১৬ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সবই দেশীয় জাত, ফরমালিনমুক্ত কেনাকাটা

সবই দেশীয় জাত, ফরমালিনমুক্ত কেনাকাটা
  • মৎস্যমেলা

মোরসালিন মিজান ॥ গভীর জলের মাছ। খুব শোনা যায় কথাটা। কিন্তু শহর ঢাকার কোথাও গভীর জল নেই। যৎসামান্য জল আছে। তাতে তো আর মাছ হয় না। ভরসা তাই ডিপ ফ্রিজ। ওখানেই মাছ দেখে দিব্যি বড় হয়ে যাচ্ছে আজকের প্রজন্ম! ভাতে মাছে বাঙালী। অথচ সেই বাঙালী মাছ সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা রাখে না। এই যখন অবস্থা তখন রাজধানীতে মৎস্য মেলার আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বৈকি। প্রতিবছরের মতো এবারও সপ্তাহব্যাপী মেলার আয়োজন করেছে মৎস্য অধিদফতর। ভেন্যুটি ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ। এখানে জলভর্তি চৌবাচ্চায় সুন্দর সাঁতার কাটছে মাছ। জীবন্ত মাছ দেখে যে কারও মনে হবে, আহা, কতকাল পর এমন দৃশ্য দেখছি! অবশ্য দেখা নয় শুধু, দেশীয় সব জাতের সর্বশেষ তথ্য চাইলে এখান থেকে সংগ্রহ করা যাবে। আছে ফরমালিনমুক্ত দেশী মাছ কেনার সুযোগ।

মেলায় মোট স্টল আছে ২৯টি। ১১টি সরকারী প্রতিষ্ঠান। বাকি ১৮টিতে পসরা সাজিয়েছেন বেসরকারী উদ্যোক্তারা। সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সারা বছরই মাছ নিয়ে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের পরিসংখ্যান, গবেষণা, আবিষ্কৃত চাষ পদ্ধতিসহ নানা বিষয়ে তথ্য দিচ্ছে মেলায় অংশ নেয়া স্টলগুলো। প্রথমেই চোখে পড়ে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্টল। এখানে বেশকিছু কাচের চৌবাচ্চা। সবকটিতে জীবন্ত মাছ। বেদম ছোটাছুটি করছে। খেলছে। স্টলের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা সিরাজুম মুনির জানালেন, এসব মাছের রোগ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ফলি তত্ত্ব, গবেষণাসহ নানা কাজ করে এই ইনস্টিটিউিট। উদাহরণ দিতে বিশাল একটি রুই মাছের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বললেন, খেয়াল করুন মাছটি আকারে অনেক বড়। সাধারণ জাতের চেয়ে আমাদের উদ্ভাবিত এই জাতটির বৃদ্ধি ১৬ শতাংশ বেশি। তেলাপিয়া দেখিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ জাতের তুলনায় এটি ৩৫ শতাংশ বেশি বৃদ্ধি লাভ করেছে। কিছু চৌবাচ্চায় রাখা হয়েছে উন্নত জাতের পোনা। না, কোনটি কোন মাছের পোনা দেখে বোঝার উপায় নেই। স্টলের ওই কর্মকর্তা জানালেন, কৃত্তিম প্রজননের মাধ্যমে সৃষ্ট পাবদা, গুলশা, টেংরা, শিং, মাগুর, ভেদাসহ বিভিন্ন মাছের পোনার উন্নত প্রজাতি এখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসব প্রজাতি চাষ করলে কেমন ফল পাওয়া যায় তা দেখাতেই রাখা হয়েছে পরিণত মাছ।

সামুদ্রিক মাছ সচরাচর দেখা যায় না। সব মাছের নামও বলতে পারবেন না সবাই। তবে মেলায় গেলে জাতগুলো সম্পর্কে সহজেই জানা যায়। বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের স্টল থেকে নানা তথ্য দেয়া হচ্ছে। এখানে উপস্থাপনাটাও একটু অন্যরকম। ল্যাবরেটরির মতো দেখতে। অনেকগুলো কাচের বৈয়াম কয়েক সারিতে সাজিয়ে রাখা। ফরমালিন ভর্তি বৈয়ামে সামুদ্রিক মাছ। বাহির থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। কৌতূহলী চোখে দেখছিলেন দর্শনার্থীরা। প্রকল্পের সহকারী পরিচালক সুশোভন মজুমদার জানান, দেশের সমুদ্রসীমায় মাছের যে সকল স্পেসিস পাওয়া যায় প্রায় সবগুলো এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোন মাছ কী পরিমাণে আছে সে বিষয়েও তারা তথ্য সংগ্রহ করেন বলে জানান তিনি।

