১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবহেলিত বাঙ্গি

বড় বেশি অবহেলিত নগর জীবনে। অভিজাত রেস্তরাঁ, হোটেল বা বাসাবাড়িতে এর প্রবেশাধিকার বোধহয় একেবারেই নেই। তাদের কাছে সম্ভবত এর কোন কদরও নেই। কিন্তু গ্রামীণ জনপদের বিত্তবান থেকে হতদরিদ্রের কাছে অতি প্রিয়। গবাদিপশুরও প্রিয় খাদ্য। কিন্তু কেন যেন জাতে ওঠার সুযোগটুকু তার হয়নি। অবশ্য চেষ্টার কমতি নেই। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে পানির বিকল্প ভূমিকা রাখে, শরবত হিসেবেও ব্যবহার্য। তবু তার নেই নাম ডাক। হাঁকও দেয় না। এমনকি বাংলা সাহিত্যেও তার ঠাঁই মেলেনি প্রায়। লেখক-কবিরা তাকে চির অবহেলাই করে আসছেন। অথচ দেখতে কদাকার নয়। ফুটবলের মতো, কুমড়ার মতো হলেও দৃষ্টিগ্রাহ্য নয় হয়ত। অতিথি আপ্যায়নে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি মেলে না। এ যেন অপাঙ্ক্তেয়। তাই পাতেও পড়ে না। কাঁচা-পাকা দু’অবস্থাতেই ভক্ষণ করা যায়। কাঁচাকে রান্নায় তরকারি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। গুণপনাহীন একেবারেই নয়। ক্ষুধার্ত জনের ক্ষুধা মেটাতেও সহায়ক ফল-ফলাদির তালিকায় তার নাম নেই, যেমন নেই সবজিতেও। তবে ¯্রফে ফসল এবং অবশ্যই তা অর্থকরী। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এর উপকারিতার প্রমাণটি সামনে চলে আসায় এর প্রতি আগ্রহটা বাড়ছে ক্রমশ। তবে তা মধ্যবিত্ত পর্যায়েই। যে কারণে প্রতিবছর চাষের জমির পরিমাণ বাড়ছে। বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা গড়ে উঠেছে। এভাবে একদিন তারও নাম ডাক হবে নিশ্চয়ই। অভিজাত ও বনেদীদের কাছেও পাবে সমাদর। ইতিহাস বলে, পর্তুগীজদের হাত ধরে এই ফসলটি এ দেশে এসেছে। তরমুজের পাশাপাশি এর চাষ হয়। নামকরণও পর্তুগীজদের। বাংলা ভাষায় তা ঠাঁই পেয়ে গেছে অনায়াসে। তরমুজের যে বিশালকার সমাদর, সে তুলনায় বাঙ্গির কদর বলে কিছু নেই। তবে এখন হচ্ছে, হতে যাচ্ছে। এই ফসলের একটি সুবিধা এই যে, ফরমালিন কিংবা গ্যাস দিয়ে পাকানো হয় না। তাই বিষমুক্ত। এক কথায় বলা যায় ফসলটি সুস্বাদু। এর নানা প্রজাতিও রয়েছে। আকারভেদও পৃথক। ভাল ফলনের জন্য জমিতে নিয়মিত সার, টিএসপি ও পটাশ এবং পোকামাকড় মারার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে এবং পোকামাকড়ের বালাই না থাকায় ফলন ভাল হয়েছে।

অবশ্য দেশের সর্বত্র এই ফসল ফলে না। যে সব এলাকায় চাষ হয়, প্রতিটি স্থানে ফলন হয়েছে ব্যাপক। কৃষকরা এই কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল পাচ্ছে। ফলে বাঙ্গি চাষে আগ্রহ বাড়ছে। অনেক স্থানে আগাম চাষ করে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে কৃষকরা আশানুরূপ অর্থ উপার্জন করেছে, যা সুসংবাদ অবশ্যই। অতীতে এমনও হয়েছে, আবহাওয়া খারাপ থাকায় ফসল যেমন ভাল হয়নি, তেমনি নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছে। চাষাবাদের ব্যয়ও উঠে আসেনি। এবার অবশ্য লাভের মুখ দেখবেন তারা। বিঘাপ্রতি ৬০-৭০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকা। বিক্রি বেশি মানে, চাহিদা বাড়ছে অর্থাৎ বাঙ্গির খাদক বাড়ছে। কৃষকদের জন্য যা সুখবর এবং আশাপ্রদ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে এবার বাঙ্গি চাষ হয়েছে তাই। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বাঙ্গি ফসল ওঠা শুরু হয়েছে। চলবে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত। এসব বাঙ্গিতে কোন প্রকার ওষুধ বা কৃত্রিম কোন কিছু ব্যবহার করা হয়নি।

বাঙ্গি চাষে কৃষকদের জন্য কোন প্রণোদনা দেয়া হয়নি। সুদমুক্ত কৃষি ঋণ পেলে তারা আয়ের পথ সুগম করার পাশাপশি জনচাহিদা মেটাতে পারবে। এ বছর কৃষকরা দামও ভাল পাচ্ছেন। এপ্রিলের পর বাঙ্গি আর মিলবে না। এই ফসল সংরক্ষণ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়নি প্রায়। এর মাধ্যমে নানা ধরনের খাবার তৈরির বিষয়ে গবেষণাও হয়নি। বাঙ্গির প্রতি কৃষিসহ অন্যান্য বিভাগে সুনজর দিলে বাঙ্গিও হয়ত প্রতিদান দিতে পারে। তরমুজ আর বাঙ্গি একই সময়ে বাজারে আসে। কিন্তু বাঙ্গির কদর তরমুজের কাছে কিছু নয়। বাঙ্গি ফসলকে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা-ভাবনা করার সময় বয়ে যায়। এই ফসলকে রক্ষা ও বিস্তারের জন্য যথাযথ উদ্যোগ প্রয়োজন।