২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত কৃষক

দেশে গত কয়েক বছরে ধান-পাট-ফলমূল-শাক-সবজি, তরিতরকারি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, চা, চামড়া ইত্যাদির উৎপাদন বাড়লেও ত্রুটিপূর্ণ মার্কেটিংয়ের কারণে কৃষক ও উৎপাদক শ্রেণী প্রায়ই বঞ্চিত হয় ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে। শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘ফুড এ্যান্ড এগ্রিকালচার ইকোসিস্টেম’ শীর্ষক এক সেমিনারে কৃষি বিশেষজ্ঞদের জবানিতে উঠে এসেছে এই তথ্য। এটি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক যে, স্বাধীনতার ৪৭ বছর হতে চললেও অদ্যাবধি আমরা একটি সমন্বিত ও আধুনিক কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে একদিকে উৎপাদিত ফসল ও পণ্যদ্রব্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক; অন্যদিকে সেসব পণ্য উচ্চমূল্যে কিনতে হয় ভোক্তা তথা ক্রেতাসাধারণকে। উদাহরণত ধান-চালের কথা বলা যায়। এর দামে প্রায়ই অস্থিরতা ও উল্লম্ফন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, যার অসহায় শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে কৃষক প্রায়ই ধান-চালের ন্যায্যমূল্য পায় না সরকারের ধান-চালের ক্রয়নীতি ও মূল্য নির্ধারণ সত্ত্বেও। মাঝখান থেকে লাভবান হয় মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, চাতাল মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ীসহ পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। অনুরূপ প্রায় প্রতিটি কৃষি পণ্য, ফলফুল, শাক-সবজি, মাছ, মাংসে প্রতিফলিত হয়ে থাকে।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশে ধান-চালের বাজারে একটা স্বস্তি ও স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। দেশ খাদ্য উৎপাদন বিশেষ করে ধান-চাল উৎপাদনে হয়ে উঠেছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি উদ্বৃত্ত কিছু পরিমাণ চাল বিদেশে রফতানিও হয়েছে। চালের দাম কম থাকায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এমনকি দিনমজুররা বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে বরং ধানের দাম কম থাকায় বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে কৃষককে। এ অবস্থায় সরকার কৃষককে স্বস্তি দিতে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্যও বাড়িয়েছে সময় সময়। অবশ্য মধ্যস্বত্বভোগী, আড়তদার ও চাতাল মালিকদের দৌরাত্ম্য এবং দাপটে মূল্যবৃদ্ধির এই সুফল শেষ পর্যস্ত কৃষকের ঘরে পৌঁছতে পারেনি। যা হোক, কৃষকরা যাতে দুটো পয়সা পায় তা নিশ্চিত করতে সরকার চাল আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতে যেসব ব্যবসায়ী নিয়মিত চাল আমদানি করতেন তারা হাত গুটিয়ে বসে পড়েন এবং অপেক্ষায় থাকেন সুযোগের। গত জানুয়ারি থেকে দেশে বাড়তে থাকে চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের। ইত্যবসরে অসময়ে ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ী ঢল, অকাল বন্যা, হাওড় অধ্যুষিত ৭টি জেলায় ফসলহানি, ১৬টি জেলায় ধানে পোকার আক্রমণ ও জলাবদ্ধতা এতে যোগ করে বাড়তি মাত্রা। বাজারে হু হু করে বাড়তে থাকে মোটা চালের দাম। বোরোর বাম্পার ফলন হলেও কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

অন্যদিকে বাজারে চালের অভাব নেই। মধ্যস্বত্বভোগী চাতালের মালিক, মজুদদার, আড়তদারসহ বাজারের ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের কাছে চালের মজুদ যথেষ্ট ও সন্তোষজনক। তবে সরকারী গুদামে এই মুহূর্তে চালের মজুদ কিছু কম। জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার বেশ ক’টি দেশ থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চাল আমদানির ওপর থেকে শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাবও পড়েছে। তবে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মনে রাখাতে হবে যে, ধান-চালের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে নয়; বরং যুক্তিসঙ্গত মূল্যবৃদ্ধির দিকে নজর দেয়া বাঞ্ছনীয়। সরকারকেও বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।

বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আরও উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। এর পাশাপাশি নজর দেয়া উচিত বিভিন্ন ও বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদেরও উচিত হবে, জনসাধারণ ও সরকারকে জিম্মি কিংবা কারসাজি করে নয়, বরং আস্থায় নিয়েই ব্যবসা করা। তদুপরি দেশে কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত একটি আধুনিক ও সমন্বিত মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরী ও অপরিহার্য।