২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুভ জন্মদিন ॥ প্রিয় মুনতাসীর মামুন

  • চৌধুরী শহীদ কাদের

মুনতাসীর মামুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। রস-কষহীন গুরুগম্ভীর ভাষায় দীর্ঘ বাক্যে দুর্বোধ্য ইতিহাস চর্চাকে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। এই কাজটি মুনতাসীর মামুন করেছেন তাঁর তীব্র সমাজবোধ থেকে। সমাজবোধ ছাড়া ইতিহাস হয় না। আর ইতিহাসের অর্থ মানুষের জীবন যাপনের জটিলতা উন্মোচন করা। এই বিশ্বাস তাঁর কাজের ভিত্তিমূল। এই বিশ্বাস থেকে তিনি ইতিহাসের অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের পক্ষে ও স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে একটি মূল্যবান উপাদান বলে মনে করেন। এই পক্ষ ও বিপক্ষের অবস্থান নির্মিত হয়েছে মতাদর্শিক ঐতিহ্য থেকে। পাকিস্তান আমলের কলোনিয়াল লড়াইয়ের সামষ্টিক স্মৃতি থেকে। ইতিহাস সেজন্য তাঁর দিক থেকে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এককেন্দ্রিক অবস্থান। সমাজের সঙ্গে ইতিহাসকে যুক্ত ও অতীতের ঘটনাবলীর সঙ্গে বর্তমানকার ঘটনাবলীর স¤পর্ক তৈরি করা, ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব বলে মনে করেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন গণমানুষের ইতিহাসবিদ।

প্রাঞ্জল ভাষা, স্বচ্ছ বিচার-বিশ্লেষণ আর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি লেখাকে কী পরিমাণে শাণিত করে তোলে অধ্যাপক মামুনের অসংখ্য লেখাই তার প্রমাণ। সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ভাষ্যকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর পরিচয় পূর্ববঙ্গবিষয়ক গবেষক হিসেবে। ঢাকার নাগরিকদের কাছে তিনি নগর ঢাকার একমাত্র গবেষক। যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করেন তাদের কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার পথিকৃৎ।

মুনতাসীর মামুন প্রায় পাঁচ দশ ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে যাচ্ছেন। বহুমাত্রিক এই লেখকের প্রথম বইটি ১৯৬৮ সালে বের হয় সত্যেন সেনের উদ্যোগে। বর্তমানে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় ৩০০।

ষাটের দশকে মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির, আলী ইমাম শিশু সাহিত্যিকত্রয় মোটামুটি ঝড় তুলেছিলেন শিশু সাহিত্য ভুবনে।

লেখালেখির উৎসাহটা মূলত পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত। এই আবহে তিনি পেয়েছেন বহু মূল্যবান গ্রন্থ পাঠের, চিন্তা ও মানসিক পরিপক্বতার উপযুক্ত সুযোগ। এরপর পেয়েছেন সমসাময়িক সমাজের বিদ্বৎজনের সান্নিধ্য।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, সত্যেন সেন, রণেশ দাশ গুপ্ত, আহসান হাবীব, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, আহমদ ছফা এমন প্রতিভাবান ব্যক্তিরা তাঁর মনন গঠনে সহায়ক হয়েছেন।

মুনতাসীর মামুনের যাত্রা শুরু শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক হিসেবে। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিষ্ঠা পেলেন লেখক হিসেবে। পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছেন দ্রুত। শুরুতে বিষয় হিসেবে বেঁচে নেন পূর্ববঙ্গ। এরপর পূর্ববঙ্গের কেন্দ্র নগর ঢাকার ইতিহাস রচনায় মন দিলেন। নগর ঢাকার অলি গলি খাল-পোল, নদী, মানুষ জীবন্ত হলেন পাঠকের চোখে। মুনতাসীর মামুন নগর ঢাকার লোকের কাছে পরিচিতি পেলেন ঢাকার রহস্য উদ্ধারকারী হিসেবে। শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি, নগর ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে এলেন নানাভাবে। প্রতিষ্ঠা করলেন ঢাকা নগর জাদুঘর। সেন্টার ফর ঢাকা স্টাডিজ করে উদ্যোগ নিলেন দুর্লভ গ্রন্থ প্রকাশের।

বহুমাত্রিকতায় নগর ঢাকার ইতিহাস বিনির্মাণে দাঁড়ালেন বুড়িগঙ্গা রক্ষার আন্দোলনে। পাঁচ দশক ধরে ক্রমাগত লেখনি, রাজপথের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তাকে এই সাধারণের মনে স্থান দিয়েছেন। জনমানসের মানসজগতের এই স্থানে তাকে কেউ বসিয়ে দেননি। সেটি তিনি অর্জন করেছেন নিজের কর্মে। যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা তাঁর পরিচিতির আরেকটি বড় কারণ। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলন ও শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। নানা প্লাটফর্মে নানামুখী ভূমিকা, একইসঙ্গে কলমে ও রাজপথে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত করেছেন। তিনি পরিচিতি পেয়েছেন আমাদের লোক হিসেবে।

আজ ২৪ মে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ৬৭তম জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিক্ষক, অভিভাবক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক