১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সাঁইত্রিশ বছর ॥ কী পেল বাংলাদেশ

  • ড. হারুন-অর-রশিদ

১৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা--পরবর্তী ৬ বছর বিদেশে নির্বাসিত থাকতে বাধ্য হয়ে অতঃপর সাঁইত্রিশ বছর পূর্বে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি তাঁর স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন। সে সময়ে দেশে চলছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের বেসামরিক লেবাসে সেনা-গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রিত শাসন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা-সদস্যের হাতে জেনারেল জিয়া নিহত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন (২৫ মার্চ ১৯৮২)। শুরু হয় জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছর সেনাশাসন।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতাসীন মোশতাক, জিয়া সরকার বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেছিল। ১৯৭৫-১৯৭৯ পর্যন্ত একটানা সামরিক শাসন চলে। জনগণের সর্বপ্রকার মৌলিক অধিকারহরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পুরস্কৃত করা হয়। তাদের যাতে ভবিষ্যতে বিচার না হতে পারে সে জন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৫)। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ-রাষ্ট্র গঠনের চেতনাকে ভূ-লুণ্ঠিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর নেমে আসে সরকারি চরম নির্যাতন-নিপীড়ন। রাতের আঁধারে গোপন স্থানে শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া সংবিধানকে কেটে-ছেটে বিকৃত করা হয়। ’৭১ এ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী ও গণহত্যায় জড়িত নিষিদ্ধ থাকা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দল-গোষ্ঠীসমূহকে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেয়া হয়। ধর্ষণ-হত্যা-অগ্নিসংযোগ, অন্য কথায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেয়া হয়। এমনি এক শ্বাসরুদ্ধকর, বিভীষিকাময় রাজনৈতিক পটভূমিতে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পূর্বে বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলের ইডেন হোটেলে তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিল অধিবেশনকে সামনে রেখে দলের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব চরমরূপ লাভ করে। দল নিশ্চিত ভাঙনের দোরগোড়ায় পৌঁছে। এমনি এক অবস্থায় বলতে গেলে নাটকীয়ভাবে সবপক্ষের সম্মতিক্রমে কাউন্সিলে শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচন হন। দল নিশ্চিত ভাঙনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪ বছর। সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর প্রতিনিধি সঙ্গে ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি সাক্ষাতকার দেন, যা পরেরদিন আজাদ পত্রিকায় ‘আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হওয়াতে উল্লসিত হওয়ার কারণ দেখি না’ শিরোনামে ছাপা হয়। সাক্ষাতকারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে তাঁর মানস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা দৃঢ় দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় (দ্রষ্টব্য: হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, বাংলা একাডেমি ২০১৬, পৃ. ৪৬২-৪৬৩; আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের জন্য, ওই, পৃ. ২০১-২১৮)।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানাতে সেদিন কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে লাখো জনতার সমাবেশ ঘটে। বিমানবন্দর থেকে ৩২ নম্বর ধানম-ি পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা- এক নজর তাঁকে দেখা। রাজধানী ঢাকা শহর সেদিন পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি কিছুই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ-উদ্দীপনাকে এতটুকু বিঘিœত করতে পারেনি। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। আনন্দ আর বিষাদের অশ্রু দিয়ে দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনতা তাঁকে বরণ করে নেয়। প্রচুর বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে প্রকৃতিও যেন তাতে যোগ দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে লাখো জনতা মিছিল সহযোগে তাদের প্রিয় নেত্রীকে নিয়ে আসে বাঙালীর জাতীয় মুক্তির সূতিকাগার, জাতির জনকের স্মৃতিঘেরা ৩২ নম্বর ধানম-ির বাড়ির সম্মুখে, যেখানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত হয় গ্রীক ট্র্যাজেডির চেয়েও করুন ও মর্মান্তিক এক বিয়োগান্তক ঘটনা-জাতির জনকসহ পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্যের রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর, পৈশাচিক হত্যাকা-। কিন্তু বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার সুযোগ পেলেন না শেখ হাসিনা। তখনও শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক সেটি ছিল অযতœ-অবহেলায় সিল করা অবস্থায় ফেলে রাখা।

বাংলার মাটিতে পা রেখে এই মাটি ছুঁয়ে শেখ হাসিনা সেদিন জাতির পিতা ও একাত্তরের শহীদদের রক্তের নামে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার, সেনা শাসকদের কবল থেকে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার উদ্ধার এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছিলেন। শুরু হয় তাঁর জীবনের নিরন্তর, নিরবচ্ছিন্ন এক কঠিন সংগ্রাম, যা আজ ৩৭ বছর ধরে বিস্তৃত।

