২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ দেশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের উত্তরসূরিদের, রাজাকারের সন্তানদের নয় -স্বদেশ রায়

জাফর ইকবালের ‘আমি রাজাকার ॥ একটি আলোকচিত্র’ শিরোনামের লেখাটি পড়ি বুধবার অফিস থেকে ফেরার পথে সেল ফোন সেটে। লেখাটি পড়ে তখনই তাঁকে ফোন করতে ইচ্ছে হয়েছিল। তবে পরক্ষণেই সাংবাদিক জীবনের প্রথমে নেয়া একটি শপথের কথা মনে পড়ল, পত্রিকায় ছাপা হবে এমন কিছু ছাপা না হওয়া অবধি তা নিয়ে কাউকে কিছু বলা একজন সাংবাদিকের উচিত নয়। যখন সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করতাম, একদিন আগে পত্রিকা বের হয়ে যেত। পত্রিকাটি কখনই টেবিলের ওপরে রাখতাম না। ড্রয়ারে রাখতাম। যা হোক, পাঠকের কাছে যাবার পরেই সেটা টেবিলে রাখতাম। বেশ কিছুদিন যাবত একটা ডিপ্রেশনে ভুগছিলাম। তবে লেখাটি পড়ে তা কিছুটা হলেও কমে গেল। কারণ, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, শিবিরের নেতৃত্বে একটি আন্দোলন হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধারা অপমানিত হচ্ছেন নতুন প্রজন্মের একটি শ্রেণীর মাধ্যমে। শিবির ও ছাত্রদল সাধারণ ছাত্রদের বিভ্রান্ত করে রাজাকারদের সমর্থনে রাজপথে নামিয়েছে। ছাত্রলীগের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছাত্রশিবিরও ডানা খুলে বেরিয়ে এসেছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ওই জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে চলা আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে। এমনকি যাদের সমর্থন দেবার কথা নয়, তারাও সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও অগ্রজ ছাত্রদের রক্তে ভেজা ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার পীঠস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে ধীরে ধীরে ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে ইসলামী ছাত্রশিবির ও অনান্য মৌলবাদী জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরা পা গাড়ছে- অথচ ওইভাবে সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা কথা বলছেন না। এমনকি এই সত্য কথাগুলো বললে, শিবিরের ছেলেরা (যারা ভার্চুয়াল জগতে ছাগু নামে চিহ্নিত) তারা এসে নানান মন্তব্য করে। অবশ্য ওই মন্তব্যগুলো খুবই উপকারী, কারণ এর থেকে এদেরকে চিনতে আরও সুবিধা হয়। যা হোক, এমন একটা সময়ে জাফর ইকবালের এই লেখাটি অনেকখানি ডিপ্রেসন কাটিয়ে দিল।

যদিও ডিপ্রেসন শব্দটি ব্যবহার করছি, আসলে সত্যিকার যাকে ডিপ্রেসন বলে তা আমাকে কখনও আক্রান্ত করতে পারে না। বাস্তব জীবনে আমি যথেষ্ট আশাবাদী মানুষ। তবে ড. জাফর ইকবালের আশাবাদে সত্যিই অভিভূত হলাম। শুক্রবার তাঁর লেখাটি ছাপা হলে তাঁকে ফোন করি। কিছুটা পরে তিনি কল ব্যাক করেন। তখন তাকে শুধু তাঁর লেখার জন্য অভিনন্দন জানালাম না, নিজের মনের কথাটি বললাম। কারণ, জাফর ইকবাল অনেক বড় লেখক। আমার মতো সাধারণ মানুষের অভিনন্দন তাঁর জন্য মোটেই কিছু নয়। তাই অভিনন্দনের থেকে নিজের মনের কথাটি তাকে বলি। বললাম, ভাই আপনার লেখা পড়ে অনেকখানি ডিপ্রেসন কেটে গেছে। কারণ, নতুন প্রজন্মের একটি অংশের দ্বারা মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান ও পবিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের উপস্থিতি সহ্য করতে পারছি না। মনটাকে হতাশায় ভরে দিচ্ছে। এর বিপরীতে পেলাম জাফর ইকবালের শতভাগ স্বাভাবিক একটা গলা। তিনি আমাকে বললেন, মন খারাপ করছেন কেন? একটা প্রজন্মের একটা অংশ নষ্ট হয়ে গেছে, তাতে মন খারাপের কি আছে? আরও কত প্রজন্ম আসবে। আমরা এই প্রজন্মের পরের প্রজন্মকে ভাল করার চেষ্টা করব। চমকে উঠলাম। কী অসম্ভব আশাবাদী একটা মানুষ। বাস্তবে নিজের মনের মধ্যেও একই কথা তখন জেগে উঠল। সত্যি তো তাই। মন খারাপের কী আছে। ১৯৭১ এ যখন একদল তরুণ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গেছে তখন আরেক দল রাজাকার হয়েছে, আলবদর হয়েছে। এখন এই প্রজন্মের একটি অংশ নব্য রাজাকার, নব্য আলবদর হয়েছে। তাতে কি সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এর জন্য হতাশ হতে হবে? এই প্রজন্মের মধ্যে যারা ভাল আছে, তারা নিশ্চয়ই আলোর মশাল নিয়ে সামনে হাঁটবে। আবার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যে নতুন প্রজন্ম আসবে, তারা হয়তো এই নব্য রাজাকার, আলবদরদের বিচার করবে।

