১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হৃদয় বিদারক, নিন্দনীয়

পবিত্র রমজানের প্রাক্কালে যৎসামান্য ইফতার সামগ্রী বিতরণকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম গাটিয়াডাঙ্গা মাদ্রাসা মাঠে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। উল্লেখ্য, এই একই স্থানে একই কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর ইফতার সামগ্রী বিতরণের সময় মারা যান ৬ জন। তবে এবার মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ জন। যাদের প্রায় সবাই নারী ও শিশু। আহত অনেক। সামান্য চাল, চিড়া, চিনি ইত্যাদি জাকাতের নামে বিতরণ উপলক্ষে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ কেন এত বিপুল আয়োজন করে তথা ঢাক ঢোল পেটায় সেটা একটা রহস্য বটে! ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, দশ হাজার লোকের জন্য ইফতার সামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আগের রাতেই মাদ্রাসা মাঠে উপস্থিত হয় হাজার হাজার মানুষ, প্রত্যক্ষ দর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী যার সংখ্যা ৫০-৬০ হাজারের কম নয়। এত বিপুল সংখ্যক অধিবাসী উক্ত এলাকায়ই নেই। পার্শ্ববর্তী বান্দরবান থেকেও হাজার হাজার দুস্থ নর-নারী ভিড় জমায় সেখানে। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ সামাল দেয়ার আয়োজন ও ব্যবস্থা ছিল না কেএমআরএস কর্তৃপক্ষের। ফলে এক পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে অনিবার্য এবং হুড়াহুড়ি, দৌড়াদৌড়িতে পদদলিত হয়ে মারা যান কয়েকজন হতভাগ্য নর-নারী। সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ এই মৃত্যুর দায় তথাকথিত হিট স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, গরম ইত্যাদি বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও এসব অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু যে পদদলিত হয়েই ঘটেছে তাতে সন্দেহ নেই। অন্তত মৃতদের অবস্থাদৃষ্টে তা-ই প্রতীয়মান হয়েছে। এত সামান্য আয়োজনের জন্য কয়েকদিন ধরে এলাকায় মাইকিংসহ মসজিদে মসজিদে প্রচার প্রচারণায় এত কী দরকার ছিল? সর্বোপরি এই আয়োজনের জন্য স্থানীয় থানা-পুলিশ ও প্রশাসনকে অবহিত পর্যন্ত করা হয়নি। সে অবস্থায় এতগুলো মানুষ হত্যার দায় নেবে কে? কেএমআরএম কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলেছে, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সক্ষম সদস্যদের উক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। তবে এটুকুই কি সব ও যথেষ্ট? প্রকৃতপক্ষে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা তথা দান করার মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তা না হলে বার বার এরকম ঘটনা ঘটতে পারত না। ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত যেন বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয় তা নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় থানা-পুলিশ ও প্রশাসনকে। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে মালিকসহ সাঙ্গোপাঙ্গদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে স্থানীয় থানায়।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ তথা উন্নয়নশীল পর্যায়ের পথে উন্নীত হওয়ার দিকে অগ্রসর হলেও কিছু সংখ্যক মানুষ অদ্যাবধি দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। দারিদ্র্য নির্মূল কর্মসূচীসহ বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কাবিখা, টাবিখা জাতীয় নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার তাদের অভাব দূরীকরণে কাজ করে যাচ্ছে। গরিব-দুঃখী সবাই যে এই নেটওয়ার্কের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে গ্রামগঞ্জেরও যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। একথাও সত্য, সমাজের উচ্চবিত্ত, ধনী ও সম্পদশালী সম্প্রদায়ও কিছু না কিছু অবদান রাখছেন সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়নে। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে প্রতি বছরই বিত্তবান ও সক্ষম ব্যক্তিরা গরিবদের মধ্যে যাকাত তথা নগদ অর্থ, শাড়ি, লুঙ্গি, ইফতার সামগ্রী, কোরবানির মাংস ইত্যাদি দান করে থাকেন। ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিধান অনুযায়ী এটি যে অত্যন্ত শুভ ও ইতিবাচক উদ্যোগ এতে সন্দেহ নেই। তবে এই দান বিতরণ কার্যক্রম যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত আয়োজনে প্রায় নীরবে-নিভৃতে সম্পাদন করাই বাঞ্ছনীয়। এতে ঢঙ্কা নিনাদের তেমন আবশ্যকতা নেই। তাতে দানের মহিমা ও মাধুর্য নষ্ট হয়ে যায়। ভাবমূর্তিও বিনষ্ট হয়। সর্বোপরি তাতে করে এড়ানো সম্ভব হতে পারে সাতকানিয়ার মতো অনাকাক্সিক্ষত, মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা। আমরা এই ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের জানাই গভীর সমবেদনা। একই সঙ্গে তদন্ত সাপেক্ষে যে বা যারা জড়িত এই দুর্ঘটনার সঙ্গে তাদের যথাযথ শাস্তি দাবি করি। আগামীতে যেন এহেন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে, সেটাও প্রত্যাশিত।