২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শর্শদির নিমতলী বাড়ির ছেলেটি

  • নুরুন্নাহার শিরীন

তাঁকে দেখেছি শিশু বেলায় আমার বাবার মামার বাড়িতে। সেই গাঁয়ের নাম শর্শদি। সেখানে আমার বাবার মামার বাড়ির নিমতলী বাড়িতে প্রায়শ আমরা বেড়াতে যেতাম। নিজের দাদাকে চোখে দেখার ভাগ্য হয়নি। বাবার মামাকে নিজের দাদা জেনেছি। দাদা আদর করতেন নিজের নাতনির অধিক। দাদা-দাদি উদার মনের ছিলেন। দু’জনেই ছিলেন বইপ্রিয় মানুষ। দাদার বিশাল সংগ্রহ ছিল বইপত্রের। স্কুলের একটু বড় ক্লাসে পড়াকালীন ছুটিছাটায় দাদার বাড়ি শর্শদিতে যাওয়ার সে এক বড় আকর্ষণ ছিল আমার তাকভর্তি হাজার বইপত্রের জন্য। বড় চাচার আম্মা দাদিমা কিছু বলতে গিয়ে যখন-তখন কবিতা, শ্লোক আউড়াতেন। লিখতেন। আমরা শুনতাম অবাক হয়ে। দাদার বাড়িটা বিষম ছিমছাম তুমুল সবুজ-হলদে গাছ-গাছালিতে ছাওয়া ছিল। আমরা রেলগাড়িতে যেতাম। নামতেই অনেক দূর হতেই দাদার নিমতলী বাড়িটা লাগত ছবির মতো। দাদার বাড়ির চিলতে বারান্দায় ঝোলানো ছিল কবিগুরুর বিখ্যাত চার লাইন :

‘বহুদিন মনে ছিল আশা

ধন নয় মান নয় একটুকু বাসা’

আমার বড় বেলায় কী যে দারুণ লাগত সেখানে বসে থাকতে! চাচা-ফুফুরা অসম্ভব আদর করতেন। তো, শিশু বেলার কথা তো আবছা-ঝামসা মতো, এখন বড় বেলার স্মৃতিগুলো চলচ্চিত্রের মতোন। আজ চোখের সামনে সে সব ছবি ভাসছে আর কাঁদিয়ে দিয়ে ঘুরে-ফিরেই সব ঝাপসা করে দিচ্ছে। আমার বাবার বাড়ি কুমিল্লার দারোগা বাড়িতে দাদা-দাদি-চাচা-ফুফুদের কলকাকলিমুখর দিনগুলো যে কতশত আনন্দের বেদনার মিশেলে ভর্তি সে সব লিখে ফুরাবার নয়।

সেই সময় সম্ভবত শর্শদিতে অথবা ফেনীর হাই স্কুলগুলো দাদার বিশেষ পছন্দ ছিল না। তাই বড় চাচার হাই স্কুলে ওঠার পর বড় চাচাকে দাদা পাঠিয়ে দেন আমার বাবার মায়ের কাছে, আমার দাদি বড় চাচার ফুফুর-ফুফার তত্ত্বাবধানে হাই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তখন থেকে কবি বেলাল চৌধুরীর বহির্জগত চেনার পালা। এসব কাহিনী দাদা-দাদির মুখে শোনা। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি একটু বড় হওয়ার পর তখন থেকে জেনেছি আমার বাবার ভাই বলতে- বাবার মামাত ভাইয়েরা। আমার বাবার নিজের ভাই ছিল না বলে মামাত ভাইয়েরা আপন ভাইয়ের অধিক ছিল। আমরা তাই উনাদের ছেলেবেলা থেকে ডেকেছি ‘বড় চাচা, মেজ চাচা, সেজ চাচা, ছোট চাচা’ হিসেবে।

বড় বেলায় যখন দেখেছি বড় চাচাকে তখন থেকে অসাধারণ তিনি ছিলেন আদর্শ আমার। অভিভাবকসুলভ আবার উদার স্নেহময় একটা সন্মোহনী শক্তিতে ভরপুর তরুণ তিনি তখন। কত কী দারুণ শব্দে আমাদের তাক লাগিয়ে দিতেন। হঠাৎ নতুন ধরনের খাবার কিনে টেবিলে রেখে আমাদের ডাক দিতেন- বলতেন- বল তো কী নাম এটার? আমরা ভাই-বোনেরা এক একটা নাম বললে বড় চাচা কী সুন্দর হেসে নতুন একটা নামকরণ করতেন। তারপর তো তিনি হঠাৎ একদিন কাউকে কিচ্ছুটি না বলে ঘরছাড়া হলেন। সে এক নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়। স্বাধীনতার পর যখন সদ্য কলেজ ছাত্রী হয়েছি সেই সময় দাদা একটা ঠিকানা দিলেন। বললেন, একটা চিঠি লিখতে সেই ঠিকানায় বড় চাচাকে। যদ্দুর মনে পড়ছে- আমি অনেক ভেবে লিখেছিলাম-

