২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফেসবুক নামক নয়া থানা -জাফর ওয়াজেদ

ফেসবুক মানে হতে পারে অবয়ব বন্ধু কিংবা মুখগ্রন্থ। যে নামেই ডাকা হোক, তার কাজ কিন্তু একই। তবে ফেসবুক আমাদের কী কাজে লাগেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবহারকারী নানা জনের কাছ থেকে মিলবে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জওয়াব। একেক জনের কাছে তার গুরুত্ব একেক রকম। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটি বিশ্ব জুড়েই এখন গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। দূরকে নিয়ে এসেছে কাছে, অচেনা জনকে করেছে আপন, আবার আপনজনও হচ্ছে পর। কিংবা নেতিবাচক প্রচারণায় অপমানিত হয়ে অনেকে আত্মহননে লিপ্ত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তা ফেসবুকে জানান দিয়েই। আবার উস্কানি দিয়ে সমাজকে লন্ডভন্ড করায় যেমন অবদান রাখছে, তেমনি রাজনৈতিক বিরোধকেও উস্কে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ফেসবুক। সবচেয়ে বিপজ্জ্বনক কাজ হচ্ছে, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদীরা ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের কর্মী যেমন সংগ্রহ করছে, তেমনি তাদের উদ্বুদ্ধ করছে আত্মঘাতী হতে। এর মাধ্যমেই কোথায় কখন অপারেশন চালানো হবে, তা-ও নির্ধারণ করছে। জঙ্গী তৎপরতায় ফেসবুকের ব্যবহার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ কম নয়। দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগানোর ক্ষেত্রে ফেসবুক যথেষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম। মূলত ফেসবুকের যেমন রয়েছে ইতিবাচক দিক, তেমনি রয়েছে নেতিবাচক দিকও। সমাজকে এগিয়ে নেয়ার মতো ক্ষমতা যেমন রয়েছে তার, তেমনি সমাজে গোলযোগ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি, মানুষকে হয়রানি, প্রতারণার ক্ষমতাও তার কম নয়। অন্যকে আত্মহননে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও সে ব্যবহৃত হয়। এই মাধ্যমের যে হাল হকিকত: তাতে মানুষের ‘প্রাইভেসি’ পর্যন্ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়েই আসলে এক নতুন উন্মাদনার নাম ফেসবুক। এর আসক্তি মাদকাসক্তের চেয়েও কম ভয়াবহ নয় বলে নানান জন মত প্রকাশ করে থাকেন। তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালবাসা থেকে বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়ে নিতে পারে ফেসবুক। কিংবা প্রেমে প্রতারিত হয়ে আত্মহননের ঘটনাও এদেশে অনেক।

দশবছর আগে বালক এনায়েত হারিয়ে গিয়েছিল সদরঘাট লঞ্চঘাট থেকে। চায়ের দোকানে ঠাঁই হয়েছিল। এক ক্রেতার সঙ্গে গল্পচ্ছলে জীবন কাহিনী বর্ণনার পর; তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন সেই ক্রেতা। মাসখানেকের মধ্যে বালক ফিরে পায় তার পিতা-মাতাসহ পরিবারের সকল সদস্যের। ফেসবুকের কল্যাণে যেমন পেয়েছি ত্রিশ/চল্লিশ বছর আগের বন্ধু, পরিচিতজনদের। যাদের অনেকের সঙ্গে আর কখনও দেখা হবার সম্ভাবনা ছিল না প্রবাসে থাকার কারণে। সেই তাদের পেয়ে গেছি হৃদয়ের একুল ওকুল দু’কুল ছাপিয়ে। সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ পুরনো স্মৃতিকে বেশ ঝলসে দিতে পারে অনায়াসে। পারস্পরিক ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময়ও চলে। কিন্তু একই ফেসবুক আবার ঝগড়া বিবাদের প্লাটফরমে পরিণত হলে কত সম্পর্ক যে বিনষ্ট হয়, ছাড়াছাড়ি হয়, এমন কি ‘দেখে নেব’-এর মতো হুমকি-ধামকিও প্রদর্শিত হয়। ফেসবুকের গুরুত্ব ব্যবহারকারী যে সব সময় বুঝতে পারে তা নয়। তবে ফেসবুক ‘গোয়েবলস স্টোরি’র মতোই গুজব ছড়াতে পারঙ্গম। হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে মিথ্যাচারকে সত্যাচারে পরিণত করতে পেরেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটা মিথ্যা দশবার প্রচার করলে তা সত্যে পরিণত হয়। গোয়েবলসের পথ ধরে দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে প্রায়শই ছড়ানো হয় নানা ধরনের গুজব। যাকে অনেকেই বলে থাকেন ‘গোয়েবলস স্টোরি।’ এসব গুজবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিচারক, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, খ্যাতিমানদের নাম যেমন জড়ানো হয়, সশস্ত্র বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নামও জড়ানো হয়। এমনও হয়েছে সংবাদপত্রের ‘মাস্টহেড’ এর স্ক্রিনশট নিয়ে পত্রিকায় ভুয়া প্রথম পাতা তৈরি করা হয়েছে। একে সাইবার অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ফেসবুকে এমনকিছু এ্যাকাউন্ট রয়েছে, যেখান থেকে বিরামহীনভাবে রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য বিকৃত করে গুজব ছড়ানো হয়। এরকম শতাধিক পেজ ও আইডি কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে এসব আইডির অধিকাংশের ইন্টারনেট প্রটোকল ঠিকানা (আইপি) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের। নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব বা তথ্য অনেকের কাছে পাঠানো যায়, যাকে বলা হয় ‘বুস্ট’। আর ইউটিউবে যার যা খুশি প্রচার করে আসছে। সেখানে ভুল তথ্য দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।

