১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যত প্রশ্ন তত ফাঁস

পরীক্ষার শেষ নেই; শুধু স্কুল-কলেজের পরীক্ষা তো নয়, আছে সংগঠন ও সংস্থার নানা পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা। সে সরকারী হোক, কিংবা হোক বেসরকারী। সমকালে সংস্কৃতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যত পরীক্ষা তত যেন ফাঁস। প্রশ্নপত্র ফাঁসের চোরাবালি থেকে কোন পরীক্ষাই যেন বেরিয়ে আসতে পারছে না। তাতে ফাঁস লাগছে নীতিনৈতিকতার গলায়, দেশের সামনের পথ চলায়। সত্যি বলতে কি, দেশে এখন খুব কম পাবলিক পরীক্ষা আছে, যার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠেনি! ফাঁস হয়েছে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্র ফাঁস, অবৈধপথে তা গ্রহণ ও সমস্যার সমাধান না হওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়ার আলামত।

বিসিএস, মেডিক্যাল থেকে শুরু করে প্রাথমিক সমাপনীÑ হেন পরীক্ষা নেই যার কোন না কোন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি! এটা বছরের পর বছর চলেই আসছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয়েছে এবং কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে মামলাও হয়েছে। এবং দেখা গেছে, প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারী প্রেসে ছাপার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়েই ফাঁসচক্রটি গঠিত।

সম্প্রতি সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি বড় চক্র। একবার রাজধানীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের শিক্ষকসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতারকৃতরা ফেসবুক হোয়াটসআপ, ভাইবার, টুইটার, ইমোসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা এইচএসসি পরীক্ষাসহ মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, নটর ডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, একটি বাড়ি একটি খামার নিয়োগ পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। বলাবাহুল্য, প্রশ্ন জালের সুবিশাল নেটওয়ার্কের এটি একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ। এছাড়াও রয়েছে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্র।

সরকারী এক হিসেবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারী তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসসি, পিএসসি, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের গণিত পরীক্ষায় পশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পরিসংখ্যান বেসরকারী হিসেবে সংখ্যা আরও বাড়বে। এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষায়। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনটিরই বিশেষ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রশ্নপত্রের জাল ছিন্ন করার কাজটি দুরূহ হয়ে পড়েছে।

পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, দু’উদ্দেশ্যে শিক্ষকরা প্রশ্ন ফাঁস করেন। তা হচ্ছে- পাসের হার বাড়ানো এবং অর্থ উপার্জন। পাসের হার বাড়ানোর কয়েকটি উদ্দেশ্য আছে। একটি হচ্ছে, কোচিংয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে সহায়তা। দ্বিতীয়টি, স্কুলের পাসের হার বাড়ানো। সম্প্রতি যোগ হয়েছে কেন্দ্রের পাসের হার বাড়ানো। বিভিন্ন সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ঘটনা ধরা পড়েছে। সব ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই জাল যে কোন মূল্যে ছিন্ন করতেই হবে। দুটো উপায় রয়েছে। এক, এই আত্মঘাতী অপরাধকর্মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে স্বল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান। দুই, জালচক্রের শেকড় উপড়ে ফেলা। আর সময়ক্ষেপণ নয়, এখনই কাজ শুরু করা চাই।