এ পর্যায়ে জাতির রাজনৈতিক নেতৃত্বভার গ্রহণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার পূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে খানিকটা আলোকপাত করা যাক। রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর জন্ম (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সাল)। রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই তিনি বেড়ে ওঠেছেন। জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অনেক কিছু তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনও কখনও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৫৪ ও ১৯৫৬-৫৭ সালে পিতার স্বল্পকালীন মন্ত্রিত্বের সময় মিন্টো রোডের বাসায় থেকেছেন। আবার পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছর বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনকালীন নানা দুরবস্থা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রথমে আজিমপুর গার্লস স্কুল, এরপর ইডেন গার্লস কলেজ, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন শেখ হাসিনা সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি ছিলেন ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ’৬৬-এর ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮-এর আগরতলা মামলা-বিরোধী ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি রাজপথের মিছিলে শামিল হয়েছেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়, বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আলোচনার নামে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার কালক্ষেপণ ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২ থেকে ২৫ মার্চ (১৯৭১) পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ পালন ও বাঙালী জাতির উত্থান, ২৬ মার্চ পাক হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পরিশেষে, ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, এ সবই তিনি (শেখ হাসিনা) অতি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। যেমন ’৫২-এর ভাষা-আন্দোলন শিশু বয়সে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (তখন বয়স মাত্র ৫ বছর) শেখ হাসিনার ওপর যে প্রভাব ফেলেছিল, বঙ্গবন্ধুর লেখায় তা এভাবে ফুটে ওঠে :

‘পাঁচ দিন পর বাড়ি পৌঁছালাম ... হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, ‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ঢাকা ২০১২, পৃ. ২০৭)। এরপর বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য, ‘২১ ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে তাই বলে চলেছে’ (ঐ, পৃ. ২০৭)।

