৎ তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। যা আইন পরিপন্থী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমকামিতা বাদে অন্য কোন ঘটনা জড়িত আছে আছে কিনা বা কি কারণে তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি।

এ ঘটনায় ওয়াহিদুজ্জামান ও আজহারুলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা সামাজিক মর্যাদার অজুহাত দেখিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তাদের পরিচিত মহলের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, তাদের সমকামিতার তথ্য আর লুকোচুরি নয় বরং অনৈতিক সম্পর্কের তথ্যই সমাজে প্রকাশ পেয়েছে। তাদের এক বন্ধু বলেন, জীবননাশের হুমকির চেয়ে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার কষ্ট দুই বন্ধু ভুলতে পারছেন না। ঘটনাটি গড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। দুই নারীর বিয়ের পর দুই পুরুষে ঘর এমন খবরে সমকামিতা নিয়ে সমালোচনা তুঙ্গে। আইনি প্রতিবন্ধকতা থাকায় নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতে হচ্ছে মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান ও মোহাম্মদ আজহারুলকে। জিডি করে তারা আরও বিড়ম্বণার স্বীকার হয়েছেন। ভয় দেখানো হয়েছে জেল হাজতের। বেআইনি কাজের জন্য চার শিকে বন্দী করা হতে পারে বলেও থানা থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, আইনী প্রতিবন্ধকতা থাকায় দেশে ঠিক কতো সংখ্যক সমকামী রয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে সমকামীদের পক্ষেও কোন কোন সংগঠন কথা বলছে। নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছে। আর সমকামিতার বিপক্ষে সোচ্চার দেশের ইসলামিক দলগুলো। তাদের মতে এ ধরণের সম্পর্ক শুধু অনৈতিকই নয়; প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে দেয়ার চক্রান্তও। অন্যদিকে সামাজিকভাবেও এ ধরণের সম্পর্ক কোনক্রমেই মেনে নেয়া হয় না। যদি কেউ তাদের গে বা লেসবিয়ান হিসেবে ঘোষণা দেয় তবে তাকে অবশ্যই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

দেশে সামাজিক নীতি অনুসারে সমকামিতা এক ধরণের যৌনবিকৃতি, একই সঙ্গে এটি মানসিক বিকৃতিও। স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক (পুরুষ ও নারী) বাদে অন্য সকল সম্পর্কই এখানে মানসিকভাবে বিকৃতির উদাহরণ হিসেবে প্রতিয়মান। দেশে সমলিঙ্গের মেলামেশাকে দৃষ্টিকটু হিসেবে দেখা না হলেও, সমলিঙ্গের সম্পর্ককে কোনভাবেই মেনে নেয়া হয় না। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে এখানে আইনের কড়াকড়ি ছাড়াও ধর্মীয়ভাবে গোড়ামী রয়েছে। এক তথ্য থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে সমকামী সম্পর্ক এবং সম লিঙ্গের বিয়ে বেআইনি এবং এজন্যে সাজা দশ বছরের সশ্রম কারাদন্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সমকামী বিয়ে বৈধ। প্রায় ২০ টি দেশে সমকামী বিয়ের বৈধতা রয়েছে। তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০০৩ সালে বেলজিয়াম, ২০০৫ সালে স্পেনে, ২০০৯ সালে নরওয়ে, একই বছর সুইডেন, ২০১০ সালে পর্তুগাল, একই সময়ে আইসল্যান্ড, ২০১২ সালে ডেনমার্ক ও সর্বশেষ ২০১৪ সালে ফিনল্যান্ডে সমকামী বিয়ের বৈধতা দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, লুক্সেমবুর্গ, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ অন্তত ২০ টি দেশে সমকামীদের অধিকার সুরক্ষায় আইন আছে। তবে সমকামী বিয়ের বৈধতার তালিকায় এশিয়ার কোন দেশ নেই। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী সবকটি দেশেও সমকামিতা অবৈধ। ফলে, সমকামীরা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের পর সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণনাশের হুমকিও পাচ্ছে। পাচ্ছে না আইনি কোন নিরাপত্তাও।