১৯ মে ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দৃশ্যমান মেট্রোরেল ॥ বাস্তবায়নের পথে আরেকটি স্বপ্ন

দৃশ্যমান মেট্রোরেল ॥ বাস্তবায়নের পথে আরেকটি স্বপ্ন
  • উত্তরার দিয়াবাড়িতে প্রথম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন, চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন;###;আগামী বছর উত্তরা-আগারগাঁও অংশে ট্রেন চলবে;###;জাপান থেকে আনা হচ্ছে কোচ

রাজন ভট্টাচার্য ॥ সকল অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে মেট্রোরেল। ইতোমধ্যে স্বপ্নের এই প্রকল্পের প্রথম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে দুটি পিলারকে যুক্ত করে এই স্প্যানটি বসানো হয়েছে। শীঘ্রই আগারগাঁও এলাকায় বসানো হবে আরেকটি স্প্যান। চলতি মাসেই স্প্যান বসানোর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। আগামী বছর ডিসেম্বরের আগেই মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পসমূহের একটি মেট্রোরেল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর চলমান যানজট নিরসন ও চলাচলে স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে হলে মেট্রোরেল স্থাপনের বিকল্প নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদও দিয়ে যাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি রাজধানীর আশপাশের জেলাসমূহে দ্রুত গতি সম্পন্ন ট্রেন সার্ভিস চালুরও পরামর্শ দিয়ে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ মহল।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের কাজ। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রকৌশলী ও কর্মীরা। এরই অংশ হিসেবে উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় দুটি পিলারকে যুক্ত করে বসানো হয়েছে স্প্যান।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মোট ২০ দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ৭৭০টি স্প্যান বসবে। তবে প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আগারগাঁও পর্যন্ত চলাচলের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে চলছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ। শীঘ্রই আগারগাঁও পয়েন্টে বসানো হবে দ্বিতীয় স্প্যান। বাকি অংশে সয়েল স্টেস্টের কাজ চলছে। পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর কাজও চলছে বলে জানা গেছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসেই স্প্যান বসানোর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। আগামী বছর ডিসেম্বরের আগেই মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত হবে। দুটি অংশে ভাগ করে মেট্রোরেলের কাজ চলছে। মূল ডিপো নির্মাণ এবং চলাচলের লাইন। এরই মধ্যে আগারগাঁও পর্যন্ত পাইলিং শেষ হয়েছে। এখন মাটির ওপরের অংশে পিলার নির্মাণ করে তার ওপর বসানো হবে স্প্যানগুলো।

প্রায় ৫৯ একর জায়গার ওপর নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেলের মূল ডিপো। যেখান থেকে ৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড পর পর ছেড়ে যাবে ৬ জোড়া বগি নিয়ে বিদ্যুতচালিত অত্যাধুনিক ট্রেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিপোর কাজ শেষ হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী উভয় দিক থেকে আসা যাওয়া করবে মেট্রোরেলে। আগামী বছর জাপানের গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাওয়াসাকি-মিৎসুবিশি থেকে কোচ আমদানি করা হবে। বিদ্যুতচালিত এই ট্রেনে সর্বক্ষণিক বিদ্যুত সুবিধা নিশ্চিত করতে দুটি প্লান্টও নির্মাণ করা হচ্ছে। যা শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য কাজে লাগানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উড়াল সড়কের চাইতে মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পের বেশি সুফল পাবেন সাধারণ মানুষ। তাছাড়া যানজট এড়াতে মেট্রোরেলের কোন বিকল্প নেই। এই প্রকল্পটিই হবে যানজট নিরসনে সবচেয়ে কার্যকর। তাই দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজধানীর যানজটের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) অনুযায়ী প্রস্তাবিত সবকটি মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের।