প্রিয় বড় চাচা,

সালাম জানবেন। আমরা বহু বছর আপনাকে দেখি না। দাদির শরীর ভেঙ্গে পড়েছে আপনাকে না দেখে দেখে। এখন আপনার বাড়িতে ফেরা উচিত। না হলে হয়ত আর নিজের মা কে দেখবেন না। আপনি তেমন ছেলে হতেই পারেন না- এ আমাদের বিশ্বাস। আমরা এখন অনেক বড় হয়েছি। আমি কলেজে ভর্তি হয়েছি। সব বুঝতে পারি। আপনি বাড়ি ফিরলে দেখবেন- মনের অভিমানের পাহাড় এক নিমিষে কেমন উধাও। আশা করি এ চিঠি অবহেলা করার সাধ্য হবে না আপনার। দাদির মনোবেদনার কারণ যে শুধু আপনি সেতো আপনি নিশ্চয় বোঝেন। আপনি বাড়ি ফিরে আসলে আপনার মায়ের সকল অসুখ সেরে যাবেই যাবে- মায়ের দোয়া আপনি মিস করবেন না- আমাদের এটাই বিশ্বাস। আপনি বাড়ি ফিরলে আপনার মায়ের হাসিমুখখানি দেখলে আপনি কত যে আনন্দ পাবেন- মা-ছেলের তেমন মুহূর্ত আমরা কল্পনা করছি শুধু এখন। প্লিজ বড় চাচা, এ চিঠি পেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসুন...

ইতি -

আপনারই স্নেহধন্য শিরীন, হাসিন, মুনির।

আমাদের তিন ভাইবোনের নামে লিখেছিলাম চিঠিটা দাদার পরামর্শে। অবাক কা এই যে- অল্প ক’দিন পর জবাব আসে চিঠির। বড় চাচা নিজের সুন্দর হাতের লেখনীতে জবাব দিয়েছিলেন চিঠির। আজও আমার মনে চিঠির অভুতপূর্ব সম্বোধন চোখের সামনে ভাসছে-

স্নেহের মা শিরীন, হাসিন, বাবা মুনির,

তোমরা আমাকে এমন করে লিখতে পার ভাবিনি। সত্যি তাহলে তোমরা অনেক বড় হয়েছ। আনন্দে আমার চোখে জল এসেছে চিঠি পড়তে গিয়ে। বারংবার পাঠ করছি তোমাদের চিঠিটা। তোমাদের বড় চাচাটা অপরাধী হয়েছি তোমাদের কাছে, মায়ের কাছে, বাবার কাছে। এবার নিশ্চয় ফিরব সহসাই তোমাদের দেখতে, মা কে দেখতে হৃদয় আমার ছটফট করছে। আসছি অচিরে।

ইতি -

তোমাদের স্নেহানুরক্ত বড় চাচা

তারপরের ইতিহাস এই যে- কবি বেলাল চৌধুরীর অতঃপর এক যুগের নিরুদ্দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন- মায়ের ইচ্ছাপূরণ- আমাদের বড় চাচাকে দেখে দেখে সাধ না মেটা- এমন বড় চাচা পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। শত স্মৃতির ছবি আমাকে তাড়িয়ে ফিরছে আজ। আমার স্কুল বেলায়, কলেজ বেলায়, আমি একটু আধটু কবিতা লিখতাম বলেই কী না জানি না আমি ছিলাম একটু বিশেষ প্রিয় বড় চাচার। কত বই যে দিতেন আমাকে। তাঁকে এবং আরও দু’জন বন্ধুকে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমার স্বপ্ন’ উৎসর্গ করেছিলেন, নিজের হাতে লিখিত সইসমেত। সেই বইটি বড় চাচা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন- ‘তামাকে দিলাম। পড়ে দেখবে ভাল লাগবে।’ সেই ভালালাগাটি আজও সেরকম রয়েছে হৃদয়জুড়ে। আমার বিবাহ নিয়েও বড় চাচার বড় ভূমিকা রয়েছে। সেই কথাটি প্রায়শ আমার স্বামী স্মরণ করিয়ে দেন। বিয়ের পর প্রথমবার ঢাকায় এসেই আমি বড় চাচাকে ফোনে জানালে তিনি তখন সেই সময়কার রবিবার ছুটির দিনে দুপুরে আমাদের উনার বাসায় দাওয়াত দিলেন। আমরা গেলাম মিষ্টির বাক্স নিয়ে। চাচি তো মহাখুশি হলেন। আমি একটু পরে বুঝলাম যে দাওয়াতের বিষয়ে বড় চাচা চাচিকে বলতে ভুলেই গেছেন। চাচি তো ভাল মানুষ ছিলেন বুঝতে দিতে চাননি একটুও বড় চাচার ভুল। অনেক পরে বাড়িতে ফিরে বড় চাচার মনে পড়ল আমাদের দেখতে পেয়ে। তখন লজ্জিত একটা হাসি দিলেন। সে হাসি মধুর এতটাই আমরা চাচিসহ হাসছিলাম। আজ সেসব কেবলই মধুরতম স্মৃতি।

