২২ জুন ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতীয় পার্টির এমপিদের হুঁশিয়ারী অর্থমন্ত্রীর

জাতীয় পার্টির এমপিদের হুঁশিয়ারী অর্থমন্ত্রীর

সংসদ রিপোর্টার ॥ সম্পুরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা এবং ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনাকালে অর্থমন্ত্রীকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রী উল্লেখ করায় বেজায় চটেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। কখনো জাতীয় পার্টির এমপি বা সদস্য ছিলেন না দাবী করে অর্থমন্ত্রী আগামীতে এমন বক্তব্যে দেওয়া হলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন কর হবে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন। জবাবে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে বলেছেন, জাতীয় পার্টির মন্ত্রী বলায় আপনাকে (অর্থমন্ত্রী) আদালতে যেতে হবে না। কিন্তু ব্যাংক ডাকাতদের রক্ষা করায় আপনাকে একদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সোমবার ২০১৭-১৮ সালের সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনি আলোচনায় আরও অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম, রওশন আরা মান্নান ও সেলিম উদ্দিন। প্রথম দিনের আলোচনায় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও সমাপনি বক্তব্যে এ বিষয়ে কোন কথা বলেননি অর্থমন্ত্রী।

সম্পুরক বাজেটের ওপর সমাপনি বক্তব্যে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, গতবার সম্পূরক বাজেট নিয়ে যেসকল আলোচনা হয়েছিল তাতে আমার ইচ্ছা ছিল সম্পূরক বাজেটটাকে আরেকটু অর্থবহ করা এবং সেটা বিস্তৃততর আলোচনার ব্যবস্থা করা। এটা এবছর আমি করতে পারিনি সেজন্য খুবই দু:খিত। আশা করছি ভবিষ্যতে এধরনের একটা ব্যবস্থা হবে। সম্পূরক বাজেটে আমরা যে পরিবর্তন করেছিলাম সেটা খুবই সামান্য। মোটামুটিভাবে আগে বিভিন্ন বিভাগে যে ক্ষমতা এই সংসদ দিয়েছিল সেটা যতদূর সম্ভব রক্ষা করেছি। তবে কিছুটা আয় ব্যয় এদিকে সেদিক হয়েছে। সেটিকে আইনগত ভিত্তি দিতেই এই সম্পূরক বাজেট।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই টার্মে অর্থাৎ ১০ বছরে বাজেট ৫ লাখ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। আগে সংসদ সদস্যরা এক লাখ কোটি টাকার বাজেট পাস করতেন, এখন করছেন ৫ লাখ কোটি টাকা। আর সংবিধানই সম্পুরক ব্যয়ের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সম্পুরক বাজেট পাস হয় সংবিধান সম্মতভাবেই।

সম্পুরক বাজেটের আলোচনার সময় অর্থমন্ত্রীকে জাতীয় পার্টির অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করায় বেজায় চটেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, কয়েকবারই বলেছি, কিন্তু জাতীয় পার্টির সদস্যরা সেটা অস্বীকার করে যান। আজকেও অস্বীকার করেছেন। আমি আবারও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি কোনো দিন জাতীয় পার্টির সদস্যও ছিলাম না, কোনো দিন জাতীয় পার্টির মন্ত্রীও ছিলাম না। অনেকবারই এটা বলেছিল। তিনি বলেন, জেনারেল এরশাদ যখন সামরিক শাসক ছিলেন সেই সময় মন্ত্রী ছিলাম, জাতীয় পার্টির তখন জন্মও হয় নাই। জাতীয় পার্টি জন্ম হওয়ার আগে আমি সেই সরকার থেকে পদত্যাগ করে চলে যাই। কাজেই আমার অনুরোধ হবে ভবিষ্যতে যেন জাতীয় পার্টির সদস্যরা মনে রাখেন, যদি না রাখেন তাবে তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার চেস্টা নেবো।

ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সময় এর জবাব দিতে গিয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, জাতীয় পার্টি গঠনের পূর্বেই এরশাদ সাহেবের সামরিক শাসনের সময় অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব বাজেট দিয়েছিলেন। উনি (অর্থমন্ত্রী) কখনো জাতীয় পার্টি করেননি। তবে আমি আশ্বস্থ করতে চাই, ভবিষ্যতে তাঁর (অর্থমন্ত্রী) এতো জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে জাতীয় পার্টি তাদের দলে স্থান দেবে না। এরজন্য আপনাকে (অর্থমন্ত্রী) আদালতে যেতে হবে না। কিন্তু আপনি ব্যাংক ডাকাতদের যে প্রটেকশন দিয়েছেন তার জন্য আদালতে যেতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও দেশের প্রয়োজনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়। বিদ্যুত উৎপাদন ১১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। আমরা জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি। বিপুল সংখ্যেক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্তহাতে জঙ্গী-সন্ত্রাসী ও নৈরাজ্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা ঋণ খেয়ে ঘি খাই না, জনগণের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও দেশের উন্নয়নে ব্যয় করি। বাংলাদেশ যে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে- এই সার্টিফিকেট পয়সা দিয়ে কেনা যায় না। বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার কথা আজ কেউই অস্বীকার করতে পারে না, পারবেও না।

সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, টানা ১০ বছর ধরে বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের সরকারের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছি। প্রবৃদ্ধি এখন সাড়ে ৭ ভাগেরও বেশি, মাথাপিছু আয় ১৭শ’ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে ৬ ভাগের নিচে নেমে এসেছে। বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, মানবতার কারণে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের বর্বর নির্যাতনের শিকার ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের দেশের মাটিতে আশ্রয় দিয়েছেন। এ কারণে সরকারের বাজেটে ব্যয় বেড়েছে। সারা পৃথিবী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদার অব হিউম্যানিটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই কিছু দুষ্ট ও দুর্বৃত্ত থাকে, যারা এসব করে থাকে। আমাদের দেশেরও ব্যাংকিংখাতে কিছুটা অনিয়ম হয়েছে। এতে ব্যাংকিংখাতের ওপর চাপ পড়েছে। দিনেদুপুরে যারা বেসিক ব্যাংকসহ দু’একটি ব্যাংকে অনিয়ম করেছে, তারা সবাই এখন বিচারের মুখোমুখি। ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত সরকার কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে এমন অভিযোগ মোটেই সত্য নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, প্রতিবছরই বড় বাজেট দিয়ে জনগণকে বড় স্বপ্ন দেখানো হয়। কিন্তু বছর শেষে দেখা যায় বাজেট বাস্তবায়ন হয়নি। গত ১০ বছরে একটি বাজেটও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যাংকখাতকে পরিপূর্ণ পরিবারতন্ত্রে রূপ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ, কোন রেগুলেটরী কমিটি নেই। ১ লাখ ২৫ হাজার ঋণ খেলাপী রয়েছে। কারা ঋণ খেলাপী, কীসের জন্য ঋণ খেলাপী আজ পর্যন্ত দেশবাসীকে জানানো হয়নি, তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার বন্ধ করা না গেলে প্রবৃদ্ধি জনগণের কোনো কাজে আসবে না।

অর্থমন্ত্রীর ক্ষোভের জবাব দিতে গিয়ে জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিন বলেন, ’আমি তাঁকে (অর্থমন্ত্রী) জাতীয় পার্টির আমলের মন্ত্রী কথাটি বলিনি। তিনি খুবই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, কিন্তু সংসদে আমরা কিন্তু সহকর্মী। ছেলে যেমন বড় হলে বাবা তাকে শাসন করতে পারেননি। তেমনি অর্থমন্ত্রী বয়স্ক হলেও অন্য সংসদ সদস্যকে এভাবে ধমকানো তাঁর সঠিক হয়নি।’

নির্বাচিত সংবাদ