১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

গত সপ্তাহে বলেছিলামÑ ঢাকা তার ছন্দে ফিরেছে। সেটি ছিল জনকোলাহল বিবেচনায়। বেশ কয়েকটা দিন ঢাকা ফাঁকা থাকার পর আবার ভরে ওঠায় পুরনো ছন্দে ফিরেছিল ঢাকা। চলতি সপ্তাহে বলতে পারি যে, ঢাকা তার ছন্দে ফিরছে হঠাৎ হঠাৎ। এটি আবহাওয়াজনিত ছন্দ। বেশ কয়েকদিন দিনে বা রাতে ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার নিয়ম ভেঙে শনিবার ছিল পুরোদস্তুর বৈশাখী রোদ্দুর। গরমে তেঁতে উঠেছিল ঢাকা। বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে অনুপস্থিত থাকার পর দিনভর সূর্যের উপস্থিতির কারণে দাপুটে রোদ্দুরের দেখা পেয়েছেন নগরবাসী। তবে মানতেই হবে এবারের বৈশাখে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন ঢাকার মানুষ। আর এই অভিজ্ঞতার ব্যতিক্রমী বিবরণও এসেছে সংবাদপত্রের পাতায়। সেটি হলো দিনের বেলায় সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসা। অনেক আগে একবার দিনের বেলা সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছিল। সে সময় পাখিরাও ডেকে উঠেছিল সন্ধ্যা হয়ে গেছে মনে করে। এ বছর চলতি বৈশাখ মাসেও কয়েকটি দিন দিনের বেলা আঁধার নেমে আসাটা ছিল যেন সেই সূর্যগ্রহণের মতোই। বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তিকর, মানতেই হবে। হেড লাইট জ্বালিয়ে দিনের বেলা গাড়ি চললে একটু চমক লাগে বৈকি।

আগাম বৃষ্টি ও খুঁড়ে রাখা রাস্তা

রোববার বৃষ্টির পর পান্থপথের চকচকে ঝলমলে সড়ক আর অট্টালিকার পাশে সুবাস্তু টাওয়ার সংলগ্ন গলিপথের ছবি একজন পোস্ট করলেন (দেখুন)। মাত্র আধাঘণ্টার মাঝারি বৃষ্টিপাতে একেবারে ভরাডুবি অবস্থা। ভারি বৃষ্টিতে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমেয়। বছরের পর বছর একই রকম। ‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’ বুঝি একেই বলে।

ঢাকায় যে এলাকাতেই যাই না কেন, গুলশান বা লালমাটিয়া, উত্তরা বা ধানম-িÑ কোথাও না কোথাও খুঁড়ে রাখা রাস্তা নজরে পড়ছেই। বৃষ্টির কারণে কাদা ও জমে থাকা পানিতে রাস্তা চলাচল বড়ই বিড়ম্বনাময় ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন ও মেরামত কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়ার বিকল্পও তো নেই। আগাম বর্ষা না হলে খটখটে বৈশাখ- জৈষ্ঠ্য মাসে এসব কাজের সিংহ ভাগ হয়তো সম্পন্ন হতে পারত। এখন বৃষ্টির কারণে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ফলে নগরবাসীর ভোগান্তিতে থাকার সময়সীমাও বাড়ছে। একই সঙ্গে ঢাকার এত বেশি রাস্তার খনন কাজ সম্ভবত আগে কখনো দেখিনি। তার ওপর ঢাকার জনসংখ্যাও তো বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়ছে। তাই এইসব খোঁড়াখুঁড়ি আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে নগরবাসীর কাছে। এর ফলস্বরূপ রাস্তাগুলোয় দীর্ঘ সময় ধরে যানজট লেগেই থাকছে। এখন শুক্রবার দুপুরেও পথে নেমে শান্তি নেই। যানজটের কবলে পড়তেই হবে।

দুই বছর দুই মাস আগে ঢাকায় একযোগে ৭০০ রাস্তা খোঁড়ার সংবাদ দিয়েছিল একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে। তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে যে সংবাদটি পেলাম তার অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করছি। এতে পাঠকরা সহজেই বুঝে উঠতে পারবেন আমরা এগুচ্ছি না পিছোচ্ছি। প্রতিবদনটিতে বলা হয়েছে :

‘সাত শতাধিক সড়কে একযোগে খোঁড়াখুঁড়ি, বিপাকে রাজধানীবাসী। রাজধানী ঢাকার ছোটবড় সাত শতাধিক সড়কে একযোগে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। ধুলোবালি ও যানজটে দুর্বিষহ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী। এ ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বর্ষার আগেই কাজ শেষ করার আশ্বাস দিলেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র। তবে সেবা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি উন্নয়ন খরচও কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। বর্ষার আগে ওয়াসা, তিতাস, ডেসকো ও সিটি করপোরেশনের মতো সেবা সংস্থার কাজই যেন রাস্তা খোঁড়া। বিক্ষিপ্তভাবে ঢাকার ছোট বড় বিভিন্ন সড়কে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীন কর্মযজ্ঞে উন্নয়নের সুফল ভোগ করার চেয়ে বিড়ম্বনাই যেনো বেশি। একেকটি রাস্তায় দীর্ঘদিন ধরে কেটে রাখায় যানজট ও ধুলোবালিতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। এদিকে সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে বর্ষার আগেই কাজ শেষ করার কথা জানান নগর-পিতা। তবে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করলে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।’

