১৭ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ ‘চাঁদাবাজি’ বন্ধ করতে হবে

  • মীর আবদুল আলীম

ঈদ সামনে রেখে প্রতিবছরই এক শ্রেণীর চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য বাড়ে। পত্রিকার খবরেই বলে দেয় এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। সড়ক-মহাসড়কে আগের মতো এবার বেপরোয়া চাঁদাবাজি না থাকলেও যানবাহন, বিশেষ করে মালবাহী ট্রাক থামিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি হচ্ছে। ঈদ বকশিশের নামে সড়ক-মহাসড়কগুলোয় চাঁদা তুলছে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য। কোন কোন স্থানে প্রভাবশালীরা ‘যানজট নিরসন প্রকল্পের’ নামে রসিদ দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছেন। কেউ চাঁদা দিতে না চাইলে তাকে হয়রানিও করা হচ্ছে।

রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ফুটপাথ দখলকারী গ্রুপ আছে কমপক্ষে ৭০টি। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালী, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরাই এই গ্রুপের সদস্য। এরাই ফুটপাথ ও রাস্তা দখল করে হকারদের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকে। ভাড়ার আড়ালে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতার নামে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। ফুটপাথের হকাররা জানান, রমজান শুরু থেকেই সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজরা চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। কয়েকটি এলাকায় সন্ত্রাসীদের নামেও চাঁদা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজরা এলাকা ভেদে ২শ’ থেকে ৩শ’ দোকানের একটি অংশকে নাম দিয়েছে ‘ফুট’। চক্রাকারে ফুটের হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদার টাকা নিচ্ছে চাঁদাবাজ গ্রুপের নিয়োজিত লাইনম্যানরা। তাদের কাছ থেকে টাকা বুঝে নিচ্ছেন প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার মনোনীত সর্দার। লাইনম্যানের উত্তোলিত টাকার সিংহভাগই যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় কতিপয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মাস্তান বাহিনীর পকেটে। ফুটপাথের দোকানগুলোতে অবৈধভাবে বিদ্যুত সংযোগ দেয়ার সঙ্গে জড়িত বিদ্যুত বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটেও যাচ্ছে লাইনম্যান ও সর্দারের উত্তোলিত টাকার একটি অংশ। লাইনম্যানদের দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা পরিশোধ করে দোকান চালাতে হয়। চাঁদার রেট কম হলেই উচ্ছেদসহ বিভিন্ন হুমকি দেয়া হয়। ভেঙে দেয়া হয় দোকানপাট। এর সবই হচ্ছে প্রকাশ্যে।

চাঁদাবাজরা কিন্তু গর্তে লুকিয়ে থেকে চাঁদাবাজি করছে না! প্রকাশ্যেই চলছে তাদের তৎপরতা। তাহলে কেন তাদের নির্মূল করা যাচ্ছে না? সরকার মাদক ব্যবসায়ী ও জঙ্গি নির্মূল করতে পারলে চাঁদাবাজদের বেলায় ব্যর্থ হচ্ছে কেন? জঙ্গী নির্মূল অসাধ্য মনে হলেও সরকার এ কাজে সফল হয়েছে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা তো আত্মগোপনে নেই! তাদের কর্মকাণ্ড চলে অনেকটা প্রকাশ্যে। প্রকাশ্যে থাকার পরও তাদের দমনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।

বছরের অন্যান্য সময় চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকলেও ঈদ উপলক্ষে চাঁদাবাজরা এখন সত্যিই বেপরোয়া। ঈদ সামনে রেখে পরিবহন সেক্টরে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। চাঁদা না দিলেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় পরিবহন মালিক ও চালকদের। এ সেক্টরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য চাঁদাবাজির ঘটনায় অনেক সময় পুলিশ জড়িত থাকায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোন ফল পাচ্ছে না মানুষ।

ঈদ ছাড়াও বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি চলে। অনেক সময় উপলক্ষ তৈরি করেও চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিদেশে পলাতক কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করেও চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। এসব চাঁদাবাজের হুমকির মুখে অনেক ব্যবসায়ী আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন। এ কথা ঠিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষত র‌্যাব সদস্যরা চাঁদাবাজদের মনে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে, যে কারণে সরাসরি চাঁদা চাওয়ায় ঘটনা আগের চেয়ে তুলনামূলক কম। তার বদলে চলছে ফোনে চাঁদাবাজি।

একটি সুস্থ সমাজ সর্বদাই আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। চাঁদাবাজি সুস্থ সমাজ কাঠামোয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, এতে কোন সন্দেহ নেই। সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত হলে চাঁদাবাজি কমে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। জোরপূর্বক কারও কাছ থেকে চাঁদা আদায় নিঃসন্দেহে অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দল ও সংস্থার নামেও চাঁদা আদায় করে থাকে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে এ ধরনের চাঁদাবাজি বেশি লক্ষ্য করা যায়। চাঁদা আদায় হয় হাট-বাজারে, ফেরিঘাটে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রভাবশালীর নামে। ঈদের সময় বাস ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়।

সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীসহ অন্যান্য অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোন বিকল্প নেই। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারের পর প্রায়ই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজেই ছাড়া পায়। তাছাড়া জেল থেকে বের হয়ে চাঁদাবাজরা আরও সংহারী মূর্তি ধারণ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। চাঁদাবাজদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও ভাবতে হবে।

জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীসহ সব অপরাধীর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কোন বিকল্প নেই। এসব চাঁদাবাজদের কখনও কখনও গ্রেপ্তার করা হলেও আইনের ফাঁক-ফোকরে তারা সহজেই ছাড়া পায়। জেল থেকে বের হয়ে আরো বিকট চেহারা নিয়ে আবির্ভাব হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই।

এদের দমনে যেমন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার, তেমনি বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়েও ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে জনসাধারণের সহযোগিতা জরুরী।