বাংলাদেশে ক’দিন আগে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে হাঙ্গামার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। রাজপথে কোটাবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও সরব ছিল আন্দোলনকারীরা। কিন্তু সুযোগ বুঝে এ প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়েছে গুজব রটনাকারী সুযোগ সন্ধানীরা। বড় ধরনের তিনটি গুজব ছড়ানো হয় ফেসবুকে। হঠাৎ করে ফেসবুকে গুজব রটানো হয় যে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবুবকর নামে একজন ছাত্র মারা গেছে। তার অজ্ঞান অবস্থার ছবি তুলে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া হয়। মুহূর্তেই তা শেয়ার হতে থাকে ফেসবুক গ্রুপ ও বিভিন্ন একাউন্ট থেকে। একজন ‘পপুলার’ ব্যক্তির ভেরিফায়েড পেজ থেকে এটি প্রথমে ছড়ানো হয়। যে পেজে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি লাইকার রয়েছেন। এই গুজবের পরপরই রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার তরুণ। আবাসিক হল থেকে গেট ভেঙ্গে বেরিয়ে আসেন ছাত্রীরাও। রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান নিতে থাকেন তারা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলাকালে কোথাও কোথাও অন্য ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে এরই মধ্যে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেই মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে দেয় আবু বকর। গুজব রটনাকারী দেশজুড়ে পরিচিতজন। তিনি লিখেছিলেন, ‘পুলিশের গুলিতে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন। ছি! আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? ন্যায্য কথা বলতে এসে ছাত্ররা এভাবে পুলিশের গুলি খেয়ে মরবে।’ পুরোটাই ছিল মিথ্যাচার। কিন্তু এই মিথ্যা পল্লবিত হয় সারাদেশে। কল্পিত আন্দোলনে তা ঘি হিসেবে ঢেলে দেয়া হয়। এর পরপরই পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় উপাচার্যের বাসভবনে। নারকীয় এই হামলার সময় মুখোশধারী যুবকরা লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

