২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রিপোর্টারের ডায়েরি

আমি গরু তুমি খাসি!

৩ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। দেশে পেশাদার সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) পিকনিক অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর মিরপুর পুলিশ কনভেনশন সেন্টারে। পিকনিকে অংশগ্রহণকারীরা বিশাল কনভেনশন সেন্টার চত্বরের এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে সময় পার করতে থাকে। কেউ কেউ মাঠে খেলা করতে নেমে পড়ে। আবার কেউবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে থাকে। ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক দুপুর দেড়টা তখন মাইকে মধ্যাহ্নভোজ শুরুর ঘোষণা আসতে থাকে। এ সময় এক দম্পতি খেলার মাঠ থেকে দ্রুত হেঁটে কনভেনশন সেন্টারের ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই ডিআরইউর এক স্বেচ্ছাসেবক বলতে থাকে ‘নিচে খাসি, উপরে গরু’।

একটু থেমে ওই দম্পতি কোথায় যাবেন ভাবছিলেন। এ সময় স্বামী বললেন, ‘আমি গরু’। তখন স্ত্রী ‘খ’ উচ্চারণ করতেই স্বামী বললেন, তাহলে তুমি খাসি! স্ত্রী জবাব দিলেন, হ্যাঁ আমি খাসি খাব। পাশ থেকে অন্য একজন হাসতে হাসতে বললেন ‘এক বেলা খাবারের জন্য আপনারা স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যাবেন! এ নিয়ে সেখানে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে স্বামী তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্ত্রীর সঙ্গে খাসি খেতে কনভেনশন সেন্টারের নিচতলায় গিয়ে টেবিলে বসেন।

উল্লেখ্য, এক সময় ডিআরইউর সকল অনুষ্ঠানেই খাবার মেন্যুতে গরুর মাংস প্রাধান্য পেত। কিন্তু ক’বছর আগে ডিআরইউর একজন সভাপতি বার্ষিক সাধারণ সভায় গরু খাওয়ানোর কারণে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এরপর থেকে বছর বছর কমিটি পরিবর্তন হলেও কোন কমিটিই আর অনুষ্ঠানে সদস্যদের গরু খাওয়ানোর ঝুঁকি নেননি। তবে সদস্যদের মধ্যে একটি অংশ খাবার মেন্যুতে গরু রাখার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

এবার ডিআরইউর নতুন কমিটি সদস্যদের জন্য রাজধানীর বাইরে পিকনিকের আয়োজন না করে ভেন্যু হিসেবে মিরপুরের পুলিশ কনভেনশন সেন্টারকে বেছে নেয়। আর পিকনিকের দিন কনভেনশন সেন্টারের নিচতলা ও উপরতলায় এক সঙ্গে দেড় হাজার লোকের বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করে। সদস্যদের মধ্যে একটি অংশের গরু খাওয়ার দাবিকে মাথায় রেখে দ্বিতীয় তলায় খাবার মেন্যুতে অন্যান্য আইটেমের সঙ্গে গরুর মাংস রাখা হয়। আর নিচতলায় অন্যান্য আইটেমের সঙ্গে রাখা রাখা হয় খাসির মাংস।

এবারের পিকনিকে চট্টগ্রাম থেকে মেজবানের রান্নায় পারদর্শী বাবুর্চি নিয়ে আসায় গরুর মাংস খাওয়ার জন্য সদস্যদের মধ্যে আগ্রহ বেশি থাকায় কনভেনশন সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় খাবার টেবিলে সদস্যদের ভিড় বেশি লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য দ্বিতীয় তলার আসন সংখ্যাও নিচ তলার চেয়ে বেশি রাখা হয়। গরু ও খাসি আলাদা স্থানে এবং পিকনিকে অংশগ্রহণকারী ৩ হাজার লোকের জন্য এক বৈঠকে দেড় হাজার জনের বসার ব্যবস্থা করায় এবার স্বস্তিতে খাবার গ্রহণ করে সবাই খুশি।

