১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডটার অব বাংলাদেশ

 ডটার অব বাংলাদেশ
  • মৃত্যুর আগে কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদ বাঁচালেন ১০ যাত্রীকে

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ॥ বিমান দুর্ঘটনায় নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে ১০ জনের জীবন বাঁচিয়ে নিজেকে মৃত্যুপথে ঠেলে দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ বৈমানিক প্রিথুলা রশিদ। নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হয়েছেন। কিন্তু জীবনের বিনিময়ে বীর ওই নারী পাইলট বাঁচিয়ে গেছেন ১০ নেপালী যাত্রীর প্রাণ। নেপাল ভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে এই বীর নারীকে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রিথুলা ছিলেন সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের সহকারী পাইলট। শুধু তাই নয়, ইউএস বাংলার প্রথম নারী পাইলট ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ‘সিকিম মেসেঞ্জার’ নামে একটি পেজে প্রিথুলার মহানুভবতার কথা তুলে ধরে বলা হয়, ‘আজ নেপালী নাগরিকদের বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশী কন্যা তার নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে কাঠমান্ডুতে আজ এই বাংলাদেশী তরুণী পাইলট মারা গেছেন। তার নাম মিস প্রিথুলা রশিদ। তিনি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট বিএস২১১) কো-পাইলট ছিলেন। যেটি আজ নেপালের কাঠামান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়েছে। যাই হোক, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১০ নেপালী নাগরিককে রক্ষার চেষ্টা করে গেছেন। যাদের সবাই জীবিত আছেন।’

ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। উড়োজাহাজটিতে থাকা ৬৭ যাত্রীর মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশী, ৩৩ জন নেপালী, একজন মালদ্বীপের এবং একজন চীনের নাগরিক। উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর পাশাপাশি ৪ ক্রু ছিলেন বলে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেই হতভাগাদেরই একজন প্রিথুলা রশিদ।

কিন্তু মৃত্যুর আগেও বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন এই বাঙালী কন্যা। ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনা-প্রিথুলা দুর্ঘটনা কবলিত বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ ৪০০ উড়োজাহাজটিতে ৩৭ পুরুষ ও ২৭ জন নারী ছাড়াও উড়োজাহাজটিতে ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় নিজের কথা না ভেবে আগে সেই যাত্রীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন প্রিথুলা। দশজন নেপালী যাত্রীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে সরিয়ে দিতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় প্রিথুলার।

তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিথুলা রশিদের অন্যের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। ওই দশ নেপালী যাত্রীর সবাই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। তারা সবাই এখন বেঁচে আছে। সোমবার প্লেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে গিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময়েই দুর্ঘটনার শিকার হয়। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অবতরণের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আহতদের মধ্যে ১৯ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রিথুলা শেষ একটি পোস্টে লিখেছিলেন, ‘খোদা হাফেজ’। ইথিওপিয়া বিমানবন্দরে থেকে গত ১৮ জানুয়ারি দেয়া ওই স্ট্যাটাসের পর তিনি আর কোন স্ট্যাটাস দেননি ফেসবুকে। তবে তিনি গত ৩ ফেব্রুয়ারিতে তার প্রিয় বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে শুধুই ছবি পোস্ট করেছেন। এদিকে প্রিথুলার মৃত্যুতে ফেসবুকে তার বন্ধুরা গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রিথুলার ফেসবুক আইডি থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ফার্স অফিসার পাইলট হিসেবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে যোগ দেন তিনি। এর আগে এরির‌্যাং ফ্লাইং স্কুল থেকে বৈমানিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন প্রিথুলা।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিমানটির বাংলাদেশী কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদ। নিজের জীবনের বিনিময়ে বিমানটির ১০ নেপালী যাত্রীকে বাঁচিয়েছেন তিনি। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি সবাইকে কাঁদাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই তার বীরত্বের প্রশংসা করছেন। প্রিথুলা রশিদের মৃত্যুর শোক প্রকাশ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম।

তিনি তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে গিয়ে নিজের ফেসবুক পেইজে লিখেছেন, ‘লাভ ইউ প্রিথুলা রশিদ, বোনটি আমার। তোমাদের মতো কিছু কিছু মানুষের জন্যই বাংলাদেশের নামটা আরেকটু উঁচুতে ওঠে। ভাল থেকো পরপারে। তোমার পরিবার তোমার জন্য নিশ্চয় কষ্ট পাচ্ছে অনেক, তারা তোমাকে নিয়ে গর্বও করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে নসিব করুন।’

জানা গেছে, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার বিএস২১১ ফ্লাইটের ৩৬ বাংলাদেশী আরোহীর মধ্যে ১০ জন জীবিত আছেন। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। জীবিতদের মধ্যে ইয়াকুব আলীর চিকিৎসা চলছে নরভিক হাসপাতালে। ওহম হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে রেজওয়ানুল হকের। বাকিদের মধ্যে ইমরানা কবীর হাসি, শাহরিন আহমেদ, শেখ রাশেদ রোবায়েত, আলমুন্নাহার এ্যানী, মেহেদী হাসান, সায়্যেদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, কবীর হোসেন ও শাহীন বেপারী চিকিৎসাধীন রয়েছেন কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

সোমবার ঢাকা থেকে যাওয়া ৭৮ আসনের উড়োজাহাজটিতে চার ক্রুসহ মোট ৭১ আরোহী ছিলেন। এতে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় নেপাল পুলিশ। এদের মধ্যে পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রুসহ মোট ২৬ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।