১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মেধাবী টেনিসকন্যা মেধার জীবন-কাহিনী

মেধাবী টেনিসকন্যা মেধার জীবন-কাহিনী
  • রুমেল খান

মাত্র মাস দুয়েক আগের ঘটনা। শীতকাল। সন্ধ্যার পরে বাসা থেকে বেরিয়ে হাতিরঝিলে হাঁটাহাঁটি করা রোজকার অভ্যাস ২১ বছর বয়সী কৃষ্ণকন্যাটির। সেদিনও বের হওয়া। রাস্তাটা বেশ নির্জন। আশপাশে লোকজন নেই বললেই চলে। হঠাৎই এক তরুণ দ্রুতগতিতে চলে এল কাছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছুরি বের করে ঠেসে ধরল পেটে। হুমকি দিল, ‘সঙ্গে যা আছে দিয়ে দেন। চেঁচামেচি করলে কিন্তু এক্কেবারে পেটে ঢুকাইয়া দিমু।’ ছিনতাইকালে এমন পরিস্থিতিতে কি হয়? ছিনতাইকারীকে নিশ্চয়ই সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা বা অলংকার দিয়ে রক্ষা পেতে হয়। কিন্তু মেয়েটার বেলায় ঘটলো ভিন্ন ঘটনা। সে টের পেল, তরুণটির ছুরিটির ধারালো ডগা তার পেটে ক্রমেই চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু মোটেও ঘাবড়ে না গিয়ে শীতল-স্বাভাবিক গলায় সে বলল, ‘ভাই, আপনাকে দেয়ার মতো আমার কিছুই নেই। বিশ^াস করেন!’ ছিনতাইকারী ভ্যাবাচেকা খায়। বুঝে ফেলে অপারেশন ফেল! হতাশ হয়ে সে ছুরি সরিয়ে দ্রুত অন্যদিকে হাঁটতে থাকে। কিন্তু ঘটনার শেষ এখানেই শেষ নয়। আসল মজা শুরু হয় এরপর। মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে ছিনতাইকারীর পাশাপাশি চলতে শুরু করে। কণ্ঠে অনুনয়, ‘ভাই, কই যান? আমারেও সঙ্গে নিয়ে চলেন।’ এবার সত্যিই ভয় পেয়ে যায় ছিনতাইকারী। ভাবে, ‘কি মুশকিল, এ আবার কোন্ আপদের পাল্লায় পড়লাম!’ কষে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচে সে।

ছিনতাইকারীকে ভয় পাইয়ে দেয়া মেয়েটার নাম মেধা। তার এই নামটি রেখেছেন ২০০৬ সালে মারা যাওয়া তার বড় আপু। ভাল নাম কাজী শারমিন ইসলাম। মেধারা ৫ বোন, এক ভাই। তার নাম রাখা প্রয়াত বোন ছিলেন চতুর্থ। তার নাম কাজী ইশরাত জাহান গোল্ডি (স্বামী তাকে মেরে ফেলে, এখনও মামলা চলছে)। ভাইবোনদের মধ্যে মেধাই সবার ছোট।

১৯৯৭ সালের ২৮ জানুয়ারি তার জন্ম ঢাকার একটি হাসপাতালে। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের কাঁচপুরের কাজীবাড়িতে। বাবা কাজী শহীদুল ইসলাম (সাংবাদিক, দৈনিক বর্তমান বাংলার সহ-সম্পাদক)। তিনিই মেধার ‘শারমিন’ অংশটি রাখেন। মা কাজী আমেনা ইসলাম (গৃহিণী)।

মেধা পড়াশোনা করেছেন ঢাকার আজিমপুরের লিটল এ্যাঞ্জেলস, অগ্রণী স্কুল এবং সাভারের জিরানির বিকেএসপিতে। কলেজে পড়েছেন সিদ্ধেশ্বরী গার্লসে। এখন পড়াশোনা করছেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে, সাংবাদিকতা বিষয় নিয়ে।