মেলায় বিভিন্ন জেলার মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প, জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন, চাষ পদ্ধতি, প্রজনন ইত্যাদির মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে।

মেলার বিভিন্ন স্টলে পাওয়া যাচ্ছে উন্নত জাতের পোনা। সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী উদ্যোক্তারা পোনা প্রদর্শন ও বিক্রি করছেন। ময়মনসিংহের রূপালী হ্যাচারীর স্টলে অনেকগুলো গোলাকার কাচের জার। এসবের ভেতরে মাছের পোনা ছোটাছুটি করছে। উদ্যোক্তা আহম্মদ আলী আবার স্বর্ণপদক বিজয়ী। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গত কয়েকদিন আগে এই পদক গ্রহণ করেছেন তিনি। বলেন, আমি উন্নত জাতের পোনা উৎপাদন করি। এ কাজে কোন দুর্বলতা রাখি না। জেনে বুঝে পোনা সংগ্রহের পরামর্শ দেন তিনি।

আর যা না বললেই নয় তা হলো, মেলায় আছে ভরপুর কেনাকাটার সুযোগ। কোন ফরমালিন নেই। নদী, খালবিল হাওড় থেকে সংগ্রহ করা মাছ নির্ভয়ে কেনা যাচ্ছে। সরকারী প্রতিষ্ঠান মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের স্টলের তো ব্যাপক ভিড়। আগ্রহ নিয়ে দেশীয় মাছ কিনছিলেন ক্রেতা। মার্কেটিংয়ের কাজে যুক্ত কর্মকর্তা নূর আলম জানালেন, সারা দেশের প্রতি প্রান্ত থেকে তারা মাছ সংগ্রহ করেন। প্রক্রিয়াজাত করেন। তার পর ট্রাকে করে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্রি করা হয়। এসব মাছে কোন ধরনের ফরমালিন নেই নিশ্চিত করে তিনি বলেন, প্রকৃত মাছের স্বাদ নিতেই ক্রেতারা আমাদের স্টলে ভিড় করছেন। ভৈরব কিশোরগঞ্জ বরিশাল কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করা মাছ দেখিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিক্রির সময় কোন লাভও করি না। বেসরকারী স্টলগুলোতেও বিশালাকার মাছ। দেখেই অবাক হয়ে যেতে হয়। মের্সাস এবিএম ফিশের স্টলে প্রতি কেজি বড় ইলিশের দাম ১ হাজার টাকা। এছাড়া ভৈরবের গলদা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা কেজিতে। মেলায় সবচেয়ে দামী মাছের মধ্যে দেখা গেল ১০ কেজি ওজনের একটি শীলন মাছ। মাছটির দাম পড়বে প্রায় ১০ হাজার টাকা। অন্য একটি স্টলে নদীর কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা কেজিতে। আর এখানকার সবচেয়ে বড় কাতলাটির দাম ৪ হাজার টাকা। পাঁচতারা নামের একটি স্টলে দেখা গেল, শরীয়তপুর থেকে আনা চিতল। মাছটি খুব কম দেখা যায় এখন। ক্রেতারা তাই খুব আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন। আমিনুর রহমান নামের এক ক্রেতা বললেন, আমার খুব প্রিয় মাছ চিতল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এর চেহারা দেখিনি। তাই অবাক হয়ে দেখছি। দাম যতই হোক, কিনে তবেই ঘরে ফিরবেন বলে জানান তিনি। মহিলা ক্রেতার সংখ্যাও কম নয়। পাশের একটি সরকারী অফিসে কাজ করেন শায়লা আবেদিন। কয়েক দফা মাছ কিনেছিলেন। এত মাছ কেন কিনছেন? জানতে চাইলে বলেন, এখান থেকে প্রতিবছরই মাছ কিনি আমি। প্রকৃত মাছের স্বাদ কী তো ভুলে গেছে বাচ্চারা। তাদের জন্যই বেশি করে মাছ কেনা বলে জানান তিনি।

চারদিনব্যাপী মেলা চলবে আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সময় আছে? মিস করবেন না একদম!