২২ জুন ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস গড়ে আক্ষেপ ঘোচালেন মুশফিক

ইতিহাস গড়ে আক্ষেপ ঘোচালেন মুশফিক

তখন ইতিহাস থেকে মাত্র ১ রান দূরে বাংলাদেশ দল, ৩ বল থেকে জিততে প্রয়োজন ১ রানের। দুর্দান্ত সব স্ট্রোক খেলে দুশোর ওপর স্ট্রাইকরেটে ক্রিজে তখনও মুশফিকুর রহীম। হাতে আছে ৬ উইকেট! এরপরও মুশফিকের মধ্যে কোন আনন্দের রেশ চোখে পড়েনি। এর কারণ, অভিজ্ঞতা! ২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপে ব্যাঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে আগেভাগেই বিজয় উদযাপন করেছিলেন, কারণ ৩ বলে প্রয়োজন ছিল ২ রানের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর এক রানও করতে পারেনি বাংলাদেশ। তিনিসহ আউট হয়েছিলেন তিন ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশ হেরেছিল ১ রানে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্যই এমন নীরব থাকলেন মুশফিক। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে তার এই মানসিক স্থিতিই বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে দিল। নিজের ব্যাটেই সেই ইতিহাস রচনা করলেন মুশফিক। পরের বলেই রান নিয়ে টি২০ ক্রিকেট ইতিহাসে চতুর্থ সর্বাধিক রান তাড়া করে জয় এনে দেন বাংলাদেশকে। ক্যারিয়ারসেরা ৭২ রান করে অপরাজেয় থাকেন মুশফিক মাত্র ৩৫ বলে ৫ চার, ৪ ছক্কায়। ৬৫ আন্তর্জাতিক টি২০ ক্যারিয়ারে সবেমাত্র তৃতীয় অর্ধশতক, কিন্তু তা পাল্টে দিল দলের চেহারা- পরাজয়ের বলয়ে ঘূর্ণিপাক খেতে খেতে খেতে অমানিশায় নিমজ্জিত অবস্থা থেকে টেনে তুলল দলকে। নিজের আক্ষেপটাও ভুললেন মুশফিক। সেদিন ছিল তার প্রথম সন্তানের বয়স ৩৫ দিন। ৩৫ বলেই ঐতিহাসিক বিজয়ের ইনিংস খেলে তাই তা উৎসর্গ করলেন নিজ সন্তানকে। নিজেকেও প্রমাণ করলেন তিনি সত্যিকার অর্থেই টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান।

অনেক আগেই তামিম ইকবাল ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দাবি করেছিলেন বাংলাদেশের সেরা টি২০ ব্যাটসম্যান এবং অন্যতম মারকুটে মুশফিক। কিন্তু সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়নি গত দুই বছরে। ওই সময়ে তামিম ও মাহমুদুল্লাহর ব্যাটে নিয়মিতই ঝড় দেখা যাচ্ছিল। সে সময়ই তারা দাবি করেন, ‘মুশফিক হয়তো এই মুহূর্তে রান পাচ্ছেন না, কিন্তু তিনিই আমাদের সেরা টি২০ ব্যাটসম্যান। তিনিই সবচেয়ে বেশি মারতে পারেন!’ টানা ব্যর্থতার মধ্যেই পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাটসম্যান মুশফিকের বিধ্বংসী রূপে ফেরাটা খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ দলের। কারণ, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান নেই এবং অবসরে গেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। টানা পরাজয়ে একেবারে বিপর্যস্ত চেহারা বাংলাদেশ দলের। সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসা খুব জরুরী হয়ে পড়েছিল, নিজেদের মর্যাদা রক্ষার জন্য। বিশেষ করে ঘরের মাটিতে সর্বশেষ সিরিজে শ্রীলঙ্কার কাছে বাজেভাবে একের পর এক পরাজয় যেন সিনিয়র ক্রিকেটারদের আরও চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছিল। দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, অনুপ্রাণিত করার জন্য কোন এক নির্ভরযোগ্য কাউকে এগিয়ে আসতে হতো। কলম্বোর প্রেমাদাসায় ১০ মার্চ ছিল যেন বাংলাদেশ দলেরই দিন। শুরুটাই হয়েছিল দারুণ। তামিম ও লিটন দাস দিয়েছিলেন স্বপ্নের মতো উড়ন্ত সূচনা যা বাংলাদেশ দলের ক্ষেত্রে একেবারেই বিরল দৃশ্য। ভিতটা শক্ত হলে যেমন হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই হলো। শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে মুশফিক হয়ে উঠলেন দুরন্ত। তখনও বোঝা যায়নি সবচেয়ে সেরা ইনিংস খেলতে যাচ্ছেন ক্যারিয়ারের।