স্কুলে পড়ার সময় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড়, বিস্কুট দৌড়সহ নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা...সবকিছুতেই অংশ নিয়ে প্রথম হতেন মেধা। ২০০৫ সালে বিকেএসপিতে শূটিংয়ে ভর্তি হতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনও ওই ইভেন্টে মেয়ে শিক্ষার্থী নেয়া শুরু হয়নি। শেষমেষ বিকেএসপির টেনিস কোচ রোকন উদ্দিন আহমেদের পরামর্শে-অনুপ্রেরণায় বেছে নেন লন-টেনিস। যদিও তার বাবার ইচ্ছে ছিল ফুটবলে ভর্তি হোক তার মেয়ে। কিন্তু বিকেএসপিতে তখন ফুটবলেও মেয়ে ভর্তি করা হতো না, এমনকি ক্রিকেটও। মেধার অবশ্য শূটিংও পছন্দ ছিল না। কিন্তু মায়ের ইচ্ছেতেই শূটিংয়ে চেষ্টা (মায়ের কাছে শূটারদের পোশাকটা ভাল লেগেছিল) এবং ফুটবলের মতোই এই ইচ্ছেরও ঘটে যবনিকাপাত!

ইচ্ছের বিরুদ্ধে টেনিস বেছে নিলেও পরে খেলাটির প্রতি অনুরাগ জন্মে যায় মেধার। ফলে এটাকেই বেছে নেন পাকাপোক্তভাবে। তার প্রিয় শট ছিল ‘এইস সার্ভিস’। ফোরহ্যান্ডে ছিলেন পারদর্শী। তবে ২০০৫ সালে টেনিস ক্যারিয়ার শুরু করার পর ২০১০ সালেই সেটার ইতি ঘটে! মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত টেনিস ক্যারিয়ার মেধার। তবে এই সময়ের মধ্যেই জেতেন এককে জাতীয় অনুর্ধ-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপের (২০০৭, ফাইনালে হারান বিকেএসপির শর্মী সুলতানাকে) শিরোপা। এছাড়া দ্বৈতে হন দুবার রানার্সআপ। দ্বৈতে শারমিন আলম সারদাকে সঙ্গী করে রানার্সআপ হন (২০০৯)। ২০০৯ সালে আইটিএফ টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে আসেন। এছাড়া টেনিস ছাড়ার বছরেও দ্বৈতে একবার চ্যাম্পিয়ন হন সারদাকে সঙ্গী করে (স্বাধীনতা দিবস টেনিস)। আন্তর্জাতিক টেনিসে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপিন্সের খেলোয়াড়কে হারানোর অভিজ্ঞতা আছে মেধার।

টেনিস ছাড়ার আগেই অবশ্য ২০০৮ সালেই বিকেএসপি ছাড়েন মেধা। বিকেএসপি তার জীবনের এক অসমাপ্ত অধ্যায়। কারণটা মেধা ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘সেবার বিকেএসপিতে আমাদের জন্য দুটি স্পন্সর আসে। একটা ভারত, অন্যটা মালয়েশিয়া থেকে। তখন ওই মুহূর্তে আমিই ছিলাম বিকেএসপির মহিলা চ্যাম্পিয়ন এবং সবার সিনিয়র। ফলে বিকেএসপির হয়ে একমাত্র আমিই তখন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে অংশ নিতাম। এদিকে স্পন্সর আসার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় খেলোয়াড় বাছাই হবে। অথচ দুঃখজনক ব্যাপার- আমার নামটি বাছাইকৃতদের মধ্যে দেয়া হয়নি! অথচ আমার জুনিয়র খেলোয়াড়দের (ঝিলিক চাকমা এবং শর্মী সুলতানা, ওরা কখনই আমাকে হারাতে পারেনি) নাম দেয়া হয়। এই চরম অনিয়ম দেখে আমার বাবা তখন বিকেএসপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেন। কিন্তু কোন ফল না হওয়াতে বাবা এবার অভিযোগ করেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) কাছে, রোকন স্যারের বিরুদ্ধে। কেননা তিনিই খেলোয়াড় বাছাই করেছিলেন। এমনকি বাবা তার নিজের পত্রিকাতেও এ নিয়ে নিউজ করে দেন। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে এনএসসিতেও কোন সুবিচার পাইনি। ফলে মনে হচ্ছিল বিকেএসপিতে থেকে আমার আর কিছু হবে না। তাই প্রতিকূল পরিস্থিতি-পরিবেশের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হই। এরপর দু’বছর আমি খেলি বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের (বিটিএফ) হয়ে।’

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- দুদক এবং এনএসসিতে অভিযোগ জানিয়ে কোন সুবিচার না পাওয়া গেলেও একটা ব্যাপার কিন্তু ঠিকই ঘটেছিল। সেটা হলো স্পন্সর পেয়েও ভারত-মালয়েশিয়ায় শেষ পর্যন্ত খেলতে যেতে পারেননি ঝিলিক-শর্মী কেউই! তবে তাদের জন্য সহানুভূতিই ঝরেছে মেধার কণ্ঠে, ‘আমি যেতে পারিনি ঠিক আছে, কিন্তু ওরাও যে যেতে পারল না, সেজন্য ওদের জন্য দুঃখও হয়েছিল!’

বিটিএফ-এ যে সময়টা খেলেছেন, সেখানেও বিস্তর অসঙ্গতি-অনিয়ম চোখে পড়েছে মেধার, ‘ফেডারেশনে খেলোয়াড়দের পৃষ্ঠপোষকতা খুবই নগণ্য। তারা প্রায়ই বলতো তাদের ফান্ডে টাকা নেই। তখন নিয়ম ছিল ফেডারেশনের বাইরে থেকে কোন খেলোয়াড় এলে তাদের টেনিস শেখার জন্য ফেডারেশনকে কিছু টাকা খরচ দিতে হবে প্রতি মাসে (জনপ্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা)। যেহেতু আমি আগেই থেকে জাতীয় খেলোয়াড় ছিলাম, তাই আমি এই খরচটা মওকুফ করার জন্য ফেডারেশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ কারেন আংকেলের শরণাপন্ন হই এবং সফলও হই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তারপরও আমার অন্যান্য খাতে প্রচুর খরচ হচ্ছিল। জুতো, মোজা, যাতায়াত ভাড়া, খাওয়া, পোশাক, র‌্যাকেট, বল, কোচ ... এসব মেইনটেইন করতে টাকা খরচ করতে হচ্ছিল জলের মতো। যদিও এই খরচগুলো বহন করার কথা ছিল ফেডারেশনের। কিন্তু তারা এই খরচের যৎসামান্যই বহন করতো। বাকিটা আমাকেই দিতে হতো। আমি তখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলাম তাজমুল ইসলাম রবিন ভাইয়ের কাছে (উনিও বিকেএসপি থেকে বিটিএফে আসেন)। তাছাড়া ফেডারেশনের অধীনে কোন টুর্নামেন্ট খেললে আমাদের প্রাইজমানিও দেয়া হতো খুবই কম, তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ একটা র‌্যাকেটের সর্বনিন্ম মূলই কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা! জানি না এখন প্রাইজমানি বেড়েছে কি না।’

মেধার মূল্যায়ন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আসলে মেয়েদের টেনিসটা আসলে উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য নয়। এই পরিবারের মেয়েরা যদি টেনিসে আসেও, তাহলেও বেশিদূর তারা এগুতে পারবে না, আমার মতো। শুধু আমি নই, আমি দেখেছি আমার অনেক সিনিয়র আপু- যেমন রুমা, বুশরা আপুরা টেনিস ছেড়ে দিয়েছেন। বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেছেন বা চাকরি করছেন। কেন তারা ছাড়লেন খেলাটা? কারণ তারা উপলব্ধি করেছেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা- এই টেনিসে কোন ভবিষ্যত নেই! এই খেলাতে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি! এখন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে আফরানা ইসলাম প্রীতি। সে-ও আমাকে বলেছে, আপু, খেলি আসলে মনের তাগিদেই। কিন্তু এভাবে বেশিদিন চালাতে পারবো না। কারণ স্পন্সর নেই। এক্ষেত্রে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাই পারে প্রীতির মতো খেলোয়াড়দের ধরে রেখে এই সমস্যার সমাধান দিতে।’

মেধার মতে, বাংলাদেশের বড় ফেডারেশনগুলোতে (ফুটবল, হকি, ক্রিকেট) কোন অনিয়ম-দুর্নীতি হলেই সেটা গণমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু কম আলোচিত বা ছোট ফেডারেশনগুলোতে কোন অনিয়ম-দুর্নীতি হলেও সেটা সেভাবে গণমাধ্যমে আসে না। যেমনটা টেনিস ফেডারেশনে আগে হয়েছে এবং হয়তো এখনও হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেনিসকে পেশা হিসেবে নেয়ার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি আগেও ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও হবে কি না সন্দেহ। ‘সবমিলিয়ে আমি হতাশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক টেনিস আমাদের রেজাল্ট খুবই খারাপ। বিশেষ করে ডেভিস কাপে।’

টেনিসটা যদি এখনও খেলতেন, তাহলে প্রচুর সাফল্য পেতেন বলে মনে করেন মেধা। টেনিস খেলার প্রচার-প্রসার, তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় সংগ্রহ, তাদের খরচ দিয়ে পরিচর্যা করা, স্পন্সর জুগিয়ে দেয়া, প্রাইজমানি বৃদ্ধি করা, বেশি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা... এই কাজগুলো টেনিস ফেডারেশন ঠিকভাবে করলে টেনিসে বাংলাদেশের উন্নতি ঘটবে বলে মনে করেন মেধা, ‘ভারতে যদি একজন সানিয়া মির্জার জন্ম হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে কেন এরকম একজন খেলোয়াড় আসবে না?’ ক্যারিয়ারের স্মরণীয় ম্যাচ? ‘২০০৯ সাল। ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের এককের ফাইনাল। বিটিএফের তিন নম্বর কোর্টে মুখোমুখি আমি বনাম ইশিতা আফরোজ রিতু। ধরেই নিয়েছিলাম হেরে যাব। কারণ আমার প্রস্তুতি ভাল হয়নি। তার ওপর চ্যানেলে আইয়ের সেরা কণ্ঠের অডিশনে অংশ নিয়ে ফিরেছি। ম্যাচটা তৃতীয় সেটে গড়ায়। শেষে আমিই জিতি এবং চ্যাম্পিয়ন হই (৬-২, ৩-৬, ৭-৫ গেমে)। অথচ তখন রিতু আমার জুনিয়র। খেলার সময় বারবার মনে হয়েছে কিছুতেই জুনিয়র রিতুর কাছে হারা চলবে না। যখনই ওর বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছিলাম, তখনই প্রচন্ডভাবে কাঁদছিলাম। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে জেদ নিয়ে খেলি। ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত হলেও আমার তৃপ্তি একটাই- কখনও জুনিয়রদের কাছে হারিনি!’