এর পরের গুজবটি ছড়ানো হয় সোমবার রাতে। আন্দোলনকারীরা পরবর্তী দিনের জন্য কর্মসূচী স্থগিত করে ফিরে গেলে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে ভুয়া তথ্য। রাত দশটার দিকে ফেসবুকের কিছু গ্রুপে বলা হয়, ‘হলে বিদ্যুত বন্ধ করে‘ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। হলের গেস্টরুমে ছাত্রদের ডেকে, ধরে মারধর করা হচ্ছে বলেও লেখা হয়। এ সময় ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ বাড়ে। দায়ভার চাপানো হয় ছাত্রলীগের ওপর। অথচ ভিডিওটি পুরনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিভুক্ত সাতটি কলেজকে বাদ দেয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়কার। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে অশালীন ভাষায়ও মতামত দিতে থাকে। কোটা আন্দোলনের সর্বশেষ গুজবটি রটানো হয় মঙ্গলবার রাতে। কবি সুফিয়া কামাল হলে এক ছাত্রীকে মারধর ও তার রগ কেটে দেয়ার অভিযোগ ওঠে হল ছাত্রলীগ সভাপতি এশার বিরুদ্ধে। হঠাৎ করেই ফেসবুকে রক্তাক্ত একটি পায়ের ছবি ভাইরাল হতে থাকে। পোস্টে দাবি করা হয়, কোটা বাতিল নিয়ে আন্দোলনকারী মুরশিদা আকতারের পায়ের রগ কাটা হয়েছে বলে। এরপরই গভীর রাতে অন্যান্য হল থেকে ছাত্ররা এবং নানা স্থান থেকে আন্দোলনকারীরা সুফিয়া কামাল হলের গেটের সামনে অবস্থান নিতে থাকেন। ভেতরেও ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন ছাত্রীরা। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ঘটনা তদন্ত না করেই ফেসবুক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এশাকে বহিষ্কার করে। আর এক ধাপ এগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কোন অনুসন্ধান ছাড়াই গুজবের ওপর ভিত্তি করে এশাকে হল থেকে বহিষ্কার করে। আরও আরও ধাপ পেরিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা গুজবে পূর্ণ ঘটনার তদন্ত না করেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এসব অর্বাচীন, জামায়াত-বিএনপি-জঙ্গী পরিচালিত কথিত আন্দোলনের গতরে আগুন ও ঘি ঢেলে দিয়ে বেশ ‘মহান’ দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সোল্লাসে মেতে উঠেছিলেন সে রাতে। এশার গলায় জুতার মালা পরানোর মতো নিকৃষ্ট কাজটিও করা হয় এসব শিক্ষকের উপস্থিতিতে। এরপরই বেরিয়ে আসে রগ কাটা নয়। বরং আন্দোলনকারী নিজেই ক্ষোভে জানালায় আঘাত করলে তার পা কেটে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ফেসবুকেও প্রচারিত হয় তার বক্তব্য। কিন্তু গুজবে কান দিয়ে ছাত্রলীগ ও শিক্ষকরা যা করেছেন, তা মার্জনীয় অপরাধ বলা যাবে না। এই ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও অপরাধ ঘটতে থাকবে।

পুলিশ অবশ্য সক্রিয় হয়েছে। যদিও গোড়াতে তারা সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারতো না। তারা বলতে পারতো পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়নি। এ ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতার দিকটিও প্রকটিত হল। অবশ্য পুলিশ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছে। এখানে ছলচাতুরীূর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। ফেসবুকে যারা গুজব ছড়িয়েছে তাদের নামধাম ও পরিচিতি থাকলেও ‘রহস্যজনক’ কারণে তাদের আসামি করা হয়নি। বরং তা অপরাধীকে আরও প্রশ্রয় দেয়ারই নামান্তর। পুলিশ অবশ্য বলছে কথিত আন্দোলনকালে ফেসবুকে মিথ্যা তথ্যপ্রচার, মৃত্যুও রগকাটার গুজব ছড়ানো এবং উস্কানিমূলক তথ্য প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা করেছে। মামলার নথিতে বিভিন্ন ফেসবুক আইডির নাম ও পোস্ট সংযুক্ত করা হলেও আসামির তালিকায় তাদের নাম উল্লেখ না করার পেছনে কী অভিসন্ধি তা এখনও স্পস্ট নয়। অথচ ২৫টি একাউন্ট ও পেজকে শনাক্ত করেছে তারা, কিন্ত কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। অনেকে পালিয়ে যেতে পারেন জেনেও পুলিশ নির্বিকার। এমনকি গুজব রটানোর প্রধান হোতা ধরাছোঁয়ার বাইরে। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে ব্যাপক নাশকতা চালাতে চেয়েছিল। উপাচার্যের বাসভবন ভাংচুর তারই উদাহরণ। পরিস্থিতি যেভাবে ঘোলাটে করে তুলেছিল তারা, তাতে আরও বহু অঘটন ঘটার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তাদেরও শনাক্ত করা হয়নি। এসব গুজব ছড়ানোতে অনবদ্য অবদান রেখেছে জামায়াত পরিচালিত ‘বাঁশের কেল্লা।’ ফেসবুক পেজটি তাদের নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল থেকে ভিত্তিহীন সংবাদ শেয়ার করে। যার শিরোনাম ‘মধ্য রাতে উত্তপ্ত ঢাবি, ছাত্রীর রগ কাটল ছাত্রলীগ।’ রগকাটার চর্চা ও প্রশিক্ষণ রয়েছে শিবিরের অথচ ছাত্রলীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে রটানো গুজবের আগপাশতলা নিয়ে ছাত্রলীগ নেতারা অদূরদর্শিতার কারণে বুঝতে পারেননি যে, রগকাটার প্রশিক্ষণ তাদের সংগঠনে নেই। পুরোটাই যে শিবিরের প্রচার। তা বোঝার ক্ষমতা ছাত্রলীগের দুর্বল নেতৃত্বের পক্ষে কঠিন ছিল। জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তি এ্যাকাউন্টগুলো গুজব ছড়ানোয় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। বাঁশের কেল্লা নামক জামায়াতী ফেসবুকে লেখা হয়েছে, ‘কোটা বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ভারত’। আবার লেখা হয়, ‘গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে রাতে আন্দোলনকারীদের চাপ দিয়ে লিখিত বক্তব্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ যা সর্বৈব অসত্য। অথচ এসব গুজবকে সত্যি ভেবে নিয়ে ছাত্রলীগের দুর্বল, অধাচীন, অক্ষম, অযোগ্য নেতারা যা করেছেন, তা ভাবা যায় না। তারা জামায়াত-শিবিরের ভ্রান্ত পথে নিজেদের গলিয়ে দিয়ে জঘন্য অপরাধে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ইতিহাস এদের ক্ষমা করবে না।