তখন চট্টগ্রামে একটা বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গেছেন বড় চাচা। যেহেতু আমি তখন চট্টগ্রামে বসবাস করছি বিবাহ সূত্রে- বড় চাচা কয়েকজন সঙ্গীসমেত আমার বাসায় গিয়েছিলেন সুযোগ করে- আমাকে তখনও অনেক বইপত্র দিয়েছিলেন- উপহার হিসেবে যেসব পেয়েছিলেন। এসব ভালবাসার স্মৃতির পাহাড় আজ কোথায় রাখি! আমার ‘কাগজের ডানা’র পা-ুলিপি পড়ে তো উচ্ছ্বসিত বড় চাচা- একটা মুখবন্ধ দিলেন লিখেÑ

‘রীতিমতো রূপান্তর।

এতদিনের মিতভাষী কবি নুরুন্নাহার শিরীন নিজেকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেছেন। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মতো ঘটনা একজন কবির জীবনে খুবই বিরল এবং গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে ভেঙ্গেচুরে গড়ার মধ্যে এক ধরনের রহস্য কাজ করে। আর সে রহস্যময়তার খোঁজ পাওয়া কম কথা নয়। একমাত্র সৃষ্টিশীল কবির পক্ষেই তা সম্ভব। নিরন্তর নিজেকে ভাঙ্গা গড়াই তো শিল্পের ও শিল্পীর প্রধান শর্ত। আর সেই শর্ত পূরণেরই নিজস্ব স্বাক্ষর ‘কাগজের ডানা’।

আমার মেয়ের বিয়ের মুহূর্তে হঠাৎ ঝড়জলে সে এক কা । জামাতা তানজীরের আবার ডাকনাম প্রলয়। তা নিয়ে জনকণ্ঠে কলাম লিখলেন ‘প্রলয় কা ’!

আমার প্রিয় বড় চাচার কাছে কত যে অপরিশোধ্য ঋণ আমার তার কোন লেখা কোথাও নেই। সে শুধু আমিই জানি। আর জানে আমার অন্তর। ২০০৬-২০০৭ সালের ক্রান্তিকালে যখন দৈনিক জনকণ্ঠের তোয়াব ভাইকে আমার ‘জনমনোকালকাহিনী’র পাণ্ডুলিপি পাঠানো মাত্র সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে তা ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়ে চলছে – বড় চাচা তখন তাঁর কলামে লিখলেন-

ইতিহাসের ঝরণাতলায় : কাব্য ভাষার স্বাদ-গুণে কবি নুরুন্নাহার শিরীনের কবিতা শুরু থেকেই ভিন্ন মাত্রার। দেশ-কাল-সমাজ ও ইতিহাস বিষয়ে শিরীনের যে সচেতনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক এবং এর পরিণতিও বিস্ময়কর। না হলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জনকণ্ঠের মতো মানসম্পন্ন কাগজের চতুরঙ্গ বিভাগে ধারাবাহিক ‘জনমনোকালকাহিনী’ নামের যে আখ্যানটি লিখে আসছেন সে এই অল্প সময়ের মধ্যে এত সাবলীল তথ্য ও নিষ্ঠাপূর্ণ হয়ে উঠবে ভাবতেও অবাক লাগে। প্রতিটি তন্ত্রী এতই ঝঙ্কৃত যে মনে হয় নূপুর পরা ঝরণাধারা। পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে তিনি বাংলাদেশ হয়ে ওঠার ইতিহাস কাব্যছন্দে বেঁধেছেন।’

এমন করে জগতে কে আর আমার সামান্য লেখার মূল্যায়ন করবে! কবি বেলাল চৌধুরী আমার বড় চাচা আমাকে জেনেছেন আপন মহিমায়। কয়েক বছর আগের কথা- আমার বাসায় এসেছিলেন সঙ্গে কয়েকজন অনুজসম সাংবাদিক। রাত দশটা তখন আমি তো তাদের না খেয়ে যেতে দেব না। রাতের খাবার খুব আগ্রহের সঙ্গে খেয়েছিলেন। দুই বছর আগে উনার বাসায় স্বামীর সঙ্গে গিয়েছিলাম উনাকে দেখতে। কত খুশি যে হয়েছিলেন লিখতে বসে সে ছবি মনে পড়ছে আর চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। কোথায় পাব আমরা আর বড় চাচাকে! খুঁজেও পাব না তাঁরে।

শুধুই স্মৃতির ছবিরা আমাদের কাঁদিয়ে যাবে জীবন যতদিন। পরম করুণাময়ের কাছে কেবল প্রার্থনা- পরম শান্তিতে রাখুন তিনি বড় চাচাকে- কবি বেলাল চৌধুরীকে- জীবনে যিনি অনেক সুযোগ পেয়েও সুযোগকে নিজের জন্য জমিয়ে না রেখে অপরাপর মানুষের সুবিধা করে দিতেই চেয়ে গেছেন। এমন কবির জন্ম সচরাচর হয় না জগতে। চির শ্রদ্ধা জানাই তাঁরে।

লেখক : কবি ও সাহিত্যিক