২২ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দলীয় নৈপুণ্যের ফসল সাফ শিরোপা

  • ম্যাচ শেষে বললেন অধিনায়ক মারিয়া, সেরা খেলোয়াড় আঁখি ও গোলদাতা শামসুন্নাহার

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ আশির দশকের একটি জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘প্রতিরোধ।’ এই সিনেমায় হৈমন্তি শুক্লার কণ্ঠে একটি গান ছিল, ‘ডাকে পাখি খোল আঁখি/দেখ সোনালী আকাশ/বহে ভোরের বাতাস।’ বাংলাদেশ অ-১৫ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলে এমন এক খেলোয়াড় আছে, যার খেলা আঁখি ধাঁধানো, তার নামটিও আঁখি। পুরো নাম আঁখি খাতুন। সে সদ্যসমাপ্ত সাফ অ-১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে নির্বাচিত হয়েছে ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’ হিসেবে। ফাইনাল শেষে পুরস্কারটি নিয়ে যখন সে পোস্ট ম্যাচ কনফারেন্সে এলো, তখন বোঝা গেল দারুণ লাজুক সে। ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির অধিকারী সে। দীর্ঘাঙ্গী। দলের সবচেয়ে লম্বা ফুটবলার। অথচ লজ্জায় একেবারেই যেন খাটো হয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে তার মুখ থেকে বের করা গেল মাত্র একটি বাক্যই, ‘আমরা সবাই ভাল খেলেছি। চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাই খুশি। আত্মবিশ্বাস ছিল, আমরাই জিতবো। দোয়া করবেন, যেন আগামীতেও বাংলাদেশ এ রকম সাফল্য পায়।’

ফাইনালের আগেরদিন অবশ্য এরচেয়ে লম্বা বাক্য আওড়েছিল সে, ‘এখনও খেলা শেষ হয়নি। তাই লীগ ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে আমরা কোন রকম আনন্দ-ফূর্তি করিনি। গত তিনটি ম্যাচ যেভাবে খেলেছি, ফাইনালেও সেভাবেই খেলে জিততে চাই। আশাকরি দেশবাসীর দোয়া ও সমর্থন থাকলে আমরা বিজয়ী হব।’

শৈশব থেকেই স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। অন্তরে সেই প্রত্যয় নিয়ে সেই পথে চলছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পাটগোলার মেয়ে আঁখি খাতুন। এই আসরে দুটি গোল করেছে আঁখি। অথচ তার পজিশন ডিফেন্ডার। বিকেএসপির নবম শ্রেণীর এই শিক্ষার্থী এখন দেশের বয়সভিত্তিক ফুটবলে অটোমেটিক চয়েস। উচ্চতায় লম্বা হওয়াতে আঁখি পায় বাড়তি সুবিধা। যা অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখে তাকে। লম্বা ফ্রি-কিকেও পারদর্শী। বাংলাদেশ দলের রক্ষণভাগের এক অতন্দ্র প্রহরী। ডিফেন্স থেকে ওপরে ওঠে যেভাবে গোল করে তা দেখে অনেকের বাংলাদেশের কায়সার হামিদের কথা মনে পড়ে যায়। মজার ব্যাপারÑ তাজিকিস্তানে গত বছর এএফসি অ-১৫ আসরে নেপালের বিপক্ষে গোলটি ছিল আঁখির প্রথম গোল। ওই ম্যাচে ছোটন তাকে খেলিয়েছিলেন মিডফিল্ডার হিসেবে। পাস্ট ম্যাচ কনফারেন্সে উপস্থিত ছিল দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দাও। তার অভিমত, ‘২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের শুভেচ্ছা সবাইকে। আমাদের এই সাফল্য প্রধানমন্ত্রীর জন্য উপহার। চ্যাম্পিয়ন হয়ে খুবই খুশি। খুব ভাল লাগছে। এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। এই বিজয়ের ক্ষণে মনে পড়ছে আমাদেরই আরেক সতীর্থ সাবিনা ইয়াসমিনের কথা। আজ সে বেঁচে থাকলে আমাদের দলে থেকেই বিজয় উদযাপন করতে পারতো। আমরা চেষ্টা করেছি নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে। ভারতের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে সেভাবেই আক্রমণ করার চেষ্টা করেছি। ছেলেরা এর আগে সাফ অ-১৬ এবং মূল সাফে একবার করে মোট দু’বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। মেয়েদের এতদিন এমন কোন অর্জন ছিল না। এখন আছে। দর্শক আজ প্রচুর এসেছিল মাঠে। তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের ভাল খেলতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’

ফাইনালে ভারতকে হারানোর নায়িকা শামসুন্নাহার। তার গোলেই জেতে বাংলাদেশ। তার অনুভূতি, ‘কোচ ছোটন স্যার বলেছিল, দেখাইয়া দাও। লেফটব্যাক থেকে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলাটা ছিল চ্যালেঞ্জের। এ নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে (অ-১৪, ১৫ ও ১৬) খেলে সাতটা গোল করেছি। তবে আজকের ফাইনালের গোলটাই হচ্ছে সেরা। কারণ আমার গোলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ।’

দলের সাফল্যের নেপথ্য কারিগর কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। তিনি বলেন, ‘শুরুতে লক্ষ্য ছিল ম্যাচ বাই ম্যাচ অগ্রসর হওয়া, ১৬ কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি বলে আনন্দিত। বিজয়ের মাসে আমাদের এই অর্জন উৎসর্গ করছি সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের এবং ক্রীড়াপ্রেমী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাাসিনাকে। স্মরণ করছি আমাদের দলের প্রয়াত সাবিনা ইয়াসমিনকেও। শামসুন্নাহার হচ্ছে ন্যাচারাল ট্যালেন্ট। কয়েক বছর ধরে দেখছি সে ডিফেন্স থেকে প্রায়ই আক্রমণে উঠতো। এ জন্যই তাকে এই আসরে পজিশন বদলে ফরোয়ার্ড করে দেই। খেলার শুরুতেই আমরা যে গোলটি করি সেটা রেফারি অজ্ঞতার কারণে বাতিল করে দেন। ওটা গোলই ছিল।’ ছোটন আরও বলেন, ‘এ আসরে আমরা একটা গোলও খাইনি। এ জন্য ধন্যবাদ জানাই দলের গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডারদের। এটা একটা বিশাল অর্জন।’

সবশেষে ছোটন বলেন, ‘মেয়েদের এই সাফল্য আমাদের ফুটবলকে আরও অনেক এগিয়ে দেবে। বাংলাদেশকে আরও বেশি করে চিনবে ফুটবলবিশ্ব। এই মেয়েরা সিনিয়র সাফে অংশ নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি এবং সেটা ২০২০ সালের মধ্যেই। তবে আপাতত লক্ষ্য ২০১৮ অ-১৮ মহিলা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা। এ নিয়ে বয়সভিত্তিক দল নিয়ে চারবার সাফল্য পেলাম। তবে এই সাফল্যটিই ছিল বেশি বেশি কঠিন, সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কোচ মায়মল রকি বলেন, ‘ফাইনালে দুইদলই ভাল খেলেছে। চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন।

তারা শ্রেয়তর ফুটবল খেলেছে। ম্যাচে আমরা গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি, যেটা পেরেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ আমাদেরই বেশি ছিল। বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের জাগরণ চলছে। তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল।’