১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি প্রকাশনার শুরু ও কম্পিউটার জগত

  • রেজা সেলিম

১৯৮৭ সালে মোস্তাফা জব্বারের ‘আনন্দপত্র’ মঈনুল লিপি দিয়ে বাংলায় প্রকাশনার পরে এমনিতেই বাংলা মুদ্রণ শিল্প কম্পিউটার প্রযুক্তিতে অফসেট প্রেসের প্রক্রিয়ায় নিজের জায়গা নিতে শুরু করে দিয়েছিল। এর আগে থেকে ইংরেজী পত্রিকা ‘ঢাকা কুরিয়র’ কম্পিউটারে কম্পোজ করে বের করা শুরু হলে তা ব্যাপক উৎসাহী আলোচনার জন্ম দেয়। কম খরচে দ্রুততম সময়ে প্রকাশনার জন্য মানুষ একে গ্রহণ করতে শুরু করায় বাজারে কম্পিউটারের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ডেস্কটপ প্রকাশনা কাজের উপযোগী ম্যাকিন্টোশ কম্পিউটার তার আকাশচুম্বী দামের জন্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ধারে-কাছেও ছিল না। ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রযুক্তিÑসামর্থ্য, উপযোগিতা, বাজার মূল্য এসব প্রসঙ্গ আলোচনার সামনে চলে আসে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগের পাশে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে কম্পিউটার কম্পোজ ও ট্রেসিং পেপারে অফসেট ছাপার প্লেটের বিকল্প দেখতে আমি আর ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত নাজিমুদ্দিন মোস্তান ভাই গিয়েছিলাম তখনকার প্রেস ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদের আমন্ত্রণে (বর্তমানে ড. আজাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান)। সে সময় বাংলাদেশের ছাপাখানার এই উদ্ভাবনী বিস্ময় ও ড. আজাদের সাহস দেখে আমার ঘোর অনেকদিন কাটেনি!

উচ্চশিক্ষার বাইরে বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে আশির দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশে নানা স্তরে কম্পিউটার চর্চা শুরু হওয়ার পাশাপাশি এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে লেখালেখিও শুরু হয়। দেশের স্বনামধন্য বিজ্ঞান লেখক আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন প্রযুক্তিকে বাংলায় সহজ রীতিতে পরিচিতি দিতে সচেষ্ট ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক রচনা চর্চায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনী কর্তৃক বাংলা ভাষায় প্রকাশিত অগণিত বিজ্ঞান বই আমাদের প্রভাবিত করেছিল, যদিও অনেকে এখন আর তা স্বীকার করতে চান না।

আশির দশকে ‘কারিগর’ নামে আমাদের দেশে একটি প্রযুক্তি বিষয়ক প্রকাশনা জনপ্রিয় হয়েছিল। এরশাদ সরকার যখন কম্পিউটার কাউন্সিল গঠন করে তখন প্রবাসী কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ দেশে এসে কম্পিউটার প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন এদের নিয়ে মাঝে মাঝেই আড্ডা দিতেন ধানম-ি ইউএন ক্লিনিকের দোতলায় সরকারের পরিবেশ বিষয়ক একটি প্রকল্পের অফিসে। এরকম এক আড্ডায় ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে নাজিমুদ্দিন মোস্তান, ছাত্র জীবন থেকেই আমরা তার ভক্ত ছিলাম, যিনি আমাকে নানারকম আড্ডায় নিয়ে যেতেন, আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ‘কম্পিউটার জগৎ’ পত্রিকার জনক আবদুল কাদেরের সঙ্গে। প্রথম পরিচয়েই কাদের ভাই আমাকে বললেন আমার সঙ্গে তার আগে একবার দেখা হয়েছিল আজিমপুর গোরস্তানের গেট লাগোয়া মার্কেটের দোতলায়, কম্পিউটার কম্পোজের একটি দোকানে। বললেন কম্পিউটার জগতের স্থায়ী প্রকাশনা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছেন। ইতোমধ্যে কম্পিউটার জগৎ পত্রিকার বয়স বেশ কয়েক বছর ও উল্লেখযোগ্য অনেক সংখ্যা বেরিয়েছে, যেগুলো তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রতিবেদন, সহজ বাংলায় কম্পিউটার নিয়ে খুঁটিনাটি সংবাদ পরিবেশন ও কম্পিউটার যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশের বিজ্ঞাপনকে আকর্ষণীয় করে পাঠকের সামনে উপস্থাপনার জন্য কম্পিউটার জগতের ভূমিকা ঐতিহাসিক। কাদের ভাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজের মধ্যে একটি ছিল এই প্রযুক্তি কেমন করে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। আর তার সঙ্গে যথাযথ জুড়ি মিলেছিলেন মোস্তান ভাই। তখন কম্পিউটার নিয়ে পরিচিতিমূলক লেখালেখি করে আমাদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছিলেনব ভূঁইয়া ইনাম লেনিন, যিনি পরে ‘কম্পিউটার বিচিত্রা’ নামে একটি প্রকাশনা শুরু করেন। আমার দেখা মতে লেনিন ভাই ও মোস্তান ভাই কাদের ভাইয়ের স্বপ্নকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান। আর কার বেলায় কী হয়েছে জানি না, তবে আমার উন্নয়ন চিন্তা ও কাজের জগতে এই তিনজনের সম্মিলিত লেখালেখি এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন দর্শন আমাকে তৃণমূলে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে এ কথা বলতে আমি গর্ববোধ করি।

