২৩ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভালবাসার বাংলাদেশ, মানুষ দাঁড়াল মানুষের পাশে

ভালবাসার বাংলাদেশ, মানুষ দাঁড়াল মানুষের পাশে
  • মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম

মোরসালিন মিজান ॥ হাউ মেনি ডেথস উইল ইট টেক টিল হি নোজ/দ্যাট টু মেনি পিপল হ্যাভ ডাইড? প্রশ্নটা বব ডিলান করেছিলেন। সেই কবে কোন কালে! গানের সুরে সুরে এই যে জানতে চাওয়া, না, আজও শেষ হলো না! আজও উত্তর মেলেনি। পৃথিবী একইরকম নিষ্ঠুর আছে। মানুষের হাতে রক্ত। মানুষ মারছে আরেক মানুষকে। দেশের কথা বলে জাতের কথা বলে মারছে। ধর্ম এবং বর্ণের কথা বলে চলছে নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকা-। কিন্তু আর কত? কত আর মরলে পরে খুনীদের উপলব্ধি হবে, অনেক মানুষ মরেছে?

হ্যাঁ, পুরনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে, আবারও। খুব বেশি দূরের দেশ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে চলমান নৃশংসতা প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। যৌক্তিক এবং জোরালো করেছে। অথচ এত বড় বিশ্ব চুপ! বড় বড় নেতারা নীরব দর্শক! মানবতার কথা বলার মতো কোন সংঘ যেন নেই! পৃথিবীর কেউ ভাল তো বাসে না/এ পৃথিবী ভাল বাসিতে জানে না...। বেদনার গীত তাহলে সত্য প্রমাণিত হবে? না, সেটি হয়নি। নিজের ছোট্ট ভূখ-ে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ঠিকই আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। সীমাবদ্ধতা গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু মন বড় যে! মনের জোরেই বাঙালী মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিশ্ববিবেক লজ্জায় মুখ ঢেকেছিল। বাংলাদেদেশকে দেখে যেন শক্তি সাহস পাচ্ছে তারাও। এখন সকলের চেষ্টায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজ দেশে ফিরে যাবে। ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি হবে। যদি হয়, বিজয়ী হবে মানবতা।

বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্যায় অবিচার পৃথিবীতে হয়। হচ্ছে। এখনও বহু দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমারের বর্বরতা যেন সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। একটু পেছনে থেকে বললে, চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতাব্দিতে আরাকান ছিল স্বাধীন মুসলিম রাজ্য। আরাকান সাম্রাজ্যের ভিত্তি নির্মিত হয় তখন। ১৪০৪ সাল থেকে ১৬১২ সাল পর্যন্ত ১৬ জন মুসলিম সম্রাট আরাকান শাসন করেন। কিন্তু রাজ্যের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে বার্মা রাজা বোধাপোয়া ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে বার্মার সঙ্গে যুক্ত করেন। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশদের সঙ্গে এক যুদ্ধের ফলে বার্মা সরকার আরাকান, আসাম এবং মনিপুরের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ইউনিয়ন অব বার্মা। এর পর থেকে আরাকান হয়ে যায় বার্মার অংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাঙালী আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালাতে থাকে। তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য মানবতা বিরোধী বীভৎস কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে আরাকানী মুসলমানরা সর্বপ্রথম শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেই থেকে শুরু। ১৯৮২ সালে প্রণীত এক আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়। রোহিঙ্গাদের এক ধরনের বিদেশী এবং রাষ্ট্রহীন জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা চলে। বেড়ে যায় হত্যা নির্যাতন।