রাজধানীর উত্তরায় দিয়াবাড়ি খালের দু’পাশের জমিতে মেট্রোরেলের ডিপো নির্মাণ করা হয়েছে। এখান থেকেই ২০১৯ সালে চলবে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। মাত্র ৩৭ মিনিটে পৌঁছে যাবে উত্তরা থেকে মতিঝিল। উত্তরা থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেলের-৬ রুটের নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের সহায়তা হিসেবে জাইকা দেবে প্রায় ১৬ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ এলিভেটেড রুটের মেট্রোরেলের ১৬টি স্টেশন থাকবে। প্রতি ঘণ্টায় উভয়দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মেট্রোরেল রুট-৬ এর পাশাপাশি আরও দুটি রুট নির্মাণের প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল রুট-১ (এমআরটি-১) হচ্ছে গাজীপুর থেকে ঝিলমিল প্রকল্প পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রথম পর্যায়ে এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর এবং খিলক্ষেত হতে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটারের কাজ করা হবে। এর মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার হবে আন্ডারগ্রাউন্ড।

সাধারণের গণপরিবহন ব্যবস্থার সুবিধার্থে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট বা মেট্রোরেল প্রকল্পটি জুন, ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালে। সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মিরপুর ১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শুরু করে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর, কালশী মোড়, মিরপুর ১১ নম্বর, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকা, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা এবং আগারগাঁও এলাকা পর্যন্ত দিন-রাত কয়েকশ শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে কালশী মোড় ও আগারগাঁও মোড়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিশেষ করে আগারগাঁও এলাকায় মেট্রোরেলের একটি অবকাঠামো গড়ে উঠছে। সেখানে মেট্রোরেলের কাজে ব্যবহৃত বড় বড় ক্রেন, পাইলিং যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। কাজের সুবিধার্থে আগারগাঁও-এ নির্মাণ স্থাপনার পাশেই প্রকল্প অফিস তৈরি করা হয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক (ফ্যাসিলিটিজ এ্যান্ড এ্যাডমিনিসট্রেটিভ) হারুন-অর-রশিদ বলেন, মেট্রোরেলের মূল পাইল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পায়নি। অর্থাৎ প্রকল্পটির পূর্বের ব্যয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকাই আছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিষেবা স্থানান্তর ও রিলোকেশনের কাজ গত বছর শেষ হয়েছে। এছাড়া আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্যাকেজ ০৫ এবং ০৬ এর পরিষেবা স্থানান্তর ও রিলোকেশনের কাজও চলমান। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নে টোকইউ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের সঙ্গে ডিএমটিসিএলের ৫৬৭ কোটি ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৪০৯ টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এরই মধ্যে স্যান্ড কম্পেকশন পাইল শতভাগ, ডাইনামিক কম্পেকশন পাইল (১০০%), প্রি ফেব্রিকেটেড ভার্টিকাল ড্রেনের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। এছাড়া মাটি ভরাটের কাজ ৭৫ ভাগ শেষ। ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত এই প্যাকেজের বাস্তব গড় অগ্রগতি ছিল ৮৪ শতাংশ। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী সুকুমার চন্দ্র কুমার এ জানান, সর্বশেষ আমরা রুলিং স্টক ( যে রেলগাড়িতে যাত্রী চড়বেন) তা ক্রয়ের জন্য একটি চুক্তি করেছি। ইতোমধ্যে চুক্তির বাস্তবায়ন কাজ কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জাপান থেকে এই রেল আনা হবে। আশা করছি ২০১৯ সালের শেষের দিকে এই গাড়ি দেশে আসতে শুরু করবে। তবে ২৪টি ট্রেন একসঙ্গে আসবে না। প্রতিবার একসেট ট্রেন সিডিউল অনুযায়ী আনা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের জুলাই মাসে বহুল প্রত্যাশিত দেশের প্রথম মেট্রোরেল ‘ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-এমআরটি, লাইন-৬’ ও ‘বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)’ নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মেট্রোরেল ও প্রথম বিআরটি নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, যেসব উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করে দেশের জনগণকে আমরা আরও সুন্দরভাবে চলাচলের সুযোগ করে দিতে সক্ষম হব। এ প্রকল্পের আওতায় উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলিভেটেড মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।