বর্তমানকালে নিশ্চিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাধারণ মানুষের মনের কথা বলার একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। কিন্তু এই মাধ্যমেই অকারণ সহিংস আন্দোলনের সৃষ্টি বা গণহত্যার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যা দেখেছি, মিয়ানমারের ক্ষেত্রে। রোহিঙ্গা নিধনের অস্ত্র হয়েছিল ফেসবুক। রোহিঙ্গাবিদ্বেষী প্রচারের মধ্য দিয়েই সেখানে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার পাটাতন তৈরি করা হয়। ওই প্রচার কাজে ফেসবুকই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি জনগণের মধ্যে বিরোধ, অশান্তি ও দ্বন্দ্বের মাত্রা বাড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। নিশ্চিতভাবেই বিদ্বেষী প্রচার সেই দ্বন্দ্ব-বিরোধ-অশান্তির একটা অংশ। মার্ক জাকারবার্গ এই তথ্য স্বীকার করে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন।

শুধু গুজব নয়, বাংলাদেশে ফেসবুকে আরও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ফেসবুকে হয়রানি, প্রতারণার হাজার হাজার অভিযোগ। গত বছর অনলাইনে অভিযোগ প্রায় ৬ হাজার। আর রাজধানীর থানায় অভিযোগ ৪০ হাজারের কম নয়। ফেসবুক কেন্দ্রিক নানা ধরনের অপরাধ প্রতিদিনই ঘটছে। কিন্তু সেগুলোর দ্রুত বা বিলম্ব কোন সমাধান হচ্ছে না। থানা পুলিশের পক্ষেও এসব নিষ্পত্তি দুরূহ। বিশেষত তাদের যেমন নেই প্রশিক্ষণ। তেমনি নেই উপযুক্ত যন্ত্রপাতি। ফলে অপরাধের কুল কিনারা হচ্ছে না। আবার অনেকে ফেসবুকে যৌন হয়রানির ঘটনায় থানায় অভিযোগ জানায় না। ফেসবুকেই তা বিবৃত করে। ফলে এসব অপরাধের নিষ্পত্তি ঘটে না। বিটিআরসি ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কাছেও হাজার হাজার অভিযোগ জমা হচ্ছে। কিন্তু সে সবের সুরাহা আর হয় না। ভবিষ্যতে অভিযোগের মাত্রা বাড়তে থাকবে। অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে এই অপরাধ শতগুণ বাড়বে। পরিস্থিতি এখন এমন যে, ফেসবুক নিয়ে নতুন একটি থানা গঠন করা সঙ্গত হয়ে পড়েছে। দেশের সবক’টি জেলায় হতে পারে এই থানা। উপজেলা পর্যায়েও তা বিস্তৃত করা যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমের ভাল দিককে কালিমালিপ্ত যেভাবে করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে। প্রেমে, বিয়ে, আর্থিক লেনদেনে ফেসবুকের মাধ্যমে যে প্রতারণা হচ্ছে তা নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। দূরদর্শিতা যদি সরকারের থাকে, তবে ফেসবুকসহ সাইবার অপরাধ নিরসনে প্রযুক্তিতে দক্ষদের নিয়ে ‘ফেসবুক থানা’ প্রতিষ্ঠা সময়ের প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নির্বাচিত সংবাদ