এবার আসা যাক মেধার জীবনের আরেক পর্বে। সাংবাদিকতার জীবন। কিভাবে এলেন এই পথে? ‘সত্যি বলতে কি, ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল সংবাদ পাঠিকা হওয়ার। যখন টেনিস ছেড়ে দিলাম, তখন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে মরিয়া হয়ে উঠলাম। দু-তিনটি চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে গেলাম এশিয়ান টিভিতে, ২০১৫ সালে। যদিও তার আগেই বাবার পত্রিকায় টুকটাক রিপোর্টিং করতাম (বাবার পত্রিকা বলেই আলসেমি করতাম, প্রায়ই অফিসে যেতাম না এবং বেতনও পেতাম না, হি-হি-হি!)। যাহোক, এরপর যোগ দিই মাই টিভিতে, স্পেশাল রিপোর্টার হিসেবে। তবে এখানে বেশিদিন কাজ করিনি, নয় মাস পরেই ছেড়ে দিই।’ কেন? ‘বাবার অসুস্থতার কারণে। ঘরে-বাইরে তাকে দেখভাল করার মতো সর্বক্ষণ একজন লোক দরকার। বাবার সমস্যা কিডনিতে, হার্টে। দু’বার অপারেশন হয়। দু’মাস ছিলেন হাসপাতালে। আমি লম্বা ছুটি চাওয়ায় অফিস দিতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়ে চাকরিটা ছাড়তে হয়। যদিও আমার বড় ভাইও টিভি সাংবাদিক। কিন্তু ওর স্ত্রী-সন্তান-সংসার আছে। তার পক্ষেও বাবাকে সময় দেয়া সম্ভব ছিল না। কাজেই স্যাক্রিফাইসটা আমিই করি। বাবার ইদানীং আরেকটা অপারেশন করাতে হবে। চোখে ছানি পড়েছে। বড় বোনেরও ব্রেন টিউমারের অপারেশন করাতে হবে। সবমিলিয়ে তাই আমি এখনও মিডিয়াতে ফিরতে পারিনি। তবে শীঘ্ররই ফিরব। ইতোমধ্যেই ইন্টারভিউ দিয়েছি। আগামী এপ্রিলেই ডিবিসি চ্যানেলে জয়েন করছি।’

ছিলেন খেলোয়াড়। টিভি চ্যানেলে কাজ করার সময় স্বভাবতই হতে পারতেন স্পোর্টস রিপোর্টার। কিন্তু মেধা সে পথে হাঁটেননি। তিনি বেছে নেন নিউজ প্রেজেন্টার এবং পরে জেনারেল বিট। কেন? ‘যে জিনিস সম্পর্কে জানি, সেটা নিয়ে আগ্রহ কম। যেটা জানি না, সেটার প্রতিই আগ্রহ বেশি। তাই ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে স্পোর্টস বিট নিইনি। আমার মূলত ঝোঁক ক্রাইম ও নারীবিষয়ক রিপোর্টিংয়ে। এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আর চ্যালেঞ্জ নিতে বরাবরই ভাল লাগে আমার।’

অবসরে বাসায় (রামপুরার উলনে) কবুতর পালতে পছন্দ করেন মেধা। মজার ব্যাপার- কবুতরগুলোর একটাও তার নয়! ‘আমার বারান্দায় কবুতর এলেই তাদের নিয়মিত খাবার দেই। এভাবে তারা আমার পোষ মেনে যায়। পরে ওদের থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দেই, ওরা ওখানেই থাকে।’ এছাড়া বাগানে ফুল, ঔষধি পাতা ও বিভিন্ন ধরনের প্রচুর শাক-সব্জিও চাষ করেন। ফলে বাজার থেকে তেমন কোন শাক-সব্জি কিনতে হয় না!