খাওয়া শেষে ডিআরইউ সদস্যরা যখন আবার সিঁড়ি বেয়ে কনভেনশন সেন্টার থেকে নিচে মাঠে নেমে আসতে থাকে, তখন কে কি খেয়েছে এ নিয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে। কেউ বলে, ‘আমি গরুর মাংস খেয়েছি, খুবই স্বাদ হয়েছে’। আবার কেউ বলে ‘খাসিও কম স্বাদ হয়নি’। এই পর্যায়ে কে গরু আর কে খাসি এ নিয়ে আবারও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।

শরীফুল ইসলাম

.ছুটির ঘণ্টার মতো স্টেডিয়ামবন্দী!

৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৭। প্রতিদিনের মতো আজও এসেছি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। উদ্দেশ্যÑ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ফুটবলের ম্যাচ কভার করা। প্রথম ম্যাচে দু’বারের লীগ চ্যাম্পিয়ন ‘অল রেড’ খ্যাত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র মুখোমুখি হলো ‘লালকুঠি’ খ্যাত পুরনো ঢাকার ক্লাব ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের। নিষ্প্রাণ এই ম্যাচে গোলও ছিল দুষ্প্রাপ্য! অর্থাৎ গোলশূন্য ড্র। পরের ম্যাচটি অবশ্য বেশ উত্তেজনাকর হলো। ‘সোনালী আঁশের দল’ খ্যাত এবং পাঁচবারের লীগ শিরোপাধারী টিম বিজেএমসি ২-১ গোলে হারিয়ে দিল একবারের লীগ রানার্সআপ এবং ‘আইলো’, ‘ডাইলপট্টি’ ও ‘জায়ান্ট কিলার’ খ্যাত রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটিকে। পেনাল্টি মিসে আক্ষেপের হার হারল রহমতগঞ্জ। ২০১০ ফিফা বিশ^কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে-ঘানা ম্যাচে যে ঘটনা ঘটেছিল, যেন ঠিক সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটল এই ম্যাচে। ম্যাচের তখন ৯০ মিনিট। উরুগুয়েন ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজের মতোই এদিন গোলপোস্টে ঢুকে পড়া নিশ্চিত গোল বাঁচাতে বিজেএমসির ক্যামেরুনের ডিফেন্ডার বাইবেক এসায়ে ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল করলে তাকে লালকার্ড দেখান রেফারি আজাদ রহমান। বাঁশি বাজান পেনাল্টির। তবে দলের জন্য বাইবেকের এই ‘আত্মত্যাগ’ বৃথা যায়নি। রহমতগঞ্জের গাম্বিয়ান মিডফিল্ডার জাত্তা মুস্তাফার পেনাল্টি শট ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন বিজেএমসির গোলরক্ষক-অধিনায়ক আরিফুজ্জামান হিমেল। সমতায় ফেরার সূবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে রহমতগঞ্জ। বাইবেক তখনও ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সময় পাননি। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়েই গোটা ব্যাপারটা দেখলেন আর ফেটে পড়লেন উল্লাসে। ঠিক যেন সাত বছর আগে সুয়ারেজের মতোই! তবে বিশ^কাপের ওই ম্যাচে দলের হয়ে গোল বাঁচালেও গোল করতে পারেননি সুয়ারেজ। কিন্তু বাইবেক পেরেছেন। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে দলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনিই।

ওই ‘লালকার্ড ও পেনাল্টি’ রোমাঞ্চের একটু পরেই খেলা শেষ হলে দারুণ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ‘সোনালী আঁশের দল’। আর আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়ে ‘ডাইলপট্টি’রা। ম্যাচ শেষে খেলার রিপোর্ট ই-মেইল করে পাঠিয়ে দিলাম অফিসে ক্রীড়া সম্পাদক মজিবর রহমান ভাইয়ের কাছে। কিন্তু কাজ তখনও শেষ হয়নি আমিসহ কয়েক ক্রীড়া সাংবাদিকের। প্রেস রিলিজভিত্তিক অন্যান্য খুচরা নিউজ করা শুরু করলাম। এই খুচরা নিউজকে আমরা মজা করে বলি ‘উঁকুন বাছার নিউজ!’ কারণ অসংখ্য খুচরা ও ছোট এসব নিউজ করতে জান ‘কাবাব’ হয়ে যায়। এর চেয়ে অল্প সময়ে বরং একটা বড়সড় নিউজ করে ফেলাটা অনেক সহজ!