আর সাম্প্রতিক সময়ে সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, বিগত দিনের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে চুরে দিয়েছে মিয়ানমার। গত কিছুদিন ধরে মৃত্যুর উৎসব চলছে দেশটিতে। নিজের দেশের মানুষকেই ওরা মারছে। দুর্বল সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কখনও মুসলমান বলা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে বাঙালী। মানুষ ভাবা হচ্ছে না একদম। রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়ে তাদের বাড়িতে আগুন দিচ্ছে। পুড়িয়ে মারছে তাদের। নারীরা ধর্ষণের শিকার। শিশুটিও শিশু বলে রক্ষা পাচ্ছে না। এমনকি মিয়ানমারের অনেক সাধারণ নাগরিক সমর্থন করছে হত্যাকা-! কোন প্রতিবাদ করছে না। এভাবে মানুষের কাছে মানুষ হয়ে পড়েছে অসহায়। ভয়ানক অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হতভাগা মানুষ দ্বিগি¦দিক ছুটছে।

এত বড় পৃথিবী! অথচ সবগুলো দ্বার বন্ধ। নির্যাতিতদের ঠাঁই হচ্ছে না কোথাও। নির্যাতন বন্ধে কোন তৎপরতা নেই বিশ্ব নেতাদের। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে কেউ দাঁড়াচ্ছে না। পৃথিবীর কেউ ভাল তো বাসে না/এ পৃথিবী ভালবাসিতে জানে না...। এই বেদনার গীত সত্য হতে চলেছিল। এবং অতঃপর এগিয়ে এলো বাংলাদেশই। জনমের সাধ ডাকি গো মা তোরে/কোলে তুলে নিতে আয় মা...। বাংলাদেশ মা হয়ে কোলে তুলে নিল অন্যের সন্তানদেরও। সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ৩ লাখেরও বেশি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে সীমিত সাধ্যের বাংলাদেশ। এত মানুষ! অল্প জায়গা। নিজেদের সঙ্কটের শেষ নেই। এ অবস্থায় শঙ্কা তো জাগেই। তবুও পিছ পা হয়নি সরকার। ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। কিন্তু হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীস্টান বিবেচনায় কাউকে আশ্রয় দেয়া হয়নি। এই দেশের জাতীয় কবি নজরুল লিখেছিলেন, “হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?/কা-ারী! বল ডুবিছে মানুষ...। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সরকার গুরুত্ব দিয়েছে মানবিকতাকে। এমনকি মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিদর্শন করেছেন শরণার্থী শিবির। মানুষের কষ্ট দেখে কেঁদেছেন বিশ্বনেত্রী। মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশাকে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন। এবং খুব আশার কথা এই যে, দেশ এবং দেশের সরকার নয় শুধু, বাংলাদেশের মানুষ দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে। মিয়ানমারের মানুষের কান্নাকে তারা নিজের করে নিয়েছেন। তরুণ-তরুণীরা অর্থ ত্রাণ ইত্যাদি সংগ্রহ করছেন। যা পাওয়া যাচ্ছে নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন অনাহারীদের কাছে। কবিরা কবিতায় প্রতিবাদ করছেন। নির্মলেন্দু গুণের কথাই ধরা যাক, তিনি মিয়ানমারে চলমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমনকি যুদ্ধে নামার দাবি জানিয়েছেন। শিল্পীরা কথা বলছেন রং তুলিতে। গত কয়েক দিনে একটি সিরিজ ছবি আঁকার কাজ শেষ করে ফেলেছেন শিল্পী প্রদ্যোত দাস। তার ক্যাম্পাস আগুনে পোড়া। মানুষ পুড়ছে। তার বিশ্বাস এবং স্বপ্ন পুড়ছে। মানতে পারছেন না শিল্পী। এমনকি ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা অন্য অপরিচিত অচেনা শিশুর কথা ভেবে মনোবেদনায় ভুগছে। সব দেখে আশাবাদী হতে হয়। পৃথিবীকে অমানবিক ও খুনীদের হতে দেয়নি বাংলাদেশ! এখন বাকি বিশ্ব এই ইস্যুতে তাদের কর্তব্য পালন করবে। করলেই উৎসাহিত হবে শুভ উদ্যোগ। পৃথিবী মানুষের হবে।