১৯৭৫ সালে স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞার সঙ্গে বিদেশে থাকায় শেখ হাসিনা ও একমাত্র ছোট বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। অন্যথায়, মা-বাবা-ভাই, ১০ বছরের শিশু রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সবার মতো খুনীদের হাতে নিশ্চিতভাবে এ দুই বোনকেও ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর ভাগ্যবরণ করতে হতো। এর পর তাঁকে দীর্ঘ ৬ বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বারের সরকার গঠন। নানা অজুহাতে দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও এর রাজনৈতিক সহযোগী, যুদ্ধাপরাধী জামাতে ইসলামীর নির্বাচনের পথ পরিহার করে ভিন্ন পন্থায় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তিনি এককভাবে যে দৃঢ়তা, দুরদর্শিতা ও সাহসী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শিক্ষণীয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে সমাদৃত। এখানে পৌঁছাতে তাঁকে অনেক চ্যালেঞ্জ আর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন, কারাগারে থেকেছেন। ২০০৭-২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় বছরকাল সাবজেলে তাঁর নিঃসঙ্গ বন্দীজীবন কেটেছে। একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন হয়েছে। রাজনীতি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টাও হয়েছে। বিগত সময়ে ২৩-২৪ বার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা, যাতে নারী নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান এবং কয়েকশ’ লোক আহত হন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঘাতকদের মূল টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা। অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রধান দিক হচ্ছে, তিনি জাতির পিতার কন্যা। বঙ্গবন্ধুর রক্ত তাঁর ধমনীতে প্রবাহমান। বঙ্গবন্ধু বাঙালী জাতির মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’ই ছিল তাঁর রাজনীতি। পিতার অনেক আদর্শই শেখ হাসিনা জেনেটিক্যালি পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ভক্ত এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়জুড়ে তিনি রয়েছেন। তাদের ¯েœহ ও ভালবাসায় তাঁর জীবন সিক্ত। দ্বিতীয়ত. তাঁর রয়েছে আওয়ামী লীগের মতো এমনই একটি অভিজ্ঞ, ঐতিহ্যবাহী, সুদৃঢ় সংগঠন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যার রয়েছে অসংখ্য কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী; যে দল দেশের বৃহত্তম; যে দল কালোত্তীর্ণ (প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯) এবং নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান; যার রয়েছে এদেশের স্বাধীনতাসহ যা কিছু শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর তার সিংহভাগ অর্জনের মূল কৃতিত্ব। তৃতীয়ত. তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিতে সৎ, সাহসী, দুর্নীতিমুক্ত, জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মপ্রত্যয়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ই অভাব। সেক্ষেত্রে, শেখ হাসিনা ব্যতিক্রম এবং তিনি নেতৃত্বের এসব গুণের অধিকারী। চতুর্থত. শেখ হাসিনা ব্যক্তিজীবনে যেমন খুবই ধর্মপ্রাণ, তেমনি একই সঙ্গে সেক্যুলার। প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে সেক্যুলারিজমের কোন বিরোধ নেই। বাংলাদেশের মানুষও একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ ও অসাম্প্রদায়িক। এটি হচ্ছে আমাদের দীর্ঘ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আমাদের দেশের রাজনীতিতে তাই শেখ হাসিনা হচ্ছেন, এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সার্থক প্রতিনিধি। পঞ্চমত. শেখ হাসিনা মনেপ্রাণে একজন আধুনিক মানুষ। ১৯৮১ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের অনেক পূর্বে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসের তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলা ভাষায় রয়েছে প্রভূত দখল। তিনি একাধিক গ্রন্থেরও প্রণেতা। ষষ্ঠত. অতীত সম্বন্ধে তিনি যেমন সচেতন, তেমনি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎমুখীও। তাঁর ‘ভিশন-২০২১’ এরই সার্থক প্রমাণ। শেষত. বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা হচ্ছেন সেক্যুলার-ডিমোক্র্যাটিক ধারার প্রধান প্রতিনিধি এবং স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যের প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনীতি তথা সার্বিক উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের উজ্জ্বলতম অর্জনসমূহ হচ্ছেÑ সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করা, সেনা শাসনের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালীকরণ, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে (১৯৯৭) ওই অঞ্চলের প্রায় দু’দশক ধরে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের অবসান, নারীর ক্ষমতায়ন, সার্বজনীন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন (২০১০), নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ ও লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ( ৩ জুলাই ২০১১)-এর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানের ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতি প্রতিস্থাপন, সাধারণ দারিদ্র্যের হার ২৪% ও অতিদারিদ্র্য ১২% এ নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬৫% এবং শিক্ষার হার ৭১ ভাগে উন্নীত করা, ১৬ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপন, ১৮ হাজর মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুত উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, দুস্থ, অসহায়, অবহেলিত মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থান রোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা ও রায় কার্যকর করা, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-বিরোধ নিষ্পত্তি, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান ও দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের নারী-পুরুষ শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে ১০ লক্ষাধিক জীবন বিপন্ন রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় দান, বিশ^ ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো-স্বীকৃতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সর্বজনীন রূপায়ণ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ভিশন-২০২১, স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্তির জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

একটি দেশ বা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীরূপ ভূমিকা পালন করে, তা দ্বারা নেতৃত্বের স্থান নির্ধারিত হয়। মুস্তফা কামাল পাশাকে বলা হয় আধুনিক তুরস্কের জনক বা আতাতুর্ক। মাহাথির মোহাম্মদ হচ্ছেন মালয়েশিয়ার বর্তমান উন্নতি-অগ্রগতির স্থপতি। জওয়াহারলাল নেহরুকে মনে করা হয় আধুনিক ভারতের পথিকৃত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বাঙালীর জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার মহানায়ক। আবার, বিভিন্ন দেশে এমন অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে, ইতিহাসে যাদের অবস্থান অতি সাধারণ এবং জনমনে থাকেন বিস্মৃত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মূল্যায়ন কী হবে? গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার অর্জন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহির্বিশে^ বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি, এক কথায়, দেশের ও জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে বিগত ৩৭ বছর ধরে তিনি যে ভূমিকা পালন করে আসছেন, সে-সব বিবেচনায় আমাদের জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর পর তাঁর স্থান সর্বশীর্ষে। সামগ্রিকভাবে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শিক ছায়াতলে বেড়ে ওঠে শেখ হাসিনা নিজগুণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের বিশেষ একটি স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি জাতিকে অনেকে দিয়েছেন। এরপরও তাঁর কাছে জাতির প্রত্যাশা আরও অনেক, কেননা তিনি শুধু রাজনীতিক বা প্রধানমন্ত্রী নন, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’, তিনি জাতির পিতার কন্যা।

লেখক : ভাইস-চ্যান্সেলর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়