১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্ভাবনাময় ঝিনুক শিল্প

  • সুমন্ত গুপ্ত

ঝিনুক শিল্প আমাদের দেশে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের নাম। এ দেশে ঝিনুক চাষের রয়েছে উজ্জ্বল সম্ভাবনা। ঝিনুক থেকে পাওয়া যায় মহামূল্যবান বস্তু ‘মুক্তা’। বিশ্বব্যাপী অমূল্য রতœরাজির ক্ষেত্রে হীরার পরই মুক্তার স্থান। যা প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। প্রাণী বিজ্ঞানের পরিভাষায় মোলাস্কা পর্বেও কয়েকটি প্রাণীর দেহ নিঃসৃত পদার্থ জমাট বেঁধে যে পদার্থ সৃষ্টি হয় তাই ‘মুক্তা’ নামে পরিচিত। আর এ সৃজন কর্মটি সম্পন্ন হয় ঝিনুকের দেহ অভ্যন্তরে। সেজন্য মুক্তার চাষ দেশের জন্য বয়ে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। সেই সঙ্গে সৃষ্টি করতে পারে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। ঝিনুক হতে স্বল্পসময়ে অধিকতর মুনাফা অর্জন সম্ভব না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটির উচ্চতা অন্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঝিনুককে আমরা বিভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারি। ঝিনুক লোনা ও স্বাদু উভয় পানিতে হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বহুকাল থেকেই মূল্যবান রতœ মুক্তা আহরণের জন্য ঝিনুক চাষ করে আসছে। মুক্তা উৎপাদনে চীন, জাপান শীর্ষস্থান দখল করে আছে বহুদিন থেকে। এছাড়া ভারত, ফিলিপিন্স, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, কানাডা, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি দেশেও ব্যাপক হারে ঝিনুক চাষ হয়ে থাকে। ইউরোপ-আমেরিকায় ঝিনুক মানব খাদ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর থেকে মুক্তার চাষ শুরু হলেও চীনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে থেকে এর চাষ হয়ে আসছে। সারা বিশ্বে অসংখ্য প্রজাতির ঝিনুক দেখতে পাওয়া যায়। তার মধ্যে পিস্কটাডা মাটেনসি, পিস্কটাডা ম্যাক্সিমা, পিস্কটাডা মার্গারিটিপেরা, টোরিয়া, টোরিয়া ভালগারিস, লেমিলিডেন্স, সারজিনলি, ইউনিট, প্লেকুরাপ্লানসেটা ইত্যাদি প্রজাতির ঝিনুক থেকে উন্নতমানের মুক্তা পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের লোনা পানিতে ৩০০ প্রজাতির এবং মিঠা পানিতে ২৭ প্রজাতির ঝিনুক রয়েছে। তবে বাংলাদেশে ৫ ধরনের ঝিনুকে মুক্তা হয়। ঝিনুকের মধ্যে মুক্তা সাধারণত দু’ভাবে হয়ে থাকে। একটি প্রাকৃতিকভাবেই অর্থাৎ ঝিনুক চলাফেরা বা খাদ্য গ্রহণের সময় হঠাৎ বহিস্থ কোন পদার্থ ঝিনুকের মধ্যে ঢুকে মাংসপি-ে আটকে যায় তখন সেটি আর বেরোতে পারে না তখন সেখানে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান ওই বহিস্থ পদার্থের উপরে জমতে জমতে মুক্তার সৃষ্টি হয়। আর কৃত্রিম বা চাষ মুক্তা বলতে বহিস্থ পদার্থটি ঝিনুকের দেহে মাংসপি-ে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢুকিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বসিয়ে দেয়া হয় এবং ওই স্থানে ঝিনুক ব্যথা অনুভব করে এবং ওই ব্যথা নিরাময়ের জন্য এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান ছড়ায় এবং এই উপাদান জমতে জমতে মুক্তার জন্ম হয়। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় নেইকার বলা হয়। নেইকার অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রঙেরও পরিবর্তন হয় এমন স্বচ্ছ স্ফটিক ষড়ভূজ এ্যারোগোনাইটের কণিকা।ঝিনুকের মূল্যবান ও আকর্ষণীয় সামগ্রীর মধ্যে লাইটশেড, ঝাড়বাতি, পর্দা, চাবির রিং, টেবিল ল্যাম্প, ঝাড়ু, ফুল, এ্যাশট্রে, কানের দুল, মালা, হাতের চুড়ি, চুলের ক্লিপসহ বিভিন্ন ধরনের পুতুল, পশু-পাখির মূর্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ঝিনুকের এসব সামগ্রীর কদর দিন দিন বাড়ছে। ঝিনুকের তৈরি নিত্যনতুন ডিজাইনের সামগ্রী ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঝিনুক সামগ্রীর চাহিদাও রয়েছে। আজকাল শুধু ঝিনুকের সামগ্রীই নয় ঝিনুকের মাংসেরও যথেষ্ট চাহিদা ও কদর বাড়ছে। ঝিনুক থেকে পান খাওয়ার চুন তৈরি করা হয়। ঝিনুকের গুঁড়া মৎস্য ও পোলট্রি ফার্মে খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আমাদের দেশে ঝিনুক একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নানা অবহেলা আর অযতেœর কারণে এ শিল্পটি আজ পরিপূর্ণ শিল্পের মর্যাদা লাভ করতে পারছে না। তাই এ শিল্পের দিকে গুরুত্ব দিলে এ থেকে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে এবং সেই সঙ্গে অনেক বেকারও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।