১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রানা প্লাজা ধ্বসের পাঁচ বছর

  • মিলু শামস

দু’হাজার তের সালের চব্বিশ এপ্রিল ও তার পরের কয়েকদিন গোটা দেশের মানুষের মনে একযোগে এমন আশা জেগেছিল যে, এবার মালিক শ্রমিকের শ্রেণীদূরত্ব ঘুচে মানবিকতার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। কিন্তু না, ‘সবার ওপর মানুষ সত্য’র কাব্যিক ভাবালুতা উড়িয়ে দিয়ে মালিক রয়েছেন মালিকের জায়গায়, শ্রমিক শ্রমিকের জায়গায়।

নিহত ও আহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের নানা তথ্য খবরের কাগজ সূত্রে আমরা পাই। কিন্তু অপরাধের মূলনায়ক রানা সাহেবের বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতির খবর পাই না। শুনতে পাই জেলখানায় তিনি ভিআইপি মর্যাদায় আছেন। ক্ষতিপূরণের যে মামলা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে করা হয়েছিল এবং উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যে রুল দিয়েছিলেন তার শুনানিও আটকে আছে। রুল শুনানির এক পর্যায়ে উচ্চ আদালত বলেছিলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনা কোন দুর্ঘটনা নয়, অপরাধ। এজন্য আইন অনুসারে দোষী ব্যক্তিদের যেমন ফৌজদারি অপরাধের বিচার হতে হবে, তেমনি দোষী ব্যক্তিদের অপরাধের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’ (প্রথম আলো ২৩ এপ্রিল ২০১৬)। এসবের বাস্তবায়নও দেখা যায়নি। ক্ষতিপূরণের নামে শ্রমিকরা আসলে সাহায্য পেয়েছেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। শ্রমিক নেতারা বলেছেনও সে কথাÑ মূলত যাদের কারণে শ্রমিকের ক্ষতি হয়, ক্ষতিপূরণ তাদেরই দিতে হয়, হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত সেজন্যই দরকার। দরকার এজন্যও যে, সিদ্ধান্ত না এলে ভবিষ্যতে এ রকম আরও দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন না।

স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যে দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ার হার যেমন দ্রুতগতিতে হয়েছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্রেও দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। সন্ত্রাস, নিপীড়ন, সামরিক শাসন আর ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এক সঙ্গে শুরু হলো। সামরিক শাসকদের আমলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুটপাটের সীমাহীন সুযোগ, ভূমি দখল, বিদেশী সাহায্য ও কমিশন ভোগের সুবাদে যে গোষ্ঠীটি দ্রুত সম্পদশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল শাসক শ্রেণীর দলগুলোতে এখন তাদের অবস্থান দৃঢ়। নিজেদের সম্পদ, প্রতিপত্তি বাড়াতে দেশ-বিদেশের নানা শক্তির সঙ্গে আপোস ও সুবিধাবাদের যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া তারা পাড়ি দিয়ে এসেছেন সামরিক শাসন অবসানের পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি বরং বাজারঅর্থনীতি ও তথ্যপ্রবাহের ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে তা আরও বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। এ পথের নানা অলিগলিতে জন্ম নিয়েছে হাজার-কোটি সোহেল রানা। লুটেরা, দখলবাজ, ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে তাদের জন্ম ও বৃদ্ধি।

