২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভুয়া ডিগ্রী ও সনদ

জাল সনদ আর ভুয়া ডিগ্রীর ছড়াছড়ি এখন বেশ মাত্রা পেয়েছে। ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রীধারীদের অবস্থাও রমরমা! যারা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শিক্ষক থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যান পদও পাচ্ছেন। আর তা আগলে রাখার জন্য করণীয় সবই করছেন। এমনকি দুর্নীতি স্বভাবজাতে পরিণত হয়েছে কারও কারও ক্ষেত্রে। সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নামে সনদ জালিয়াতির উদ্বেগজনক তথ্যগুলো বিস্ময় জাগাতে পারে। জাল সনদ দেখিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার কর্মকর্তাদের নজরানা প্রদান করে এমপিওভুক্ত হয়েছেন শত শত শিক্ষক। এমনকি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কর্মরতদের কেউ কেউ যুব উন্নয়ন অধিদফতরের নামে সনদ বানিয়ে হচ্ছেন কারিগরি বিষয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষক। আবার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ভুয়া বিএড, এমএড ডিগ্রীর সনদ জমা দিয়ে দিব্যি হাতিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষকতার নামে সরকারী অর্থকড়ি। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, এক টাকা দিয়ে দুই টাকার কাজ করার জন্য। সেখানে ভুয়া সনদ দেখিয়ে চাকরি নিয়ে যদি সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট হয় তবে তা আরও উদ্বেগজনক। এসব দেখার দায়-দায়িত্ব সম্ভবত কারও নেই। সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে আসলে ভুয়া সনদই জমা দিয়ে তারা নিয়েছেন সরকারী অনুদান। অসংখ্য এমপিওধারীর ভুয়া সনদ প্রমাণিত হওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকারী অনুদান দেয়ার সময়ই তাদের সনদ যাচাই-বাছাই করা জরুরী। আসলে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ‘গাইড লাইন’। তাহলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ভুয়া এমপিও’র নামে লোপাট হতে পারবে না। এছাড়া শিক্ষকদের এমপিও দেয়ার সময় তথ্য যাচাই করা হয় না। যদি দেখা হতো তাহলে অনেক বড় সঙ্কট কেটে যেত। দেখা গেছে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ সনদ নিয়ে এমপিওভুক্তসহ সরকারী সুবিধা নিচ্ছেন সারা দেশের অসংখ্য কারিগরি শিক্ষক। যাদের পেছনে প্রতি মাসে ব্যয় হয় কোটি কোটি টাকা। অথচ এই অধিদফতরের প্রশিক্ষণ সনদপত্র প্রদানের কোন অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নেই।

সনদ অনুসন্ধানে মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা দফতর শতে শতে সনদ খুঁজে পেয়েছে। শত শত এমপিওভুক্ত হয়েছে জাল সনদে। যাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, কলেজের প্রভাষক, এমনকি অধ্যক্ষ পর্যন্ত রয়েছেন। সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক, প্রশাসনিক, একাডেমিক ও নিয়োগের বিষয়াদি নিয়মিত অডিট করা হয়। এ সময় শিক্ষকদের সনদ যাচাই করতে গিয়ে প্রচুর শিক্ষকের সনদ ভুয়া বা জাল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সরকার থেকে পাওয়া প্রাপ্ত অর্থ সরকারী কোষাগারে জমা দেয়ার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি’র বিশেষ কারণে তা আটকে যায়। উল্লেখযোগ্য কারও বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা পানিতে ভেসে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে এমনও মিলেছে যে, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের পিএইচডি ডিগ্রী ভুয়া। একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে ‘পিএইচডি’ ডিগ্রী কিনে নামের আগে ডক্টর বসিয়ে দাপটের সঙ্গে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রীর প্রমাণ মিলেছে। একই সঙ্গে আর্থিক অনিয়মের অজস্র দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয় থেকে তাকে নামের আগে ডক্টরেট ব্যবহার না করার জন্য কঠোরভাবে সতর্ক করা হলেও তা গ্রাহ্য করা হচ্ছে না। তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে সাপ। এই ভুয়া ডিগ্রীর বরাতে পেয়ে গেছেন চেয়ারম্যানের আসন। গলিতে অবৈধভাবে গজিয়ে ওঠা একটি ভুয়া বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনলাইনে পিএইচডিধারী দাবি করছেন তিনি। কিন্তু সেই গলিতে কোন ক্যাম্পাস নেই। অবশ্য কোন প্রাইভেট ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের শাখার এদেশে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদানের কোন বিধান নেই। মঞ্জুরি কমিশনের মতে, অনলাইনে ডিগ্রী বিক্রি করা ব্রিফকেস বা এপার্টমেন্ট ইউনিভার্সিটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে করা অনলাইনে ডিগ্রী বিক্রি করে। বাংলাদেশে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্প বা এজেন্ট রয়েছে, যা বৈধ নয়। এমনকি টাকার বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া সনদ ব্যবহার করে কিভাবে চাকরিতে নিয়োগ এবং পদোন্নতি তার কোন ব্যাখ্যা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে এই ভুয়া ডিগ্রীধারীরা নিয়োগ শুধু নয়, পদোন্নতিও পেয়ে আসছেন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার হাল কী করুণ তা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রমই প্রমাণ করে। অন্যান্য বোর্ডের অবস্থাও অনুরূপ। মন্ত্রণালয়ের উচিত অচিরেই এসব উপড়ে ফেলা এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। নতুবা বিপর্যয় বাড়বেই।