১৯ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্টিফেন হকিংয়ের চিরবিদায়

মহাকাশের সীমাহীন ব্যাপ্তি নিয়ে যার এত সাধনা, বিজ্ঞানের আকাশের সেই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি নিভে গেল বুধবার। মহাবিশ্বের সৃষ্টি-রহস্যের ঘোমটা খুলে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন স্টিফেন হকিং। তিনি দেখিয়ে গেছেন, শূন্য বলে কিছু নেই। স্থান-কালের হিসাব বের করতে আজীবন নিবেদিত ছিলেন জগদ্বিখ্যাত এই ব্রিটিশ পদার্থবিদ। জীবদ্দশায় তারকা পদার্থবিদের খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। বলা হয়, আইনস্টাইনের পর বিশ্বের সবচেয়ে আলোকিত ও সফলতম বিজ্ঞানী তিনি। তার রেখে যাওয়া অনুপ্রেরণা হয়ত বহুকাল মানুষকে দেখাবে নতুন দিশা।

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি বিখ্যাত হলেও সাধারণ পর্যায়ে তারকাখ্যাতি আসে তাহার রচিত ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ গ্রন্থটির মাধ্যমে। সারা বিশ্বের সাধারণ বিজ্ঞান পাঠকদের মধ্যে এখনও গ্রন্থটির বিপুল আলোড়ন রয়েছে। তিনি ২০ বছর বয়সে মারাত্মক স্নায়ুর অসুখে আক্রান্ত হওয়ার পরও ৭৬ বছর পর্যন্ত কাটিয়ে গেলেন কী অসাধারণ জীবন। একের পর এক তত্ত্ব সৃষ্টি করে গেছেন। পেয়েছেন বিরল সব সম্মান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে কীভাবে চিন্তাশক্তি কাজে লাগাতে হয়, অন্যদের জন্য প্রেরণা হয়ে উঠতে হয়, এমন নজির, হুইল চেয়ারকে বাহন করে চলা মহাবিজ্ঞানী হকিং। লিখেছেন কাঁপা আঙুলে কম্পিউটারের বাটন চেপে। তিনি মনে করতেন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যে বিশাল অগ্রগতি তার পেছনে গ্যালিলিওর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পারেনি। তাই হকিং গর্ববোধ করতেন গ্যালিলিওর মৃত্যুদিনে জন্ম নিয়েছিলেন বলে। গ্যালিলিওর মৃত্যুর ৩০০ বছর পর, ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি পৃথিবীতে আসেন কৃষ্ণগহ্বরের এই গবেষক। তার মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা, একটি ঐতিহাসিক দিন, ১৪ মার্চ। এই দিনটি আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন। চলে যাওয়ার আগে হকিং নিজে আরও মূল্যবান করে গেলেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সেই তত্ত্ব।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান পদে বেশ কয়েক বছর অধিষ্ঠিত ছিলেন হকিং। অবসর নেন ২০০৯ সালে। এ পদে এক সময় স্যার আইজ্যাক নিউটনও ছিলেন। হকিং বিশ্বের কোটি কোটি বিজ্ঞানভক্তের মনে বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরনের বিস্ময়কর ভালবাসা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতায় তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। একই সঙ্গে বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন, এ ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না হয়। তিনি এমন এক জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, যার বই টানা পাঁচ বছর ছিল বেস্ট সেলারের তালিকায়। মানুষের উদ্ভাবিত কম্পিউটার ভাইরাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যের কম্পিউটার বা নেটওয়ার্ক কব্জা করছে, সেটা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেও বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, পৃথিবী আমাদের পক্ষে বড্ড ছোট হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও তাকে যন্ত্রণা দিত। বাসযোগ্য অন্য কোন গ্রহ খুঁজে বের করার প্রবল তাগিদ এসেছে তার কারণেই। কয়েক বছর আগে ইসরাইলী বাহিনী গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনী শিশু ও নারীদের নির্বিচারে হত্যার ঘটনায় স্টিফেন হকিংই প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি তীব্র নিন্দা জানান। শুধু নিন্দাই নয়, ইসরাইলের জেরুজালেম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণও প্রত্যাখ্যান করেন। তার দেখানো পথ ধরে আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী সম্মেলন প্রত্যাখ্যান করেন। উজ্জ্বল চোখের অধিকারী এ মানুষটি কয়েক দশক পদার্থবিজ্ঞানের জগৎটাকে শাসন করেছেন। বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী হয়েও নোবেল পুরস্কার মেলেনি তার। কেন এমন উপেক্ষা, তার জবাব হয়ত সময়ই বলতে পারবে! তবে জীবিত অবস্থাতেই তিনি কিংবদন্তি ছিলেন। মৃত্যুর পরও বহুকাল তার এই অবস্থান টিকে থাকবে, তিনি অমর হয়ে থাকবেন মানুষের কাজে, ভালবাসায়।