যে প্রক্রিয়ায় সোহেল রানারা ভূমি মালিক বা বহুতল ভবন মালিক হন সে প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শিউলি, রেশমা, পাখি, শেফালি, রমজানরা ভূমিহীন হয়ে সেলাইকলে নিজেদের ঠিকানা খোঁজেন। তাদের আগমনে বদলে যায় সাভারের চিত্র। স্নিগ্ধ গ্রামীণ আবহে লাগে শিল্পের ছোঁয়া। তবে কারখানার সাইরেনে সাভারের বাতাস কেঁপে উঠলেও মালিক-শ্রমিক আর উদ্বৃত্ত মূল্যের দ্বন্দ্বে সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ স্বাভাবিক পথে এগোয় না। শিল্প বিপ্লবের প্রভাব সমাজ বিকাশের যে ব্যাকরণ শিখিয়েছে তার সঙ্গে মেলে না বাংলাদেশের শিল্প বিকাশের বাস্তবতা। এদেশে পোশাক শ্রমিকদের নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে অজ্ঞতা যতখানি মালিক শ্রেণীর পেশাদারিত্বের অভাবও সম্ভবত ততখানি। নইলে যাদের ওপর ভর করে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের এত সুখ্যাতি বা গ্রহণযোগ্যতা তাদের এমন অমানবিক পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁঁকিতে রেখে কাজ করাতেন না। পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকের সম্পর্ক অনেকটাই কৃত্রিম। রাষ্ট্রের সহায়তায় রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটেছে, প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে অন্যান্য উৎপাদনশীল খাত ভেঙ্গে পড়েছে। আশির দশক থেকেই এদিকে সরকারী মনোযোগ নিম্নমুখী, ব্যক্তি উদ্যোক্তাদেরও তেমন আগ্রহ নেই। আগ্রহ বেড়েছে মার্কেট, সুপার মার্কেট বা বহুতল ভবন নির্মাণের দিকে। একদিকে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে সুপার মার্কেট, বেসরকারী ব্যাংক-বীমা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বেসরকারী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-হাসপাতাল। উৎপাদনশীল খাতের চেয়ে পরিষেবা খাত দেশের অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নিয়েছে।

দেশের শিল্পকারখানা ধ্বংস করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার যে সুযোগ স্বৈরাচারী এরশাদ করে দিয়েছিল সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্বের মনোযোগ কেড়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মূল ভূমিকা রাখছে। তারপরও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। এক সঙ্গে এগারো শ’ পঁচিশ শ্রমিক অপঘাতে মারা যান। অঙ্গহানি হয়ে বেঁচে থাকেন অসংখ্য।

শুধু রানা প্লাজা নয়, স্মার্ট স্পেকট্রাম তাজরীনের মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটেছেÑ যা এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের দায়িত্বহীনতাকেই মূলত চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। চার হাজারের বেশি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন ছত্রিশ লাখের বেশি শ্রমিক, যাদের শ্রমে দেশ পাচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা তাদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। শিল্পমালিকরা উৎপাদন উপকরণের বীমা করান খুবই গুরুত্বের সঙ্গে; কিন্তু এগুলো সচল রাখেন যারা তাদের জীবনবীমা করার তাগিদ অনুভব করেন না। অথচ এ বিষয়ে আইন আছে। আইনে স্পষ্ট উল্লেখও আছে যে, কোন কারখানায় দু শ’র বেশি শ্রমিক থাকলে তাদের প্রত্যেককে গ্রুপবীমার আওতায় আনতে হবে। সম্প্রতি সংশোধিত এ আইনে এখন এক শ’ শ্রমিক কর্মরত থাকলেই গ্রুপবীমা করার কথা বলা হয়েছে। চমৎকার সব আইন, আইনের যুগোপযোগী সংস্কার সবই আমাদের আছে। কিন্তু শ্রমিক বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের ওপর আইনের সেসব ধারা কাজ করে খুবই কম। আইন ভেঙ্গে সহজে পার পায় ক্ষমতাবানরা। যে কোন অপরাধের সাজা এড়ানোর কৌশল তারা জানে। কারণ সব সরকারের সময় তারা থাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে। এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত যতই থাক, এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। শ্রেণীস্বার্থের বেলায় প্রশ্নহীন আপোসে তারা অনায়াসে এক পঙ্ক্তিতে বসে একই সুরে কথা বলেন। তারা জানেন দুর্নীতির যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি এ পর্যন্ত এসেছে তারা তার উত্তরাধিকার বহন করছেন। সুতরাং যত ভয়ঙ্কর ঘটনাই ঘটুক তারা সব কিছুর উর্ধে। এই আত্মবিশ্বাস এগারো শ’ পঁচিশ জন মানুষকে বিকৃত লাশে পরিণত করবেই। গোঁজামিল দেয়া স্থাপনা রানা প্লাজাকে ঝুরঝুরে বালিতে পরিণত করবেই। রানা প্লাজা বাংলাদেশের রাজনৈতিক হঠকারিতা ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের নির্মম ও নৃশংস প্রতীক হয়ে থাকবে।