১৯ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শত ষড়যন্ত্রের জাল যায় বুনে -জাফর ওয়াজেদ

একাত্তর সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো একটি গান, ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে, কে, কে?’ বিশ্ববাসীর জানা ছিল এই নরাধম হচ্ছে জান্তা ইয়াহিয়া খান। গানে বলাও হয়েছিল তীরটা তার দিকে ছুড়ে। ইয়াহিয়া তোমায় আসামির মতো জবাব দিতে হবে।’ বিশ্ব মানবের কাছে, মানবতাবাদীদের কাছে ইয়াহিয়া আসামি। ব্যাপক গণহত্যার দায় তার কাঁধে। বাঙালী নিধনে মত্ত হয়েছিল এই নরঘাতক নয় মাসজুড়ে। পার সে পায়নি। ক্ষমতা তাকে ছাড়তে হয়েছিল অপমানজকভাবেই। একাত্তরের পরাজয়ের কারণে পাকিস্তানীরাও তাকে ঘৃণা করত। কিন্তু একাত্তর পরবর্তী লাখ লাখ তরুণ যুবাকে বিপথগামী করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে আরও শ্মশানে পরিণত করেছিল যারা, তাদের বিচার হয়নি। তারা দেশকে আরও বিধ্বস্ত শুধু নয়, মানুষ হত্যায়ও উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। লাখ লাখ মুক্তিকামী তরুণ-যুবাকে ঠেলে দিয়েছিল সশস্ত্র পথে সরকার উৎখাতে। ফল দাঁড়িয়েছিল এই পথে লাখ লাখ তরুণের আত্মাহুতি। রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি থেকে এরা ছিটকে পড়েছে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। সেসব তামাদি হয়ে গেছে বলা যাবে না বরং বারবার তা সামনে চলে আসবেই, যত দিন যাবে। কিন্তু কেন এই ধ্বংসের গর্জন হানা, কেন সশস্ত্র পথে আত্মোদ্বন্দ্বনে নেমে পড়া-সে সবের নানা ব্যাখ্যা মেলে। তাতে ঘটনার সত্যতা চাপা পড়ে যায় না। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশ। সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার চিহ্ন। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, ব্রিজ, কল-কারখানা প্রায় সবকিছুই হয়েছিল ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত। অচল হয়ে পড়েছিল প্রশাসনিক অধিক কাজকর্ম। প্রিয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ঘরে ঘরে ক্রন্দন আর হাহাকার। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। নির্বিচারে হত্যা করেছে ত্রিশ লাখ বাঙালীকে। পাশবিক অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে প্রায় তিন লাখ নারী। সর্বত্র দেখা দেয় তীব্র অভাব। অভাব খাদ্যের, বস্ত্রের, বিধ্বস্ত বাড়িঘর বাঁধবার সরঞ্জামের, লাখ লাখ আহত নর-নারীর চিকিৎসার। ভারত থেকে প্রত্যাগত এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাব। অভাব অর্থের। বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ার শূন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক কপর্দকশূন্য। এই ব্যাংকে সংরক্ষিত স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা আত্মসর্ম্পণের আগেই পাকিস্তানী হানাদাররা পাচার করে দেয় পাকিস্তানে। এমনই এক সঙ্কট সময়ে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে ছাত্র, যুবাসহ সকল স্তরের জনগণের সহায়তা কামনা করেন। দেশ পুনর্গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর সামনে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। অগণিত সমস্যা মোকাবেলায় দৃঢ় ও অবিচল ভঙ্গিতে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে গেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশবিরোধী কতিপয় চীনাপন্থী ‘অতি বাম’ নামধারী রাজনৈতিক গ্রুপ সশস্ত্র পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে। শ্রেণী শত্রু বিধনের নামে মানুষ হত্যায় লিপ্ত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে তারা স্বীকার করে নেয়নি। আলবদর, আলশামস ও রাজাকাররা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও গণহত্যা চালায়, স্বাধীনতা নস্যাত করার জন্য তারাও অতি বাম গ্রুপের সঙ্গে হাত মেলায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উগ্র রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী বঙ্গবন্ধু সরকারের পতনকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গঠন করে জাসদ। ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ এই দলগঠনে সম্পৃক্ত হয় স্বাধীনতা পূর্ব ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে। সশস্ত্র পন্থায় ক্ষমতা দখলের জন্য জাসদ গড়ে তোলে সশস্ত্র সংগঠন গণবাহিনী। থানা ও ফাঁড়ি আক্রমণ, পাট ও খাদ্যের গুদাম লুট এবং অগ্নিসংযোগ। আওয়ামী লীগের এমপিসহ নেতা-কর্মীদের হত্যার মাধ্যমে দেশজুড়ে নাশকতা অব্যাহত রাখে। বঙ্গবন্ধু সরকারের উৎখাতের লক্ষ্যে তারা রেললাইনও উপড়ে ফেলে। বোমাবাজির প্রচলন ঘটায়। অভ্যন্তরীণ এই সশস্ত্র সন্ত্রাস আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর ক্ষতিসাধন করে। পুলিশ বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব ছিল না এই সন্ত্রাস দমন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংগঠিত সশস্ত্রপন্থা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবার উপক্রম হয়। ত্রাণ ও রিলিফবাহী যানবাহনগুলোকে পর্যন্ত ধ্বংস করা হয়। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ পরিহার করা জাসদে তখন স্বাধীনতা বিরোধীরা লুকিয়ে রাখা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যোগদান করে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছিল। এরই এক পর্যায়ে ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জাসদের সশস্ত্র গ্রুপ গণবাহিনী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও করে সশস্ত্র হামলা চালায়। প্রতিরোধে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। কি কারণে এই ঘেরাও ও হামলা চালানো হয়, তার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। গণমানুষের স্বাভাবিক জীবন ভয়ঙ্কর হুমকির মুখোমুখি করে তোলে। ঘেরাও এবং হামলার মতো হটকারী কর্মসূচী পালনে ব্যর্থ হয়ে জাসদ কর্মীরা আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। তারা সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনীতির বিষবাষ্প প্রবিষ্ট করায়। বিশেষ করে পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনাবাহিনীর মধ্যে তারা বঙ্গবন্ধু বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে ‘চেইন অব কমান্ড’ নষ্টে ব্রতী হয়। এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শতধা বিভক্ত জাসদের কয়েকটি গ্রুপ চুয়াত্তরের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ে হতাহতের স্মরণ দিবস পালন করে। এরা বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে তাদের সেদিনের তৎপরতাকে সঠিক বলে অভিহিত করে প্রমাণ করতে চেয়েছে, বঙ্গবন্ধু সরকার উৎখাতে তারা অদম্য ভূমিকা রেখেছে। হটকারিতা যাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিল, অতীত তাদের গৌরবের নয়। দুর্বল রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে দলটি আজ প্রায় ভঙ্গুর। এখনও কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়।

বিভেদ ও বিরোধটা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালেই। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে তৎকালীন প্রাক্তন ছাত্র নেতাদের উদ্যোগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। মূল কমান্ডে ছাত্র নেতারা স্থান পায়নি বরং চার যুব নেতার নেতৃত্বে ভারত সরকারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে মুজিববাহিনী নামে আরেকটি বাহিনী সৃষ্টি করা হয়। এর নেতৃত্বের সবাই দেশের পূর্বাঞ্চলের জন্ম। উত্তরাঞ্চল থেকে কেউ ছিল না। মুজিব বাহিনীর সদস্য বিএলএফ নামেও পরিচিত হয়। আওয়ামী লীগের কোন কার্যকরী সংসদের সভায় বা ১০ ও ১৭ এপ্রিলের এমএনএড এমপিএদের যৌথ সভায় বঙ্গবন্ধুর নামে মুক্তিযুদ্ধে কোন বাহিনী সৃষ্টির সিদ্ধান্ত ছিল না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস মুজিববাহিনীর নেতৃত্বে সরকারের ঠিকানা শক্তির দাবিদার হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত অপপ্রচার চালায়। যুদ্ধশেষে মুজিববাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ায় এগারো হাজার। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধ শেষে হয়ে যায়। কয়েকজন অবশ্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। যুদ্ধের সেই প্রশিক্ষণ মুজিববাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশ দেশে কার্যকর করে জাসদ ও গণবাহিনীর নামে। গেরিলা কায়দায় হামলা চালিয়ে প্রথমেই ঈদগার ময়দানে নামাজরত আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর পুরো শাসনামলে তারা সশস্ত্র হয়ে চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। একাত্তরের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লী সফরকালে প্রথমবার ভারতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যপুষ্ট মুজিববাহিনীর ক্রমবর্ধমান ‘উচ্ছৃঙ্খলতা’ ও সরকারবিরোধী তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পিএন হাকসারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। একাত্তরের ১৮ এপ্রিল নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার মুজিববাহিনীর চার নেতাকে দেশের ভেতর থেকে ছাত্র যুবকদের আনার দায়িত্ব দেয়। এ ছাড়াও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এই তরুণ নেতাদের ‘রিক্রুটিং’-এর দায়িত্ব ছাড়াও সশস্ত্র প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেন। মন্ত্রিসভায় বা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদিত ছিল না। ভারতীয় একটি সংস্থার উপ-সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় উপসংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল উবান গেরিলা প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে মুজিববাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্বে ছিলেন। জেনারেল ওসমানীও হুমকি দিয়েছিলেন মুজিববাহিনীকে দ্রুত তার কমান্ডের অধীনে আনা না হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। তরুণ নেতারা মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে তাদের নিয়ে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালেই বাংলাদেশের ভবিষ্যত নেতৃত্ব কুক্ষিগত করার এ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশেও তাদের তৎপরতা থামেনি।