আশ্চর্য! এ কথাগুলো এখনও দেখছি কী প্রাসঙ্গিক।

গাছ-চাপায় ফের অকালমৃত্যু

রাজধানীতে গাছ চাপা পড়ে প্রথম মৃত্যুর সংবাদটি শুনে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। রিক্সায় যাচ্ছিলেন চিত্রশিল্পী ও চিত্রগ্রাহক খালিদ মাহমুদ মিঠু। ঝড়-বাদল নেই, আচমকা একটি বিরাট গাছ ঢলে পড়লো তার শরীরের ওপর। ঘটনাস্থলেই মিঠু মারা গেলেন। গত সপ্তাহে একই এলাকা ধানম-িতে সরকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান হাঁটার সময় গাছ চাপা পড়ে নিহত হলেন। এ সময় কোন ঝড় হচ্ছিল না, কিংবা বৃষ্টিও ছিল না। ২০১৬ সালের শুরুতে গাছ চাপায় মিঠুর অপমৃত্যুর পর এই কলামে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছিলাম যে, ‘সড়ক পাশের মরণাপন্ন গাছগুলো অপসারণের দায়িত্ব পালন করলে আমরা এই অকালমৃত্যু হয়ত এড়াতে পারতাম। একটি নগর গড়ে ওঠে কিছু নীতি, রীতি ও পরিকল্পনাকে কেন্দ্র রেখে। সেই নগর রক্ষণাবেক্ষণেও ব্রতী হতে হয় কর্তৃপক্ষকে। নগরের বহু স্থানেই চুরি করে কিংবা নামমাত্র অজুহাতে বৃক্ষনিধন উৎসব চলে। জলজ্যান্ত গাছগুলোকে হত্যা করা হয় শুধু অর্থলোভ থেকে। অথচ যেসব গাছ ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে, যেমন ধানম-ির ওই কৃষ্ণচূড়া, ভূমিশয্যা গ্রহণের আগে তার শুশ্রƒষা কিংবা অপসারণের কোন পরিকল্পনাই নেই সিটি কর্পোরেশনের। গাছ আমাদের প্রাণ রক্ষাকারী। তাকে প্রাণ হন্তারকের ভূমিকায় বাধ্য করার জন্য আমরা কোন আদালতে বিচার চাইব?’

দু’বছর পরেও কি আমাদের একই কথা লিখতে হবে! আমরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছি না কেন?

ঝড়ে গাছ পড়ে, এটা স্বাভাবিক। আবার অস্বাভাবিক হলো ঝড় না হলেও শতবর্ষী গাছও উপড়ে পড়তে পারে। এমনিতেই ঢাকায় বৃক্ষরাজি কমে আসছে, তার ওপর বয়সী গাছ উপড়ে পড়া বড় ধরনের ক্ষতি। তাছাড়া গাছ ও পাখি মেশামেশি হয়ে থাকে। গাছের অপমৃত্যু মানে পাখিরও আশ্রয়হীন হয়ে পড়া। ঢাকার ঝড়ে পাখির নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। আবার ভাঙা গাছের চাপায়ও কিছু পাখি মারা যায়।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, উদ্যান ও পার্কে ঝুঁকিপূর্ণ গাছের সংখ্যা কয়েক হাজার। শুধু ঝড়ের সময়েই নয়, শিকড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে যে কোন সময় ভেঙে পড়তে পারে এসব গাছ। কোন কোন গাছ এতটাই পুরনো যে, এইসব গাছের গুঁড়ির অধিকাংশই ফাঁপা হয়ে গেছে। শুকনো খরতাপের দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত চত্বরে কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে পড়ার কথা আমরা শুনেছি। হুট করে বিশাল বৃক্ষ উপড়ে পড়লে মারাত্মক বিপদ ঘটতে পারে। গত বছর চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন সড়কে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে নিহত হয়েছেন এক মোটরসাইকেল আরোহী। ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাথের ধারে থাকা গাছের শিকড়ের সঙ্গে মাটির সংযোগ খুবই কম। ইট ও কংক্রিট দিয়ে ঘেরা এসব গাছ যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন রয়েছে মাটি থেকে। তাছাড়া উন্নয়নমূলক কাজে প্রায়শই কাটা পড়ে যায় গাছের শেকড়, সরে যায় গোড়ার মাটি, দুর্বল হয়ে পড়ে গাছের ভিত্তি। তাই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, উদ্যান ও পার্কের পুরনো বা হেলে-পড়া গাছ চিহ্নিত করে তা অপসারণের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী। বৃক্ষবিশারদরা বলেন, গাছ লাগাবার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন জনবহুল স্থানে বট-অশ্বত্থ, কৃষ্ণচূড়া বা রাধাচূড়া জাতীয় গাছ লাগানো না হয়। কারণ এসব গাছের শেকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে না।

কাকের ঠোঁটে নবজাতক!

