১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্ত বাণিজ্য ॥ বিচার মানি, তবে তাল গাছটি আমার

  • ড. আরএম দেবনাথ

ছোট বেলায় একটি আপ্তবাক্য ঠাকুরমার কাছে বহুবার শুনেছি। তবে অর্থ বুঝিনি। আপ্তবাক্যটি হচ্ছে- বিচার মানি তবে তাল গাছটি আমার। এর অর্থ এখন বুঝি। বিচার-আচার যাই হোক না কেন, বিচারের রায় আমার পক্ষে থাকতে হবে। নইলে এই বিচার মানি না। কারণ তা বিচারের নামে অবিচার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাবার্তা শুনে তাই মনে হয়। কথাবার্তা মানে ব্যবসা ও বাণিজ্য সম্পর্কিত কথাবার্তা। তার কথায় মনে হয় অবাধ বাণিজ্য (ফ্রি ট্রেড) মানি, তবে এর ফল আমার পক্ষে থাকতে হবে। বাণিজ্য ঘাটতি (ট্রেড ডেফিসিট) হলে চলবে না। বাণিজ্য ঘাটতি হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেই। মজার বিষয় হচ্ছে অবাধ, উন্মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা কিন্তু তাদেরই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রেসক্রিপশন হচ্ছে অবাধ বাণিজ্য। মুক্ত বাণিজ্য। বাধাহীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এক দেশের মাল অন্য দেশে বিনা বাধায় ঢুকবে, বেরোবে। কোন শুল্ক নেই। এসব নিয়মকানুন বেশি দিন আগের নয়। মুক্ত বাণিজ্যের পূর্বেও দেশে দেশে বাণিজ্য হতো। নানা রকম বাধা-নিষেধের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হতো। ঔপনিবেশিক আমলের কথা বলছি না। তখন শক্তিধর দেশগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ দখল করে নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালনা করত। নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থ সেখানে বিবেচ্য ছিল না। এরপর অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একের পর এক দেশ স্বাধীন হতে শুরু করলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থ দেখে বাধা-নিষেধের মধ্যে বাণিজ্য করত। তারা স্ব স্ব দেশের শিল্পের স্বার্থ দেখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি ঠিক করত। বলা যায় এমন একটা অবস্থা হয়েছিল যখন আমরা মনে করতাম আমদানি নয়, সব জিনিস নিজ দেশেই তৈরি করে চলব। স্বয়ংসম্পূর্ণতা (সেলফ সাফিসিয়েন্সি) আর কী! ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতা’ অর্থ মানে এই নয় যে, আক্ষরিক অর্থেই সব দ্রব্য উৎপাদন এবং ভোগ করব। তবে লক্ষ্য হবে যত পারা যায় তত নিজ উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করা। তারপর দেখলাম শুরু হয়েছে ‘বাটার’, বিনিময় বাণিজ্য। বিশেষত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে। স্বাধীনতার পর সমাজতান্ত্রিক দেশে আমাদের পণ্য রফতানি হতো। সমপরিমাণ টাকার মাল ওই সব দেশ থেকে আসত। প্রথম ধরনের বাণিজ্যের অসুবিধা দেখে ‘বার্টার ট্রেড’ শুরু হয়। এতেও আমাদের শান্তি হয়নি। ‘বার্টার ট্রেডের’ও নানা অসুবিধা। সবাই এই ধরনের বাণিজ্য করে না, পছন্দ করে না। তারপর চলল নিয়ন্ত্রিত আমদানি, যার জন্য নিয়ন্ত্রকের নামই ছিল ‘কন্ট্রোলার অব ইম্পোর্ট এ্যান্ড এক্সপোর্ট।’ অর্থাৎ বাণিজ্য হবে নিয়ন্ত্রণের অধীন। যা ইচ্ছা আমদানি, যা ইচ্ছা রফতানি- চলবে না। রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা, শিল্পের সুবিধা-অসুবিধা দেখে আমদানি এবং রফতানি। এভাবে চলল অনেকদিন। বিশ-ত্রিশ বছর পর শুরু হলো অবাধ বাণিজ্যের কথা। ফ্রি ট্রেড। মালামাল গমনাগমনে বর্ডার (সীমান্ত) থাকবে না। মানুষের জন্য নয়, মালের জন্য। বিনা বাধায় মাল এশিয়া থেকে ইউরোপে যাবে, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে। এই বাণিজ্যকে সহায়তা করার জন্য শুরু হলো ‘রিফর্ম’, সংস্কার। সংস্কার আর সংস্কার। ব্যাংক, বীমা সংস্কার। বেসরকারীকরণ। গমনাগমনের বাধা দূরীকরণ। রাস্তঘাট, রেল, বিমান, নৌ ও জাহাজ পথ একীভূতকরণের কাজ। ‘লিবারেলাইজেশন’। সর্বত্র একই আওয়াজ-‘বিশ্বায়ন’। সকল দেশে ব্যাংক চলবে এক নীতিতে, বীমা চলবে এক নীতিতে। তুরস্ক থেকে ট্রেন ছাড়বে সকল দেশ ‘টাচ’ করে মাল যাবে জাপানে-চীনে। বিশাল কা-। ‘গ্যাট’ বাদ দিয়ে তৈরি হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। এরা নিয়ম-বিধি করবে বাণিজ্যের ওপর। ব্যাংক চালানোর নিয়মনীতি করবে ‘ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস’ (বিআইস)। সব কিছু উন্মুক্ত। ‘সাবালক’, ‘নাবালক’ দেশ নেইÑ সবার জন্য এক আইন। কিছুটা ছাড় সাময়িকভাবে দেয়া হলো গরিব দেশগুলোকে। সারা বিশ্ব ভাগ হতে শুরু করল ‘ট্রেডিং ব্লকে’ ‘ফ্রি ট্রেড এ্যারেজমেন্ট’ হতে থাকল দেশে দেশে। ‘ব্লকে’ ‘ব্লকে’। ‘সার্ক’, ‘নাফটা’ ইত্যাদি গড়ে উঠতে লাগল। অভূতপূর্ব পরিবেশ- ব্যবসায়িক পরিবেশ। দেখা গেল ‘উন্নয়ন’ হচ্ছে দ্রুত গতিতে। উন্নয়নশীল ও গরিব দেশগুলো উপকৃত হতে লাগল। বাংলাদেশ পেয়ে গেল রোজগারের দুটো পথ- একদম নতুন পথ। গার্মেন্টস এবং জনশক্তি রফতানি। এশিয়ার অনেক দেশই এই সুযোগ পেয়ে গেল। বিলিয়ন (শত কোটি) বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হতে শুরু করল। দেশগুলো সামনে এগিয়ে যেতে থাকল। বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এশিয়া। রাজনীতির কেন্দ্র বিন্দু হয়ে পড়ল এশিয়া, বিশেষ করে চীন ও ভারত। বিশাল বাজার তাদের। জাপান পেছনে পড়ে গেল। কিন্তু সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশও হতে লাগল উপকৃত। মধ্যবিত্ত তৈরি হলো যাদের ভোগ্যপণ্য দরকার, আরাম-আয়েশের পণ্য দরকার। লাখো কোটি মানুষ এসব দেশে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠল। চিকিৎসার সুযোগ বাড়ল। মানুষের ‘মুভমেন্ট’ বাড়ল। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার বাড়তে থাকল। চারদিকে রমরমা একটা অবস্থা। বৈষম্যের প্রশ্ন বাদ দিয়ে বোঝা গেল বিশ্বে সম্পদ তৈরি হচ্ছে। প্রচুর সম্পদ। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু চলে এসেছে এশিয়াতে। প্রবৃদ্ধিও এখানে। এই অবস্থা চলতে থাকল। কিন্তু তড় সইল না। হঠাৎ বজ্রাঘাত।

বজ্রাঘাতটি আসল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যারা ফ্রি ট্রেডের প্রবক্তা, বিশ্বায়নের গুরু। তারা হঠাৎ করে বলে বসলÑ না, আমরা এতে নেই। বিশ্বায়নের ফলে, অবাধ বাণিজ্যের ফলে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের শিল্প বন্ধ হচ্ছে, আমাদের লোক বেকার হচ্ছে। আমাদের দেশ ভরে যাচ্ছে অবৈধ অভিবাসী দ্বারা। আমাদের প্রযুক্তি চুরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কৃষকদের না খেয়ে মরার মতো অবস্থা হয়েছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছি। অতএব ‘বিশ্বায়ন’ মানি না। অবাধ বাণিজ্য মানি না। ‘বিচার মেনেছিলাম, কিন্তু তাল গাছটা আমরা পাইনি’। ট্রাম্প এসব কথা বলে সারা দুনিয়ার বিরোধিতা, মার্কিনীদের প্রবল বিরোধিতা, মিডিয়ার বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। প্রথমেই আঘাত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তা বাতিল হলো। বিশ্ব জলবায়ু রক্ষণে টাকা দেয়া তারা বন্ধ করে দিল। এতেই ক্ষান্ত হননি তিনি। এবার করলেন কী? চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বেশি। চীনে তাদের রফতানি কম। এক হিসাব দিয়ে বলা হলো, এই বাণিজ্য ঘাটতি ৮০০ বিলিয়ন ডলার। বিলাশ অঙ্কের ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারে কমাতে হবে। কারেন্সি ম্যানিপুলেশন চলবে না। প্রযুক্তি জোর করে ‘চুরি’ করা যাবে না। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা যাবে না টেকনোলজি ট্রান্সফার করতে। শুধু দাবি নয়, কিছুদিন আগে যুুক্তরাষ্ট্র ইস্পাত ও এ্যালুমিনিয়ামের আমদানির ওপর ২৫ ও ১০ শতাংশ ‘ট্যারিফ’ বসিয়েছে। এসব মাল চীন থেকে আমদানি কমানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। এর পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। বিশ্ব বলছে এটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এমনিতেই হ্রাস পেয়েছে অনেক আগেই। তারা তাদের বাজার সম্প্রসারণ করার জন্য ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নীতি গ্রহণ করেছে। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার ইত্যাদি দেশে তারা প্রচুর ঋণ দিয়ে তৈরি করছে অবকাঠামো। আফ্রিকাতেও তারা অনেক ঋণ ছড়াচ্ছে। এসব ভারত পছন্দ করছে না। ভারতের সঙ্গে চীনের ঠোকাঠুকি শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে। ‘ডুকলাম’ তার উদাহরণ। চীনের এই সম্প্রসারণবাদী নীতিতে জল ঢেলে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী নীতি চীনকে টার্গেট করে তৈরি হয়েছে। চীন হঠাৎ করে ভারতকে টানতে চাইছে। এ সপ্তাহেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনে যাচ্ছেন অনানুষ্ঠানিক ‘সামিট’ করার জন্য। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এখন (২৪ এপ্রিল) চীনে। দেশরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারমন চীনে যাচ্ছেন। সীমান্ত বিরোধ, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সন্ত্রাস ইত্যাদি আলোচনার জন্য। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য এক নম্বরে। চীনের সঙ্গে ভারতের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি। ভারত এর নিরসন চায়। দেখা যাচ্ছে চীন-ভারত সম্পর্কেও বাণিজ্য ঘাটতি একটি বড় বিষয়। এর অর্থ কী? উদার বাণিজ্যে যে যার মতো পণ্য আমদানি-রফতানি করবে। বাধা নেই। যার শক্তি আছে সেই জিতবে। দেখা যাচ্ছে অন্য ঘটনা। উদার বাণিজ্যেও ‘বাণিজ্য ঘাটতি’র বিষয়টি বড় হয়ে উঠছে। মুশকিল হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি অনেক দেশেরই আছে। আমাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে। আবার আমাদের ঘাটতি চীন ও ভারতের সঙ্গে। এটাও আমাদের কাছে আলোচনার বিষয়। অন্যান্য দেশেরও তাই। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? অবাধ বাণিজ্যের নীতি কী প্রচ- বিরোধিতার মুখে? বিশ্ব কী ট্রেড ওয়ারের মুখোমুখি? যদি তাই হয় তাহলে আমাদের করণীয় কী? এর মধ্যে কী আমাদের মতো দেশগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে? বিচার মানি, তাল গাছটি আমার- এই যদি হয় নীতি, তাহলে অবাধ বাণিজ্যের ভবিষ্যত কী? দেশে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি কী শেষ পর্যন্ত অবাধ বাণিজ্যের পরিবেশকে ভ-ুল করে দেবে?

লেখক : সাবেক শিক্ষক, ঢাবি