১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র

চা শিল্পের জন্য সুসংবাদ এই যে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্রের কার্যক্রম অবশেষে শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হলো সিলেটবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি। এই নিলাম কেন্দ্রের কার্যক্রম চালু হওয়ায় ভাল মানের চা বিক্রির পাশাপাশি বছরে প্রায় দুই শ’ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। সিলেটবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী এই কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয়ার পর তা গত সোমবার বাস্তবায়ন হলো। চায়ের দেশ বলে খ্যাত সিলেট। দেশের ১৬৪টি চা বাগানের মধ্যে ১৪৫টিই সিলেট বিভাগে। ব্রিটিশ আমল থেকেই এ অঞ্চলের উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে চা পরিবহন খরচ হয় কয়েক কোটি টাকা। সেই সঙ্গে যাতায়াত বিলম্বে নষ্ট হয় চা পাতার গুণগত মান। প্রতিবছর চা রফতানি করে বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে থাকে। পানীয় হিসেবে চা জনপ্রিয় করতে ব্রতী হয়েছিলেন শতবর্ষেরও আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। বিজ্ঞাপনের কপি লিখেছিলেন ছড়ার ছন্দে, যা শোভা পেত এক সময় দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন ও স্টিমার ঘাটে। আর ব্রিটিশ রাজের আনুকূল্য ও চা কোম্পানির বদান্যতায় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগণ চায়ের স্বাদ উপভোগ করতে পারত বিনামূল্যে। সেই চা এখন যথেষ্ট মূল্য দিয়ে পান করতে হয়। চায়ের আবিষ্কার চীন দেশে হলেও তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অসম রাজ্যে প্রথম চা চাষের সূত্রপাত ঘটায় ১৯৩৫ সালে। তারও আগে ১৮৫৪ সালে অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে সিলেটের মালিনীছড়ায় প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে পাটের পরেই ছিল চায়ের স্থান। এক দশক আগেও এ দেশের চা রফতানি হতো। অর্জিত হতো বৈদেশিক মুদ্রা। সেই চা আমদানির খাতে এখন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ওই সময়ে উৎপাদিত চায়ের ৮০ শতাংশ রফতানি হতো। এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় উৎপাদিত চায়ের ৯৬ শতাংশ দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে। চায়ের উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ভোগ চাহিদার প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। ফলে চা রফতানিকারক দেশটি হয়ে গেছে আমদানিকারক। এদিকে চায়ের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে; অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে রফতানি বাণিজ্য। দেশী বাজারে চায়ের দাম বেশি হওয়ায় আমদানি বেড়েছে। গত শতকের সত্তর ও আশির দশকে জাতীয় অর্থনীতিতে চায়ের যে শক্তিশালী অবস্থান ছিল এখন আর তা নেই। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও যাচ্ছে না। দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মাথাপিছু চায়ের চাহিদা। ফলে রফতানি কমে আমদানি বেড়েছে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ছাড়াও চা বাগান রয়েছে চট্টগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওয়ে। চা বাগান সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় চা বাগান গড়ে তোলার সুবর্ণ পরিবেশ থাকার পরও সেখানে চা বাগান স্থাপন কাজে কেউ এগিয়ে আসছে না। অথচ প্রয়োজন এই অঞ্চলে সমৃদ্ধ চা বাগান প্রতিষ্ঠা। এতে আমদানি বন্ধ হয়ে রফতানি বাড়তে পারে। অন্তর্জাতিক বাজার আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। চায়ের গুণগত মানও বাড়বে। এমনিতেই কম দামে চা আমদানির ফলে কমে গেছে দেশীয় চায়ের চাহিদা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরী।

এতদিন সিলেটের বাগানে প্রতি বছর ৭ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হতো। এই চা নিলামের জন্য নেয়া হতো চট্টগ্রামের নিলাম কেন্দ্রে। এ জন্য উৎপাদকদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো, ব্যয় বাড়ত। শ্রীমঙ্গলে দ্বিতীয় নিলাম কেন্দ্র চালু হওয়ায় এই এলাকার ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সাশ্রয় হবে। সমৃদ্ধ হবে আর্থিকভাবে বৃহত্তর সিলেট। উৎকৃষ্ট মানের চা অর্থাৎ বাগান থেকে ১৫-২০ দিনের মধ্যে চা এবার টেবিলে চলে যাবে। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ সুস্বাদু চা দিয়ে সকাল শুরু হবে অনেকের। যে ৭৪ মিলিয়ন কেজি চা চট্টগ্রামে নিলামে পাঠাতে ব্যয় হতো ৩-৪ কোটি টাকা তা এখন সাশ্রয় হবে। উৎপাদকরা লাভবান হবেন বৈকি। চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনার পালা যুক্ত হলো। সেই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, সময় ও শ্রম বেঁচে যাবে। অপরদিকে চায়ের গুণগত মানও থাকবে পুরোপুরি অক্ষুণœ। দেশীয় চা শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকিয়ে রাখতে হলে শ্রমঘন এই শিল্পকে সুরক্ষা দেয়া অত্যাবশ্য। উন্নত মানের চায়ের বিদেশী বাজার ফিরিয়ে আনা সঙ্গত। নতুন এই নিলাম কেন্দ্র চা শিল্পকে আরও অধিক মাত্রায় এগিয়ে দেবে বিশ্ববাজারে বলে সরকার মনে করে।