ড. জাফর ইকবাল তাঁর লেখায় আমাদের মিডিয়ার একটি অংশের সমালোচনা করেছেন। তিনি যা বলেছেন তার অর্থ এমনই, মিডিয়ার এই অংশটুকু এই নব্য রাজাকার ও আলবদরদের তথাকথিত আন্দোলনকে মোড়কে মুড়ে প্রচার করছে। এরা যে আন্দোলনের মাধ্যমে ২০১৮ সালে রাজাকারি, আলবদরি চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে, সেটা প্রকাশ করেনি। জাফর ইকবালকে খুব কাছ থেকে চিনি, তিনি যেমন জ্ঞানী, সাহসী ও সৎ, তেমনি শিশুর মতো একটি সরল মানুষ। তিনি এই মিডিয়ার এই অংশ কেন রাজাকারি ও আলবদরি চিন্তাকে সমর্থন করে যাচ্ছে, কেন তারা এই মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার আন্দোলনকে, নারীদের ঘরে পাঠানোর আন্দোলনকে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন বলছে, কোথা থেকে এই কলকাঠি নাড়া হচ্ছে, এগুলো তিনি সত্যি খোঁজ রাখেন না। মিডিয়ার ওই অংশটির কর্তারা কীভাবে হাওয়া ভবনে বসে থাকতেন সে সব সংবাদ তিনি জানেন না। তাই তিনি বিস্মিত হয়েছেন।

বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে আরও রাজকার ও আলবদর আসবে এটাই স্বাভাবিক। এর কারণ এ কলামে বহুবার লিখেছি যে, ইউরোপে কোন যুদ্ধাপরাধীর ছেলে যুদ্ধাপরাধী হয়নি। বাংলাদেশে রাজাকার, আলবদরের ছেলেরা রাজকার ও আলবদর হয়েছে। তাই বাংলাদেশে বিএনপি টিকে আছে, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী টিকে আছে। বাংলাদেশে যদি রাজাকার ও আলবদরের ছেলেরা রাজাকার ও আলবদর না হতো, তারা যদি মানুষ হতো, তাহলে বাংলাদেশে বিএনপিও থাকে না, জামায়াতে ইসলামীও থাকে না। বাংলাদেশের উন্নয়নকেও কেউ বাধাগ্রস্ত করে না, বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখও বাধাগ্রস্ত হয় না, বাধা পায় না নারীদের পথ চলা।

