২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ আগের সেই দিনগুলো!

  • বোরহান বিশ্বাস

আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই আমার পরিচয়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বাবার সাইকেলে চড়ে মাঝে-মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। প্রেসক্লাব থেকে সামান্য এগিয়ে হাতের বাঁ দিক দিয়ে যে রাস্তাটি সোজা চলে গেছে দোয়েল চত্বর, টিএসসি হয়ে নীলক্ষেত মোড়ের দিকে। এ রাস্তা দিয়েই বাবা আমাকে অফিস ঘোরাতে নিয়ে যেতেন। আর আশপাশের গাছগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। সবুজ গাছগুলো দেখে মনটাও তখন সজীব হয়ে উঠতো।

ফাঁকা রাস্তা। নির্মল বায়ু। এর মধ্য দিয়ে আমরা বাপ-বেটা চলেছি। রাস্তায় অতিরিক্ত কোন যানবাহন নেই। তাই গাড়ির ভেঁপু কিংবা রিকশার টুং টাং শব্দও তেমনটা নেই। কার্জন হলের সামনে আসতেই কিছুটা ভীতি কাজ করত। বাঁশের ঝোঁপঝাড় ছিল এর কিছু অংশজুড়ে। অবশ্য সামান্য এগিয়ে গেলে মনটা উৎফুল্লে ভরে উঠতো কার্জন হলের বিশাল স্থাপত্য দেখে। দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি মোড় পর্যন্ত অনেকটাই নির্জন থাকতো। এখনকার মতো যানবাহন অথবা লোকজনের অতো আধিক্য ছিল না।

খিলগাঁওয়ে আমাদের বাড়ি। বাড়ির সামান্য দূরেই ছিল সুন্দর একটি পুকুর (উত্তর বাসাবো ঝিলপাড়)। উৎসুক ছেলেদের অনেককেই তপ্ত দুপুরে পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে গোসল করতে দেখা যেত। বিকেলে বয়োজ্যেষ্ঠরা তাদের সন্তান নিয়ে এখানে এসে সময় কাটাতেন। পুকুরটির এক কোণায় দাঁড়িয়ে রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখতো সবাই। কালক্রমে সেই পুকুরটি ভরাট হয়ে আজ বিশাল বিশাল অট্টালিকা তৈরি হয়েছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি এবং ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন সুন্দর এই পুকুরটিকে ছোট্ট একটি কালভার্টে রূপ দিয়ে এর পাশের জায়গাগুলো ব্যক্তি মালিকানায় বিক্রি করে দেয়। এখন আর কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। এটি দেখলে কখনোই মনে হবে না যে এখানে কোন এক সময় সুন্দর একটি পুকুর ছিল। বিশাল ইমারতের আড়ালে চাঁদ যেন স্থায়ীভাবেই ঢাকা পড়েছে। প্রতিটি গলির মাথায় একটি করে ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিন ছিল। দিনরাতে যে ময়লাগুলো জমা হতো পরদিন সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে সেগুলো নিয়ে যেত। এখন আর সেগুলোর কোন অস্তিত্বই নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তখনো আমরা পৌরকর দিতাম, এখনো দিই। ডাস্টবিন এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে ময়লা ফেলার জন্য এখন পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নগরবাসীর কাছ থেকে আবর্জনা নেয়ার নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ঢাকার রাস্তায় গাড়ির বিকট হর্ণ একদিকে যেমন শব্দ দূষণের সৃষ্টি করছে। তেমনি বায়ু দূষণ নগরবাসীর বেঁচে থাকার জন্য একটি বিরাট হুমকি। পাশাপাশি রাস্তার পাশের ডাস্টবিন থেকে উপচে পড়া ময়লায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। আর পরিবেশ দূষণের ফলে শিশু, বৃদ্ধ এবং হৃদরোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা শহরে বায়ু এবং শব্দ দূষণের মাত্রা এতোই বৃদ্ধি পেয়েছে যে এখানে বসবাস করাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঢাকার পরিবেশে উদ্বেগের আরেক কারণ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিশুদ্ধ এবং সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যার সঙ্গে শহরের পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণের হারও আনুপাতিক হারে বাড়তে থাকবে। যানজটও এর বাইরে নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে যানজটে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে করে বছরে আর্থিক ক্ষতি হয় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিবছর নানান কর্মসূচী পালনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়। ধরিত্রীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। রাজধানী ঢাকার পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়েও কথা ওঠে এ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারগুলোতে। নতুন নতুন পরিকল্পনা গৃহীত হয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। তবুও কোথায় যেন একটা গলদ থেকেই যায়।

এসব থেকে মুক্তি পেতে আমাদের পরিবেশ আর নগরবিদরা কি ভাবছেন জানি না। তারা কি দীর্ঘমেয়াদী কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত নেবেন? নাকি সবকিছু যেভাবে আছে সেভাবেই চলতে থাকবে। পরিবারে অনেক ছেলেমেয়ে হলে বাবা-মার যে দশা হয় ঢাকা শহরটাকে সেরকম কিছুর সঙ্গে তুলনা করা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না। কর্তারা চুপ করে বসে থাকলেও দূষিত বাতাস, শব্দ আর ভেজাল খাদ্য কিন্তু নীরব ঘাতক হয়ে নগরবাসীকে ঠিকই গিলে খাচ্ছে। আমরা কেউই এর বাইরে নই।

লেখক : সাংবাদিক