স্বাধীন দেশে মুজিব বাহিনীও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তাজউদ্দীন সরকার ও মুজিববাহিনীর মধ্যে ভারতীয় মধ্যস্থতায় বৈঠক হলেও কোন সমঝোতা হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারের মধ্যে মতানৈক্য ও বিভেদ শুরু হয়েছিল। স্বাধীনতার পরও তার পরিসমাপ্তি ঘটেনি। বরং তা আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নতুন নতুনভাবে উপদলীয় কোন্দল শুরু হয়। যার কারণে পরিসমাপ্তি ঘটে তৃতীয় শক্তির সহিংসতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশকে পরাধীন বাংলাদেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে জাসদ সমস্ত ভূমিকা রাখে। তাদের অপকর্মের মাশুল হিসেবে জিয়া ক্ষমতায় বসে সামরিক আইন জারি করেছিল। কিন্তু তিনিই জাসদ নেতাদের জেলে ঢুকান। সাজা দেন সামরিক আইনে। অথচ এই জিয়াকে তারা কথিত বিপ্লবের সহযোগী হিসেবে মর্যাদা দিয়েছিল। সেনাবাহিনীর অফিসারদের হত্যার সঙ্গেও গণবাহিনী সক্রিয় ছিল। আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে তারা মানুষ হত্যা করত। স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিববাহিনীর অভ্যন্তরে সিরাজুল আলম খান এবং শেখ মনির যে বিরোধ সৃষ্টি হয়, তা সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ, দ্বন্দ্ব সংঘাত ও হিংস্র সংঘর্ষে পরিণত হয়েছিল। স্বাধীনতার পরপরই সিরাজুল আলম খান চাইছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে অনির্বাচিতদের শাসন। যার সীমা এবং শেষ নেই। তার জাতীয় সরকার গঠনের নেপথ্যে যে একটি ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল, তা পরে স্পষ্ট হয়। মুজিব বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগে জনাব খান সেøাগান তুলেছিলেন ‘মুজিববাদ জিন্দাবাদ’। স্টেডিয়ামে আয়োজিত সিরাজুল আলমের অনুসারীরা সব অস্ত্র জমা দেয়নি। পরে তারা এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে খানের অনুসারীরা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে শোষণহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সেøাগান দিয়ে বঙ্গবন্ধু বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। এরা স্বাধীনতার সব ইতিহাসকে বিকৃত করতে থাকে। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তিকে ভারতের কাছে দাসখত প্রদান এবং বঙ্গবন্ধু সরকারকে ভারতের ‘পুতুল সরকার’ বলে প্রচার চালায়। ভারত বিরোধিতা তাদের পরোক্ষভাবে জনগণের মধ্যে পাকিস্তান প্রীতি জাগিয়ে তোলার কাজটি করেছিল। রাজনীতিমুক্ত সশস্ত্র বাহিনীতে তারা যে রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তার মাশুল জাতিকে দীর্ঘদিন দিতে হয়েছে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে পরিচালিত গণবাহিনী দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠন কাজ তারপরও অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন।

সিরাজুল আলম খান নিজ দলের মধ্যে ‘কাপালিক’ ও ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে অভিহিত হতেন। তার ভূমিকা ও তৎপরতা পরবর্তীকালে আরও রহস্যজনকে পরিণত হয়। কেবল জিয়া সরকারকে ’৭৫-এর ২২ নবেম্বর উৎখাতের প্রচেষ্টার ঘটনায় তাহের, সিরাজুল আলম খানসহ আরও জাসদ নেতারা গ্রেফতার হন। জনাব খান ওই প্রথম জেল খাটেন। এর আগের কোন ঘটনাতেই অন্যরা আটক হলেও তিনি বহাল তবিয়তেই ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হুঙ্কার তোলা জনাব খান মাঝে মধ্যে দেশে আসেন। বাকি সময় যুক্তরাষ্ট্র থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাসদের ‘গুরু’ সিরাজুল আলম খান সব সময় ‘যড়যন্ত্রের সঙ্গে ছিলেন বলে অভিযোগ করার পর জাসদের কতিপয় অর্বাচীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষোদগার চালায়। তারা বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরে জনাব খানকে ‘মহাপুরুষে’ উন্নীত করতে চান। কিন্তু বাস্তবতা বলে তিনি রহস্য পুরুষ। লাখ লাখ যুবককে বিপথগামী করার জন্য একদিন তার বিচার হবেই; ইতিহাসের কাঠগড়ার মতো আইনের কাঠগড়াতে এমন ভাবনা জেগে থাকে বাহাত্তর থেকে বিরাশি পর্যন্ত জাসদ রাজনীতির বিরোধিতার মুখেও। জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্ধকার যুগের স্রষ্ঠা হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।