১৯৯৩ সালে বুয়েটের সমাবর্তন বা নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রফেসর ইউনূস ‘পথের বাধা সরিয়ে নিন, মানুষকে এগুতে দিন’ শীর্ষক একটি বক্তব্য দেন, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে এক নতুন স্বপ্নের, সম্ভাবনার কথা তিনি উল্লেখ করেন। সারাদেশে এই বক্তৃতা তরুণ সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমার বিশ্বাস, কম্পিউটার জগতে প্রকাশিত জনগণের জন্য কম্পিউটার চাই, দারিদ্র্য বিমোচনে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি বিষয়ক অন্যান্য উন্নয়নমূলক রচনার প্রভাব আর অনেকের মতো তখন প্রফেসর ইউনূসের ওপরেও পড়েছিল।

নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে এসে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশে কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশের ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় এর পেছনেও কম্পিউটার জগতের প্রকাশনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ছিল। প্রথম দিকে গুটিকয়েক কম্পিউটার ব্যবসায়ী পরিবেশক ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন; কিন্তু কম্পিউটার যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজনের জন্য যে উদ্যোগ এলিফ্যান্ট রোড ঘিরে গড়ে উঠে এই দেশে তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের ইতিহাসে তাকে কোনভাবেই গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই। কম্পিউটার জগৎ সেসব দোকানের বিজ্ঞাপন স্বল্পমূল্যে, এমনকি বিনামূল্যেও ছেপেছে। বিজ্ঞাপন বার্তা বলে এক অভিনব সাংবাদিকতার জন্ম দেন মোস্তান ভাই, সে হলো বিজ্ঞাপনের কথাগুলো নিয়েই খুঁটিনাটি সংবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা করা। আর কাদের ভাই সহাস্যে সেগুলো ছাপাতেন। আজকের প্রথম আলোর ‘কম্পিউটার প্রতিদিন’ বলে যে পাতা, এমনকি অন্য সকল দৈনিক পত্রিকায় যে প্রতিদিনের কম্পিউটার সংবাদ থাকে তা কম্পিউটার জগৎ পত্রিকারই প্রভাব। আমার যতদূর মনে পড়ছে, ১৯৯৩ সালে দেশের প্রথম কম্পিউটার মেলা উপলক্ষে কম্পিউটার জগৎ পত্রিকা প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণে বিশেষ প্রচারণামূলক লেখা প্রকাশ করে। নাজিমুদ্দিন মোস্তান ভাই মেলার খবর দিয়ে ‘রাষ্ট্র’ নামে তার নিজের সম্পাদিত পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাও তখন প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে প্রযুক্তি সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন আবদুল কাদের ও নাজিমুদ্দিন মোস্তান। তাদের দেখানো পথেই কম্পিউটার যন্ত্রের ও যন্ত্রাংশের বাজার সম্প্রসারিত হয়ে এই দেশের মানুষের কর্ম ও চিন্তা জগতে ভাগ্য পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে, যার সফল পরিণতি আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প