এই কলামের নিয়মিত পাঠকদের মনে থাকতে পারে ‘জন্মেই গোরস্তানে’ শিরোনামে একটি লেখায় রাজধানীর ভাটারার একটি পারিবারিক গোরস্তান থেকে এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করার বিষয়টি তুলে এনেছিলাম। লাশটি একটি গেঞ্জি দিয়ে মোড়ানো ছিল। নবজাতকটির হাত, নাক ও মুখের মাংস কুকুর বা অন্য কোন প্রাণীর পেটে যায়। স্থানীয় পুলিশের ধারণা ছিল মধ্যরাতে নবজাতকটিকে গেঞ্জিতে পেঁচিয়ে কবরস্থানে ফেলে যাওয়া হয়। এই নিষ্ঠুর রাজধানীতে কিছুকাল পরপরই আমরা এমন নবজাতক হত্যার খবর শুনি। একবার মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ এলাকার ন্যাম ভবনের ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন নর্দমার পাশ থেকে নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। সদ্য জন্মগ্রহণের চিহ্নসহ লাশটি ছিল একটি কাগজের কার্টনে। শিশুটি পৃথিবীতে কি মৃত হিসেবেই এসেছিল, নাকি জন্মের পর মারা গেছে? মারা গেছে, নাকি মেরে ফেলা হয়েছে! এমন আরও কিছু শ্রাব্য-অশ্রাব্য কথাবার্তা কি খুব অসঙ্গত বলে মনে হবে? যাহোক, পাঠকের মনে থাকতে পারে পরিত্যক্ত নবজাতককে উদ্ধার করার কাহিনী। বস্তার ভেতর থেকে বের করে কুকুরের দল শিশুটির ঠোঁট, নাক ও বাম হাতের দুটি আঙ্গুলের ডগা থেকে খানিকটা অংশ খেয়ে ফেললেও মারা যায়নি সে। পুরনো বিমানবন্দরসংলগ্ন রানওয়ে মাঠে চার-পাঁচটি কুকুরের সামনে থেকে ওই নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিক শুশ্রƒষায় সেরে ওঠে শিশুটি, তার নাম রাখা হয়েছে ফাইজা। পরে তার নতুন ঠিকানা হয় সমাজসেবা অধিদফতরের ‘ছোটমনি নিবাসে’। এতসব কথা মনে পড়ছে গত সপ্তাহে ঢাকায় আরেকটি এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এবার অকুস্থল মোহাম্মদপুর। ডাস্টবিনে পড়ে থাকা নবজাতক মেয়ে সন্তানটিকে কাকের মুখ থেকে উদ্ধার করেন এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। শিশুটিকে বাঁচানো গেছে।

প্রতিটি নতুন শিশুর জন্মগ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে এক জোড়া মানব-মানবী। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক, তারা জনক-জননী। অথচ তাদের অনেকেই তাদের সন্তানের জন্মক্ষণেই পরিত্যাগ করেন, তার মৃত্যুই চান! নিজেদের রক্ষার জন্য নিজ সন্তানের মৃত্যু! কিসের রক্ষা? লোকলজ্জার ভয় থেকে? এই পৃথিবীতে যত প্রজাতির প্রাণী রয়েছে সেসবের মধ্যে একমাত্র মানুষের পক্ষেই সম্ভব সদ্যজাত সন্তানকে মৃত্যুপুরিতে নিক্ষেপ করা। একটি হায়েনা কিংবা একটি কুকুর বা কোন শকুন কি কখনও তার সদ্য জন্মগ্রহণকারী শাবকটিকে ছুড়ে ফেলে! ঢাকায় আঁস্তাকুড়ে, নর্দমায় বা গোরস্তানে নবজাতককে ফেলে দেয়ার বিষয়টিকে আমরা উপেক্ষা করে যেতে পারি না। এটি স্বার্থপর মানুষের এক অজ্ঞাত মানসিক অবস্থা, তার চূড়ান্ত বিকার। এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে! যে নগরে বা যে সমাজে মানুষ তার সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানকে অস্বীকার ও নোংরা ন্যাকড়ার মতো পরিত্যাগ করতে পারছে, সেই নগর বা সমাজেরও কি কোন দায়ভাগ নেই এতে? কালক্রমে সদ্যমৃতের তালিকায় উঠে যাচ্ছে মানুষের বিবেক, তার মনুষ্যত্ব।

১৩ মে ২০১৮

marufraihan71@gmail.com