যাহোক, দ্রুত উঁকুন বাছার কাজ করতে হবে। কারণ নিউজ পাঠানোর সময়সীমা পার হয়ে গেলে বসের কাছে রামধমক খেতে হবে। আর ধমক খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিধায় দ্রুত সারতে হবে কাজ। আসলে বছর চারেক ধরে এভাবেই চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কেননা, আমার এক সহকর্মী সরকারী চাকরি পেয়ে জনকণ্ঠ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তার জায়গায় আর কাউকে নেয়া হয়নি। ফলে আমাকে একাই দুজনের কাজ করতে হয় অবিশ^াস্য দ্রুতগতিতে। অবশ্য ইতোমধ্যে এভাবে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

যা হোক, নিবিষ্টমনে কাজ করছি। একসময় নিউজ লেখা শেষ হলো। বিলম্ব না করে বসকে ই-বার্তা পাঠিয়ে ফেললাম স্বস্তির নিঃশ^াস। এবার একটু ফেসবুক নিয়ে বসা যাক। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটা আমাকে প্রচুর সাহায্য করে নিউজ লেখা বা পাবার ক্ষেত্রে। অনেক খেলোয়াড়কে ফোনে পাওয়া যায় না। তাদের বিশাল সব ইন্টারভিউ নিয়েছি ফেসবুকে চ্যাট করে। এভাবে তাদের বিভিন্ন তথ্য, ছবি এবং বিভিন্ন খেলার খবর জেনেছি ফেসবুকে। কাজেই নতুন কিছু পাবার আশায় ফেসবুকে মগ্ন হয়ে পড়লাম।

ঘণ্টাখানেক পর শেষ হলো ফেসবুকিং। ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকালাম। জলবিয়োগ সেরে ভারমুক্ত হলাম। এবার বাসায় ফেরার পালা। ঘড়িতে দেখলাম কাঁটায় কাঁটায় রাত ১০টা বাজে। লক্ষ্য করলাম ইতোমধ্যেই অন্য সব সাংবাদিক কাজ শেষ করে চলে গেছেন। রয়ে গেছি শুধু আমরা চারজনÑআমি, প্রথম আলোর মাসুদ আলম ভাই, বদিউজ্জামান মিলন এবং রাশেদুল ইসলাম। আরও একজন আছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মিডিয়া বয় সাইফুল আহমেদ। সে আবার পাইওনিয়ার ফুটবল খেলে থাকে ফরোয়ার্ড হিসেবে, বয়স ১৭।

তিন সহকর্মী ও সাইফুলকে নিয়ে স্টেডিয়াম থেকে বের হতে গিয়ে বাধা পেলাম। গেটে মস্ত তালা ঝুলছে। মাঝে মাঝেই এমন হয়। কোন চিন্তা নেই। স্টেডিয়ামের অপর প্রান্তে আরেকটি গেট আছে। সেদিক দিয়ে বের হওয়া যাবে। আগেও অনেকবারই এভাবে বের হয়েছি। কিন্তু এবার আর পারলাম না। কেননা দারোয়ান এই গেটেও তালা মেরে পগারপার হয়েছে! হায় হায়! কি সর্বনাশ! এখন বের হবো কি করে? অনেক আগেই নিভিয়ে দেয়া হয়েছে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটগুলো। চারদিকে কেমন ভৌতিক পরিবেশ। সেই আঁধার রাতে আমরা পাঁচজন আশির দশকের সাড়া জাগানো সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’র মতোই হয়ে পড়লাম স্টেডিয়ামবন্দী! তারপরের ঘটনা বলব আরেকদিন।

-রুমেল খান