২১৫ রানের জয়ের লক্ষ্যটা অসম্ভবই টি২০ ক্রিকেটে যেকোন দলের জন্য। কারণ, এর আগে ৩টি ঘটনা আছে এরচেয়ে বেশি রান তাড়া করার রেকর্ড। সেখানে বাংলাদেশের সেরা রান তাড়া করার রেকর্ড মাত্র ১৬৪ রানের। কখনও টি২০ ক্রিকেটে ২০০ রানও করতে পারেনি টাইগাররা। এবার সেই রেকর্ডটাও দলকে গড়তে অন্যতম ভূমিকা রাখলেন মুশফিক। শুরু থেকেই তিনি ঝলসে উঠলেন ব্যাট হাতে, কারণ পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হবে। শেষ পর্যন্ত দলকে ২ বল আগেই জিতিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। ক্যারিয়ারের তৃতীয় টি২০ ফিফটি হাঁকিয়ে ৩৫ বলে ৭২ রানে অপরাজিত থাকেন। সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি এক ম্যাচে নিজেদের সর্বাধিক ১২ ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ডও গড়ে বাংলাদেশ। এর আগে এক ম্যাচে সর্বাধিক ৮ ছক্কা হাঁকিয়েছিল বাংলাদেশ দল ২০১৩ সালে ৬ নবেম্বর ঢাকায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এবং ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি খুলনায় জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে। এমন অবিস্মরণীয় জয় এনে দেয়ার পর মুশফিক বলেন, ‘১৯০ থেকে ১৯৫ রানটা এই উইকেটের জন্য স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তামিম আর লিটন যেভাবে শুরু করে দিয়েছে, প্রথম ছয় ওভারে...সত্যি অসাধারণ। আপনি ক্রিকেটীয় শট খেললে যে কোন রানই তাড়া করতে পারবেন। আর এই উইকেট ব্যাটিং করার জন্য খুব ভাল উইকেট। আজকের ম্যাচটা আমার ছেলেকে উৎসর্গ করলাম। ওর বয়স মাত্র ৩৫ দিন।’ মুশফিক অনেক পরিণত হয়েছেন ব্যাঙ্গালুরুতে শেষ মুহূর্তে গিয়েও দলকে নিশ্চিত জয় এনে দিতে না পারার পর। এদিন জয় নিশ্চিত হওয়ার পরই উল্লাসে ফেটে পড়েন। অথচ সেদিন ২ রান বাকি থাকতে আগেভাগেই উদযাপন শুরু করে দিয়েছিলেন। এবার তিনি জয় নিশ্চিত করা রান নিয়েই বোলার থিসারা পেরেরার মুখের ওপর চিৎকার করেন, এরপর লাফিয়ে ব্যাট চার পাশে ঘুরিয়ে উল্লাস করতে শুরু করেন। উদযাপনটা বাড়তি মাত্রা পায় বিরল ‘নাগিন’ ডান্স করে। এ বিষয়ে ওপেনার তামিম বলেন, ‘ব্যাঙ্গালুরুতে যে ভুলটা করেছিল, সেটা প্রেমাদাসায় এই ম্যাচে করেনি। ভাল ম্যাচ কিংবা খারাপ ম্যাচ; সব ম্যাচ থেকেই কিছু শেখার থাকে। সেই ম্যাচে মুশফিকের যত সমালোচনা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি প্রশংসা সে এখন পাচ্ছে। দায়িত্ব নিয়ে দারুণ খেলেছে।’ অথচ শুরুতেই পায়ে টান লাগায় পুরোপুরি খোঁড়া হয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই এমন ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন। যদিও তিনি ব্যাটিং চালিয়ে যাবেন কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এদিন।