পাঁচ ফুট উচ্চতার অধিকারী মেধার আরও কিছু গুণ আছে। তিনি ক্ল্যাসিকাল ড্যান্সার। ২০০৪-০৫ সালে রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের নৃত্য প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। তিনি একজন গায়িকাও বটে। ২০০৯-১০ সালে চ্যানেল আই ‘সেরা কণ্ঠ’ প্রতিযোগিতায় ঢাকার মেট্রোর সেরা দশে ছিলেন। অভিনয়ও জানেন। পদাতিক গ্রুপের হয়ে করেছেন মঞ্চনাটক। আরটিভিতে প্রচারিত একটি নাটকেও অভিনয় করেছেন। করেছেন উপস্থাপনা। রাঁধতে পারেন সব ধরনের খাবারও। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে নিজেকে খেলোয়াড় হিসেবে ভাবতে বেশি পছন্দ করেন মেধা, ‘আমার খেলোয়াড়ী সত্তাটাই সবচেয়ে বড়। তারপরেই আসবে সাংবাদিক পরিচয়টা।’ খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে হয়তো তেমন কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে অনেকেই চেনে স্পেশাল কিছু রিপোর্টের সুবাদে।’

আট বছর আগে খেলাধুলা ছাড়লেও শরীর ফিট রাখতে এখনও প্রচুর হাঁটেন মেধা, ‘আমি রোজ হাতিরঝিলে হাঁটি। মা আমাকে যাতায়াত ভাড়া দিলেও আমি সে টাকা বাঁচিয়ে বহুদূর পথ হেঁটে যাই।’

বিয়ে করার জন্য ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরী বলে মনে করেন মেধা, ‘সংসারটা শুধু স্বামীর নয়, স্ত্রীরও। স্বামীর আয়ের মতো স্ত্রীর আয়ও করা উচিত। তাহলেই সংসার ভালমতো চলবে। এজন্যই এখনও বিয়ে করিনি। প্রতিষ্ঠিত হতে পারলেই বিয়ে করব। তার আগে নয়। তবে বিয়ে করলে অবশ্যই বাবা-মায়ের পছন্দেই বিয়ে করব। আবার ভাববেন না যে আমার কোন প্রেমিক আছে। হি-হি-হি!’ পাত্র হিসেবে কেমন ছেলে পছন্দ? ‘চেহারা, সৌন্দর্য বা নির্দিষ্ট কোন পেশা গুরুত্বপূর্ণ নয়। হ্যান্ডসাম না হলেও সমস্যা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পাত্রের মানসিকতা। যে আমাকে বুঝবে, সম্মান করবে, আমার পেশার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে, ভাল বোঝাপড়া এবং বিশ্বাস থাকবে। আমার তরফ থেকেও তাই হবে। তাই বলে আবার যেন ধরে নেবেন না এরকম কেউ আছে আমার (হাসি!)। সত্যিই নাই!’

বাংলাদেশের টেনিস নিয়ে মেধার নেতিবাচক ধারণা আগামীতে কতটা পাল্টে দিতে পারবে বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মেধার অন্য ভুবন :

টেনিস ছাড়া অন্য প্রিয় খেলা : ক্রিকেট, প্রিয় টেনিস খেলোয়াড় : সানিয়া মির্জা, আনা কুর্নিকোভা, মারিয়া শারাপোভা এবং রাফায়েল নাদাল। রং : নীল, ফুল : বেলি, ফল : বেদানা, খাবার : আলুভর্তা ও ডাল, অভিনয়শিল্পী : হুমায়ুন ফরিদী, জাহিদ হাসান ও জয়া আহসান, কণ্ঠশিল্পী : কনকচাঁপা ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, বেড়ানোর প্রিয় স্থান : পাহাড়ী কোন স্থান, মাছ : ইলিশ, যে তিনটি জিনিষ ছাড়া অচল : লিপস্টিক, সানগ্লাস ও মোবাইল ফোন, ব্যক্তিত্ব : বিশ্বনবী (সঃ), জীবনের মূলমন্ত্র : আত্মশক্তি- আমি সব পারবই, ভয় পান : আপন মানুষদের হারাতে, রাগ হন : রক্তের সম্পর্কের কাউকে বাজে কিছু বললে, ঘৃণা করেন : মিথ্যাবাদী এবং ভন্ডদের, খুশি হন : যেকোন ছোটখাটো বিষয়েই খুশি হই, ভালবাসি : কোলে নেয়া যায় এমন শিশুদের।