২২ জুন ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গীবাদ মোকাবেলায় খেলাধুলা

প্রথমবারের মতো আয়োজিত বাংলাদেশ যুব গেমস-২০১৮ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করতে হবে খেলাধুলা চর্চা বৃদ্ধির মাধ্যমে। খেলাধুলা মাদকাসক্তি থেকেও রক্ষা করতে পারে দেশের যুব সমাজকে। এর পাশাপাশি সর্বস্তরে বাড়াতে হবে সুষ্ঠু সংস্কৃতি চর্চা ও নির্মল বিনোদন। এর সম্যক প্রমাণ মেলে নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০তে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় জয়ের মাধ্যমে। দেশটির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে যেভাবে এই টুর্নামেন্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেই নির্মল আনন্দের জোয়ারে ভেসে গেছে দেশের যুব সমাজ। এর পাশাপাশি দেশে ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী অর্থনীতির শক্তি নিষ্ক্রিয় করতেও প্রগতিশীল সব পক্ষ ও শক্তির ঐক্য ও সংহতি অত্যাবশ্যক। এর সঙ্গে সংযোগ করতে হবে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা।

যেমন নিষেধাজ্ঞাসহ নিরাপত্তার ঘেরাটোপে গত বছর বাংলা নববর্ষ উৎসব পালিত হলেও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি ছিল না। তদুপরি বাংলা নববর্ষ পালনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন ছিল দেশজুড়ে। আশার কথা এই যে, হেফাজতে ইসলাম, জমায়াতে ইসলামীসহ কতিপয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর বাংলা নববর্ষ পালন ও মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে নানা উস্কানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তাতে আদৌ কর্ণপাত করেনি। এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের বক্তব্যও ছিল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনÑ নববর্ষ পালন ও মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। ধর্ম যার যার উৎসব সবার। অতঃপর জাতিÑধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালী ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে শামিল হয়েছে। খেলাধুলাও তা-ই, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। অপশক্তি তথা মৌলবাদ জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে নয়, বরং খেলাধুলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে সবাইকে। শহরে-নগরে আবদ্ধ না থেকে সবাইকে যেতে হবে গ্রামগঞ্জে-লোকালয়ে। সবাইকে বোঝাতে হবে, জানাতে হবে বাঙালী ও বাঙালিত্ব কী। কোন্টি বাঙালীর সংস্কৃতি, আর কোন্টি অপসংস্কৃতি। ধর্ম ব্যবসায়ী ও মৌলবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিতে হবে। আর এর প্রধান অবলম্বন হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলা। এর জন্য প্রয়োজনে ফিরিয়ে আনতে হবে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সংগ্রামের চেতনা।

৩০ লাখ শহীদের দেশে, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর দেশে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের কোন স্থান নেই। এখন সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর, সময় এসেছে প্রতিবাদের, প্রতিরোধের। আমরা যদি দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কয়েক কোটি শিক্ষার্থীকে পর্যায়ক্রমে সাংস্কৃতিক সপ্তাহ আয়োজনের মাধ্যমে বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতি, সুমহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর চেতনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে, তাহলে জঙ্গীবাদ কিছুতেই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আর এখানেই নিহিত রয়েছে কবিতার জয়, নাটক ও গানের বিজয়বার্তা। দেশের সর্বত্র সংস্কৃতিকর্মীদের কাজ ও দায়িত্ব হলো, আমাদের সন্তানদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক চেতনার বার্তাটি পৌঁছে দেয়া।

সত্য বটে, বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব আজ বিপন্নপ্রায়। জঙ্গী ও সন্ত্রাসকবলিত হয়ে মানব সভ্যতা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইরাক-সিরিয়া-পাকিস্তান-আফগানিস্তান নয়; বরং জঙ্গী হামলা হচ্ছে ইউরোপ-ফ্রান্স-ইতালি-যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায়। সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সর্বোপরি অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র আপাতদৃষ্টিতে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা ও সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রায় ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে অনিবার্য প্রাণ যাচ্ছে অগণিত নিরীহ সাধারণ মানুষের, নারী ও শিশুর। ঘটছে সম্পদহানিও। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদকে সশস্ত্র উপায়ে দমন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে মানুষের মধ্যে সুপ্ত শুভবোধ ও চেতনাকে যদি জাগ্রত করা যায়, মানবিকতা যদি বিকশিত করে তোলা যায় মানুষের মনে, তাহলে জঙ্গীবাদ একেবারে নির্মূল না হোক, অন্তত কমে আসবে অনেকাংশে। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম হাতিয়ার ও মাধ্যম হতে পারে মানবধর্ম, শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। বিশ্বের সব ধর্মই মানুষ ও মানবতার কথা বলে। সংস্কৃতি বলে মানবতার বিকাশের কথা। এই কাজটি তৃণমূল থেকে শুরু করতে হবে শিক্ষক, ধার্মিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্মিলিতভাবে। আলো দিয়ে আলো জ্বালাতে হবে মানুষের হৃদয়ে ও মনে।

নির্বাচিত সংবাদ