যা হোক, জাফর ইকবালের এই লেখার পরে আশা করা যায় ধীরে ধীরে এখন আরও অনেকে লিখবেন, বলবেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনের নামে সাধারণ ছাত্রদের প্রতারিত করে দেশে মূলত রাজাকারি, আলবদরি চেতনা প্রতিষ্ঠা করার একটি আন্দোলন হয়ে গেল। এখন প্রশ্ন হলো, এখান থেকে দেশকে কীভাবে বের করতে হবে? এই মু্িক্তযুদ্ধবিরোধী চেতনা থেকে দেশকে অবশ্যই বের করতে হবে। এর জন্যে প্রথমেই দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটিতে এই ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে ইসলামী ছাত্রশিবিরের যে নেতারা তাদের অপতৎপরতা চালাচ্ছে, সেটা বন্ধ করা। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো যদি নিজেদের নব্য রাজাকার ও আলবদর পরিচয়ে পরিচিত করতে না চায় তাহলে তাদের উচিত হবে অবিলম্বে এই রাজাকারি চেতনার ব্যানার ত্যাগ করা। তা যদি তারা না করে তাহলে ভাসানী ন্যাপের অনেক উত্তরসূরি যেমন নব্য রাজাকার ও আলবদর হয়েছে, তাদেরও পরিণতি তাই হবে। তাই বাম সংগঠনগুলোকে এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর তাদের মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশ আমল থেকে আজ অবধি এই উপমহাদেশের বামেরা কখনও সময় মতো সঠিক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ কারণে তাদের যত আত্মত্যাগ, সে তুলনায় সাফল্যের পাল্লায় কিছুই নেই। রাজনীতি ও সমাজনীতিতে সব থেকে বড় বিষয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। এ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে বাম সংগঠনগুলোকে দ্রুতই এদের সংশ্রব ত্যাগ করতে হবে। এর পরেই আসে ছাত্রলীগের দায়িত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ যে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নামে ইসলামী ছাত্রশিবির ঢুকেছে, এর জন্যে বিগত ছাত্রলীগ নেতৃত্ব তাদের দায় এড়াতে পারে না। এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে তার আগে হয়তো শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করবেন। এবার যেহেতু শেখ হাসিনা নিজেই কমিটি করছেন, কোন বিশেষ কমিশন এটা করছে নাÑ তাই নিশ্চয়ই এবার ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ভাল হবে। তারা আওয়ামী পরিবারের ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হবে। যে নেতৃত্ব আসবে তাদের জন্য পবিত্র দায়িত্ব হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে যাতে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নামে শিবির পা গাড়তে না পারে সেটা নিশ্চিত করা। এ কাজ তাদের করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি থেকেই বঙ্গবন্ধুর উত্থান, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি থেকে- তোমার দেশ, আমার দেশÑ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্লোগান উঠেছে। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিই এঁকেছে বাংলাদেশের মানচিত্র। তাই রাজাকারের সন্তানরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সদম্ভে ঘুরবে- সেটা দেখার আগে ছাত্রলীগের নেতাদের আত্মহত্যা করা উচিত। ছাত্রলীগের মনে রাখা উচিত, বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন, ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালীর ইতিহাস। এর পাশাপাশি ছাত্রলীগকে মনে রাখতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যে বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশ ও জাতির মাতৃজনন অঙ্গ। নব্য এই রাজাকার, আলবদরদের হাত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি দেশপ্রেমিক ছাত্রছাত্রীর। অন্যদিকে এই নব্য রাজাকারদের সামাজিকভাবে, স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। এরা এখন চিহ্নিত হয়ে গেছে। তাই এদের এলাকায় যেন তাদেরকে রাজাকার পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সেভাবেই তাদেরকে বয়কট করা হয়, তার উদ্যোগ নিতে হবে। এই রাজাকারের সন্তানগুলোর প্রত্যেকটির পরিবারকে এখন সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে বয়কটের সময় এসেছে। কারণ, আর যাই হোক দেশকে ২০১৮ সালে এসে নব্য রাজাকার, আলবদরদের হাতে তুলে দেয়া যেতে পারে না। আজ এই রাজাকারের সন্তানরা বঙ্গবন্ধু কন্যাকে আলটিমেটাম দিচ্ছে, তাদের বলে বলীয়ান হয়ে আরেক ঢাকা-করাচী-ওয়াশিংটনের যাত্রী ড. কামাল হোসেন শেখ হাসিনাকে হুমকি দিচ্ছেন। এর অবসান তরুণ প্রজন্মকেই ঘটাতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে, শহীদরা রক্ত দিয়ে এ দেশ রাজাকার, আলবদর এবং তাদের সন্তানদের জন্য তৈরি করেনি। এ দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের, এ দেশ শহীদের উত্তরসূরিদের- অন্য কারও নয়। প্রয়োজনে ভিয়েতনামের মতো আইন করে রাজাকার, আলবদরদের ও তাদের উত্তরাধিকারদের অধিকার সঙ্কুচিত করতে হলেও করতে হবে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর থুথু ফেলবে, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করবে, আর প্রকাশ্যে রাজাকার বলে গর্ববোধ করবে- এই বাংলাদেশে কোনদিন তা হতে দেয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল তরুণের সামনে তাই এখন কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষা হোক আর যুদ্ধ হোক, জয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই- অন্য কোন পক্ষে নয়।

swadeshroy@gmail.com