২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাহাড় ধসে আবারও মৃত্যু

মানুষখেকো পাহাড় নাকি পাহাড়খেকো মানুষ, এ নিয়ে বাহাসের প্রয়োজন হয় না। দুটোই বাস্তব এখন। মানুষ অবলীলায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করছে সব বাধাবিপত্তি, আইনগত নিষেধাজ্ঞা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় উপেক্ষা করেই। পাহাড় বুঝি তাই নেয় প্রতিশোধ। তাই পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৃশ্যমান এই যে, পাহাড় ধসের নেপথ্যে একশ্রেণীর দুর্বৃত্তের অবৈধভাবে পাহাড় ও এর গাছপালা কাটা, দখল ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারই দায়ী। সচেতনতার অভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন করে দরিদ্র মানুষ এর খেসরাত দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পাহাড় কাটা, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা এবং মানুষের প্রাণহানি রোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে, বলা যায় না। একের পর এক পাহাড় ধসের ট্র্যাজিক ঘটলেও থামছে না মৃত্যুর মিছিল। চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারে একযোগে পাহাড় ধসের ঘটনায় গত বছর প্রাণ হারান ১৬০ জন। আর দিন কয়েক আগে পাহাড় কাটতে গিয়ে বান্দরবানে প্রাণ দিলেন তিন শ্রমিক। পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত কাগজে কলমেই সীমিত আছে। বাস্তবায়নের মুখ দেখা তো দূরের কথা, এ সংক্রান্ত কার্যকর কোন উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়। কেবল বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর মাইকিং, ঢাকঢোল পিটিয়ে কিছু বৈঠক ও সিদ্ধান্তে সুপারিশ গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে যে পাহাড় ধস ও প্রাণহানি রোধে তা কাজে আসবে নাÑ সর্বশেষ বান্দরবানের ঘটনা তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অন্যসব ক্ষেত্রের মতোই পাহাড় ধসেও প্রাণহানির পর সাময়িক দৌড়ঝাঁপ ও তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সবকিছু ভুলে যান। বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে চলতে থাকলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি, পরিবেশ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব হবে না। পাহাড় ধস রোধ ও প্রাণহানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হলে বছরব্যাপী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। মনুষ্যসৃষ্ট সঙ্কটে গত চার দশকে জীবন দিতে হয়েছে ছয় শতাধিক মানুষকে।

পাহাড়ে বিপর্যয় রোধে কারণ চিহ্নিত ও করণীয় নির্ধারণ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কমিটি গত বছরের নবেম্বরে ১৫টি সিদ্ধান্তসহ প্রতিবেদন জমা দিলেও তা লালফিতায় বন্দী। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটির করা ৩৬ সুপারিশও ফাইলবন্দী। পরিবেশ সংরক্ষণ ও আইনানুযায়ী পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ ও শাস্তিমূলক অপরাধ হলেও তা বন্ধ হচ্ছে না। এতে গাছপালা নিধনসহ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে। একই সঙ্গে মানব জীবনও। পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার খাতিরেই পাহাড় টিলা ইত্যাদি প্রাকৃতিক স্থাপনা সংরক্ষণ করা দরকার।

পাহাড় ও টিলা কাটার ফলে ত্বরান্বিত হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়া। দেখা দিচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়। পাহাড়ের সবুজ বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় আবাসস্থল হারাচ্ছে বন্যপ্রাণী। এগুলো খনিজ সম্পদেরও ভা-ার। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে থামছে না পাহাড় ও টিলা কাটা। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযানে কিছু পাহাড় কাটা শ্রমিক ও ট্রাক্টরচালক আটক হয়। কিন্তু নেপথ্যের কুশীলবরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাহাড় কাটা আইনত নিষিদ্ধ হলেও স্থানীয় প্রশাসন লিজ দেয়ার ক্ষমতা ঠিকই রাখেন। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাহাড়, টিলা লিজ দেয়া হয় অবলীলায়। লিজকৃত পাহাড় টিলার মাটি কেটে নিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা না দেখার ভান করেন। এই মাটি খোদ সরকারী কাজে ব্যবহারেরও দৃষ্টান্ত রয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান জরুরী। এ জন্য একটি আলাদা সেল গঠন করা সঙ্গত। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনে সরকারের শীর্ষ মহলকেই এগিয়ে আসতে হবে। নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এর কোন বিকল্প নেই।