১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অসহযোগ আন্দোলন ॥ মহাত্মা গান্ধী থেকে বঙ্গবন্ধু

  • সৈয়দ জিয়াউল হক

‘অসহযোগ আন্দোলন’ শব্দটির সঙ্গে এই উপমহাদেশের মানুষের প্রথম পরিচয় ১৯২০ সালে। তখন ব্রিটিশ শাসনের যুগ। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ১৯২০ সালের ৩১ আগস্ট মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মূলত রাউলাট আইন এবং জানিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা-ের প্রতিক্রিয়ায় এই আন্দোলন শুরু হয়।

১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ সরকার রাউলাট আইন জারি করেন। এই আইনের ক্ষমতাবলে শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বিনা বিচারে যে কোন রাজনীতিবিদকে আটক রাখার বিধান চালু করা হয়। আর জানিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা- সংঘটিত হয় ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। ঐদিন পাঞ্জাবের অমৃতসরে স্বর্ণালি মন্দিরের কাছে জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক স্থানে এক বৈশাখী জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। মাঠটি ছিল দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যার পাঁচটি প্রবেশ পথ ছিল। সভার একপর্যায়ে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রায় শ’খানেক গুর্খা ও পাঠান পুলিশের বর্বরোচিত হামলায় ৩৭৯ জন মানুষ নিহত ও সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়। অনেকের মতে মৃতের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ১০০০। ময়দানের ৫টি প্রবেশপথ থেকে মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের উপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলের সবচেয়ে ঘৃণ্য হত্যাকা-ের নির্দেশদাতা ছিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার। তার পুরো নাম ছিল রেজিনাল্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার। অমৃতসরের কসাই’ বলে খ্যাত ডায়ার ১৯২৭ সালে পক্ষাঘাতে মারা যায়।

ঘটনার আকস্মিকতা এবং ভয়াবহতায় গান্ধী ব্রিটিশ সরকারের প্রতি যে কোন প্রকার সহযোগিতাকেই মহাপাপ বলে অভিহিত করে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনের পেছনে মূলমন্ত্র ছিল সত্যাগ্রহ বা অহিংসা এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা। ব্রিটিশ পরিচালিত সকল সরকারী চাকরি এবং স্কুল-কলেজ ত্যাগ করার জন্য গান্ধী আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে সকল বিদেশী পণ্য বর্জনেরও ডাক দেন তিনি। এই আন্দোলন সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চৌরীচেরা নামক স্থানে পুলিশের সঙ্গে জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ করলে ২২ জন পুলিশ দগ্ধ হয়ে মারা যায়। অহিংস আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করার কারণে মহাত্মা গান্ধী অত্যন্ত বিচলিত হন এবং এক বিবৃতির মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। ব্যাপক জন সমর্থন সত্ত্বেও গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন সফল হয়েছিল এ কথা বলা যাবে না। নেতাজী সুভাষ বসু আগেই এই আন্দোলনে কোন আস্থা রাখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতকে ব্রিটিশদের অধীনতা থেকে মুক্ত করার একমাত্র পথ সশস্ত্র আন্দোলন। তিনি ভারতের বাইরে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তোলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মূলত গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন নয়, নেতাজী সুভাষ বসুর সশস্ত্র আন্দোলন ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং পরিণামে তারা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা মেনে নেয়।

আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে আওয়ামী লীগ সারা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু পাকিস্তানের মসনদ বাঙালীদের হাতে চলে যাবে এটা পাঞ্জাবী শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। শুরু হয় পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্র। আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। বাঙালী জাতির নেতা বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের কিছু গুণগত পার্থক্য ছিল। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপকতা ছিল অনেক বেশি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমাদের শাসন একেবারে অচল হয়ে পড়ে। চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর শাসন। কোর্ট-কাচারি থেকে শুরু করে সকল সরকারী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গান্ধীর ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারী কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়াতে পারেনি। পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা যেমন মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, নূরুল আমিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। শুধু তাই নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান, তেহরিক-ই-ইশতিকলাল পার্টির এয়ার মার্শাল আসগর খান, কাউন্সিল মুসলিম লীগের মিয়া মমতাজ দৌলতানা, সরদার শওকত হায়াত খান, মাওলানা শাহ আহমদ নূরানী, কনভেনশন মুসলিম লীগের জামাল মোহাম্মদ কোরেজা, জামায়াতে ইসালামের আবদুল গফুর, মওলা বক্স সরদার, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন জনপ্রিয় গবর্নর আযম খান প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন। পক্ষান্তরে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি কংগ্রেস এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলীর মত মুসলিম নেতারা সমর্থন জানালেও বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল, এনি বেসান্ত এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতায় অসহযোগ আন্দোলনের সশস্ত্র রূপ পরিগ্রহের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যা গান্ধীর বেলায় ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়া, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার আহ্বান জানানো- এ সবই সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানুষকে তৈরি থাকার নির্দেশনা। চৌরীচেরাতে হতাহতের ঘটনায় মহাত্মা গান্ধী আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। পক্ষান্তরে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থাৎ স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ৭ মার্চের জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এ কথার একমাত্র তুলনা চলে ১৯৪৪ সালের আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের উদ্দেশে নেতাজী সুভাষ বসুর ঐতিহাসিক ভাষণের সঙ্গে যেখানে নেতাজী বলেছিলেন- ‘Friends Comrade in the war of Liberation! Today I demand of you one thing, above all. I demand of you blood, It is blood alone that can avenge the blood that the enemy has spilt. It is blood alone that can pay the price of freedom. Give me blood and I promise you freedom.’

সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আমরা একই সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ দেখতে পাই।

লেখক : প্রকৌশলী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

syedziabd@gmail.com