১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোটা সংস্কার আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত

কোটা সংস্কার আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনের দাবিতে করা আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা সাতটায় আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের মধ্যদিয়ে আন্দোলন চলবে। তবে রাজপথ অবরোধ করা হবে না। এদিকে সোমবার শাহবাগে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে আন্দোলনকারীরা।

তারা রাস্তা বন্ধ করে দেয়ায় রীতিমত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল শাহবাগসহ তার চারদিকের অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকা। তীব্র যানজটে নাকাল হয়ে পড়েছিলেন নগরবাসী। আন্দোলনকারীরা কোন কোন এলাকায় জরুরী সেবাদানের কাজে নিয়োজিত যানবাহনকেও চলাচল করতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বারডেম, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরী চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হয়েছে। আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। আশপাশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রীতিমত অচল হয়ে পড়েছিল।

সোমবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন জনকণ্ঠকে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জনকণ্ঠকে আরও জানান, ইতোপূর্বে রাতে আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। গুজবসহ নানা বানোয়াট মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ছাত্র মৃত্যুর গুজবের জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাংলোতে হামলাসহ অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তৃতীয় কোন পক্ষ যাতে আর সুযোগ নিতে না পারে, এজন্য আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে।

তবে মঙ্গলবার আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচী পালনের কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া শান্তিপূর্ণ অবস্থান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। তবে আন্দোলনের নামে রাজপথ অবরোধ করা হবে না।

এরআগে সোমবার সকাল দশটা থেকেই কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে আন্দোলনকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় একত্রিত হতে থাকে। বেলা এগারোটার দিকে শতাধিক আন্দোলনকারী প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অবস্থান নেয়। পরে তারা শাহবাগ মোড়ে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে রাস্তা বন্ধ করে বসে অবস্থান নেয়। আচমকা এমন ঘটনায় সেখান দিয়ে যাওয়া যানবাহন আটকে যায়। পরে পুলিশ আটকে পড়া যানবাহন আস্তে আস্তে বের করে দেয়। তারপরেও বহু যানবাহন বিকেল পর্যন্ত আটকে ছিল।

শাহবাগের মাঝ রাস্তায় অবস্থান নেয়ার কারণে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখান দিয়ে সব ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে কাঁটাবন, নীলক্ষেত মোড়, কক্সীবাজার মোড়, পলাশী মোড়, চাঁনখারপূল, মৎস ভবন, হাইকোর্টের সামনেসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগের দিকে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এর আশপাশের সব রাস্তায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের। অফিস শেষে মানুষ হেঁটে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ রাস্তা কোন যানবাহন ছিল না। অনেক চালকরা জানান, তারা ভাংচুরের আশঙ্কায় অন্য রাস্তায় গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন।

আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মডেল থানার সামনে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, বারডেম হাসপাতালের সামনে, ঢাকা ক্লাবের সামনে ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল (শেরাটন) হোটেলের সামনে অবস্থান নেয়। এসব পয়েন্টে আন্দোলনকারীরা উন্নয়নমূলক কাজে এলাকার নির্ধারণের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ডিভাইডার ফেলে বেরিকেড দেয়।

এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় থাকা পুলিশের ব্যবহৃত কাঁটাতার নিজেরাই টেনে এনে রাস্তা বন্ধ করে। রাস্তা বন্ধ করার পর আন্দোলনকারীরা নিজেরাও সেখানে অবস্থান নেয়। এসব রাস্তায় কোনপ্রকার যানবাহন প্রবেশ করতে দেয়নি। অনেক জায়গায় আন্দোলনকারীরা পথচারীদেরও যেতে বাঁধা দেয়।

সাবেক শেরাটন হোটেল, ঢাকা ক্লাব, জাতীয় যাদুঘরসহ আপপাশের রাস্তা বন্ধ করে দেয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসাপাতালের রোগী ও তাদের স্বজনরা পড়েন মহাবিপাকে। এর প্রভাব পড়ে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনরা। অনেকেই চিকিৎসা না নিয়েই চলে গেছে। চিকিৎসা নিতে আসা অনেকেই জানিয়েছেন, ইতোপূর্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে ভয়াবহ দাঙ্গাহাঙ্গামার ঘটনা ঘটিয়েছে আন্দোলনকারীরা, তাতে নিরাপদে বাড়ি ফেরত যাওয়াই ভাল। যেকোন সময় আগেরবারের মত ভয়াবহ পরিবেশ হওয়া বিচিত্র নয়। শাহবাগসহ আশপাশের এলাকা বন্ধ করে দেয়ার কারণ পুরো ঢাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের।

রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলনের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আন্দোলনকারীদের জনদূর্ভোগের বিষযটি বুঝানোর চেষ্টা করেছি। দেরিতে হলেও তারা বুঝতে পেরেছে। তারা আন্দোলন স্থগিত করেছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত। এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ।

গত ৮ এপ্রিল রাতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূত্রধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ওইদিন রাতেই পুলিশের গুলিতে ছাত্র মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে আন্দোলন আরও মারমুখী করা হয়। এমন ঘটনায় ভিসি পুলিশকে উস্কে দিচ্ছে বলেও পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হয়। তারই ধারাবাহিকতায় অন্তত সুপরিকল্পিতভাবে ওইদিনই রাত দেড়টার দিকে অন্তত পাঁচ শতাধিক লোক ভিসির বাসভবনে ঢুকে ভেতরে ইতিহাসের জঘন্যতম হামলা চালায়। বাংলোর সব ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। এক মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষকের গাড়িসহ দুইটি গাড়ি এবং ভিসির দুইটি গাড়িও পুড়িয়ে দেয়। ভিসির বাসভবন থেকে টাকা পয়সা স্বর্ণালঙ্কার, মাছ মাংস লুটে নেয়।

এমন ঘটনার পর গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কড়া নির্দেশ দেন। সংঘর্ষের ঘটনায় শাহবাগ মডেল থানায় দায়েরকৃত চারটি মামলা তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ। ইতোমধ্যেই কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পরদিন রাতে এক ছাত্রীর রগ কেঁটে দেয়ার গুজব ছড়ানো হয়। তার জেরে ছাত্রলীগের কবি সুফিয়া কামাল হল শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি

ইফফাত জাহান এশাকে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগঠন থেকে বহিস্কারের পাশাপাশি মারধর করে হল থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে যা মিথ্যা বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকার হটাও আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকার বিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে লাশ ফেলে দেয়ারও চেষ্টা করেছিল বলে পরবর্তীতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে আসে।