নিজেকে ভালভাবে ফিরে পেয়েছিলেন গত মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই। সিরিজের প্রথম টি২০ ম্যাচে ৪৪ বলে ৬৬ রানের ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলেন সেদিন। সেই ম্যাচের আগে তার খেলা নিয়েই ছিল শঙ্কা। এর আগের ৩১ ম্যাচ এবং ২৬ ইনিংসে তার ব্যাট থেকে ৩০ এর উর্ধ ইনিংস ছিল মাত্র একটিই। বাজে সেই সময়টা কাটিয়ে নিজেকে ফিরে পেলেন তিনি। ২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র টি২০ শতক হাঁকিয়েছিলেন ওপেনার তামিম ইকবাল। ওই সময়টাতে নিজেকে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। কিন্তু এ দু’জনই সে সময় বেশ কয়েকবার দাবি করেছিলেন টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিক। কিন্তু সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়নি গত ৪ বছর ৪ মাসে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৩ সালের ৬ নবেম্বর মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ক্যারিয়ারের প্রথম ও একমাত্র ফিফটি হাঁকিয়েছিলেন মুশফিক। ২৯ বলে করেছিলেন কাঁটায় কাঁটায় ৫০ রান। এরপর গত ৩১ ম্যাচের ২৬ ইনিংস ব্যাট করে সর্বোচ্চ ৪৭ রানের একটি ইনিংস উপহার দিতে পেরেছিলেন। সেটিও ছিল মিরপুরে ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এরপর আর কোন ম্যাচেই ৩০ এর বেশি রান আসেনি মুশফিকের ব্যাট থেকে। ক্রমেই যেন এক অন্ধকার গহ্বরে ডুবে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের এ ব্যাটিং স্তম্ভ। সাধারণত ৪ নম্বরেই ব্যাটিং করেন তিনি টি২০ ম্যাচে। ব্যাটিং করেছেন ৫, ৬ এমনকি ৭, ৮ এমনকি ৯ নম্বরেও ৫ ইনিংসে। তবে বৃহস্পতিবার মুশফিক প্রথমবারের মতো ব্যাট হাতে নামেন ৩ নম্বরে। শুরু থেকেই বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে খেলতে থাকেন তিনি। অথচ সর্বশেষ ১৫ ইনিংসে তিনি যে ব্যাটিং নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তাতে করে ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচয়টাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছিল। সর্বশেষ ১৫ ইনিংসে তার ব্যাট থেকে এসেছে- ২৪*, ১৬*, ৪, ৪, ১২, ৪, ০, ১৮, ১৫*, ১১, ০, ৮, ১৫, ১৩ ও ২ রান। অর্থাৎ ১২.১৭ গড়ে মাত্র ১৪৬ রান করতে পেরেছিলেন মুশফিক। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ম্যাচ ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটি। এর পরের ম্যাচে ৬ রান এবং এবার নিদাহাস ট্রফির প্রথম ম্যাচে ১৮ রান করেছিলেন। এবার সবকিছু ছাড়িয়ে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস উপহার দিলেন এবং রচনা করলেন ইতিহাস। নিজেকে দেশের অন্যতম আক্রমণাত্মক ও নির্ভরযোগ্য টি২০ ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রমাণ করে দলকে ফেরালেন জয়ের ধারায়। পুরনো সব আক্ষেপ, সমালোচনাকেও কবর দিয়ে দিলেন দানবীয় ব্যাটিং ঝড়ে উড়িয়ে দিয়ে।

নির্বাচিত সংবাদ